ঋণ দেয়ার সক্ষমতা

বন্ধুপ্রতিম দেশ শ্রীলঙ্কাকে ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ। করোনা মহামারীর চরম দুঃসময়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির পাশে। যদিও ঋণের পরিমাণ খুব বেশি নয়, বিশ কোটি মার্কিন ডলার। তবে একটি দেশের খারাপ সময়ে তাইবা কম কি। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে এসেছে প্রায় তলানিতে, মাত্র সাড়ে ৪শ’ কোটি মার্কিন ডলার। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস প্রধানত চা রফতানি এবং পর্যটন খাত। তবে গত দু’বছর ধরে চলমান করোনা মহামারীতে পর্যটনশিল্প প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যও প্রায় স্থবির অথবা সীমিত। ফলে চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে নিপতিত হয়েছে দেশটি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গত ১৯ মে ঢাকা সফরে এসেছিলেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। সে সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার অনুরোধ জানান। তার আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। অতঃপর দু’দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে পত্র চালাচালির মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হয় এই ঋণচুক্তি। তবে এতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তেমন চাপ পড়বে না বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও একটি মাইলফলক বলে বিবেচিত হতে পারে। এর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার হবে নিশ্চয়ই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশী মুদ্রার মজুদ ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে ৪৫ বিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার ৪শ’ কোটি মার্কিন ডলার। প্রধানত ঈদ-উল-ফিতরের আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমজীবীরা মা-বাবা-আত্মীয়-পরিজনদের জন্য বেশি বেশি অর্থ প্রেরণের কারণেই আশাব্যঞ্জক স্ফীতি ঘটেছে রিজার্ভের। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী একটি দেশের কাছে অন্তত ৩ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশী মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে বর্তমানের রিজার্ভ দিয়ে প্রতি মাসে ৪ বিলিয়ন ডলার হিসেবে ১১ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। সেক্ষেত্রে করোনার সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের অন্তত অতটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হলেও চলবে। অবশ্য রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ার জন্য প্রধান কৃতিত্বের দাবিদার প্রবাসী বাংলাদেশীরা। গত এপ্রিলে প্রবাসীরা সব মিলিয়ে ২০৬ কোটি মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন, যার পরিমাণ বাংলাদেশী টাকায় ১৭ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। মে মাসে এসেছে তারও বেশি। ফলে রিজার্ভ অতিক্রম করেছে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। প্রবাসী আয়ের এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করার জন্য অর্থমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী। করোনা সঙ্কটের আপৎকালীন সময়ে অন্যতম বিদেশী মুদ্রা উপার্জনকারী খাত পোশাক শিল্প যখন সমূহ হুমকিতে, তখন দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসীরা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য নিঃসন্দেহে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক শ্রম সংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে জানা যায়, বিশ্বের ১৭৪টি দেশে অন্তত এক কোটি ২০ লাখের মতো বাংলাদেশী রয়েছেন। যাদের অধিকাংশই শ্রমিক। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশে। ১৫ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনসহ নানা শর্তারোপ সত্ত্বেও সৌদি আরবে করোনাকালের এই দুঃসময়েও প্রায় প্রতিদিনই যাচ্ছেন বাংলাদেশী শ্রমজীবীরা। তবে তাদের কিছু সমস্যাও রয়েছে বিমানের টিকিট, ভিসাপ্রাপ্তি, হোটেল বুকিং ইত্যাদি নিয়ে। এসব সমস্যা সমাধানে জরুরীভিত্তিতে এগিয়ে আসতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সর্বোত্তম ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ ব্যবহার করতে হবে অবশ্যই।