ছয় লাখ কোটি টাকার বাজেটে জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য

মাসুদ কার্জন ঢাকা : করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতির মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বসেছে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন। গত বছরের মতো এবারও করোনা পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রেখেই সারাবছরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সাজানো হয়েছে। করোনা মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য আগামীকাল ৩ জুন (বৃহস্পতিবার) ছয় লাখ তিন হাজার ৬শ’ ৮১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেটের স্লোগান ‘জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য, আগামীর বাংলাদেশ’।

একাদশ জাতীয় সংসদের ১৩তম (বাজেট) অধিবেশন শুরু হয়েছে আজ বুধবার (২ জুন) বিকেল ৫টায়। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতা অনুযায়ী এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সংসদে ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উত্থাপিত হবে। ওই দিন বিকেল ৩টায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল তৃতীয়বারের মতো বাজেট উপস্থাপন করবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাজেট সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি (২০২০-২০২১) অর্থবছরের বাজেট ছিল পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার । তবে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সব ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট সাজানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মতো এবারও বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে বাজেটে করপোরেট কর কমানো হচ্ছে। এবারের বাজেটে অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকছে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও কৃষিখাত। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ কয়েকটি খাতে থাকছে বিশেষ চমক। দরিদ্রদের সুবিধা দিতে বাড়বে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা।

নতুন বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যয় হবে পরিচালন বা অনুন্নয়ন খাতে। এর পরিমাণ তিন লাখ ৬১ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১৩ হাজার ৩শ’ ২০ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৩৭ হাজার ৮শ’ ১২ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে পরিচালনখাতে বরাদ্দ ছিল তিন লাখ ৪৮ হাজার ১শ’ ৮০ কোটি টাকা। তবে ব্যয় সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে সরকারি চাকরিজীবীদের গাড়ি কেনা নিষিদ্ধ করা, বিদেশ ভ্রমণে বরাদ্দ অর্ধেক কমানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে এখাতে ব্যয় কিছুটা কমেছে। সংশোধিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে তিন লাখ ২৩ হাজার ৬শ’ ৮৮ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি বাজেটে প্রবৃদ্ধির এই হার ধরা হয় ৮ দশমিক ২ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে মানুষের আয় কমে গেছে। ফলে মানুষের হাতে টাকার সরবরাহও কমেছে। যার ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ সহনীয়ই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আসছে বছরে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের মোট জিডিপির আকার ধরা হচ্ছে ৩৪ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে আবর্তক ব্যয় ধরা হচ্ছে তিন লাখ ২৮ হাজার ৮শ’ ৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। আর বিদেশি ঋণের সুদ ব্যয় ধরা হচ্ছে ছয় হাজার ৫শ’ ৮৯ কোটি টাকা। আসছে বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে দুই লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ধরা হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৩শ’ ২৪ কোটি টাকা। যা এরই মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) অনুমোদন দিয়েছে। চলতি বছরের বাজেটে এডিপির আকার ধরা হয়েছে দুই লাখ পাঁচ হাজার ১শ’ ৪৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এডিপির বাস্তবায়ন হয়েছে ৩৫ শতাংশেরও কম।

বাজেট বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজেটে ঘাটতি বাড়লে কোনো সমস্যা নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘাটতি বাজেটে স্থানীয় অর্থনীতি নির্ভর করে মূল্যস্ফীতির ওপর। তবে সামনে মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা খুব একটা নেই। কারণ অনেকের আয় কমেছে, তাদের চাহিদাও কমে গেছে। ফলে ৬ শতাংশ বাজেট ঘাটতি খুব একটা বড় বিষয় নয়। বাজেটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সময়মতো বাস্তবায়ন। সার্বিক বিবেচনায় স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং কৃষি—এই তিনটি খাতে গুরুত্ব দেয়া উচিত।

তবে চলতি অর্থবছরে যেখানে করোনাভাইরাসের প্রকোপ চলছে, সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের বরাদ্দকৃত অর্থের বড় একটি অংশ এখন পর্যন্ত ব্যয় করতে পারেনি বলে খুশি নন বিশ্লেষকরা। তারা এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন মন্ত্রণালয়টিকে।

এদিকে ২০২১-২২ অর্থবছরের ৩৫ হাজার ৬শ’ ৮১ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের তুলনায় বাড়ছে না। এনবিআর বহির্ভূত কর ব্যবস্থা এবং করবহির্ভূত রাজস্ব—বিভিন্ন সেবা ফি, জরিমানা, টোল, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনগুলোর মুনাফা থেকে বাড়তি অর্থ কোষাগারে নেয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে অর্থ বিভাগ। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১১ হাজার কোটি টাকা বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরের মূল বাজেটে রাজস্ব লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছিল তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধন করে তিন লাখ ৫১ হাজার ৫শ’ ৩২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াবে দুই লাখ ১৪ হাজার ৬শ’ ৮১ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৬ দশমিক ২ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অনুদান পাওয়া গেলে ঘাটতি দাঁড়াবে দুই লাখ ১১ হাজার ১শ’ ৯১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ দশমিক ১ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে জিডিপির আকার ধরা হচ্ছে ৩৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে যা ছিল ৩১ লাখ ৭১ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে এটিকে কমিয়ে ধরা হয় ৩০ লাখ ৮৭ হাজার ৩শ’ কোটি টাকা।

এর আগে গত ২৭ মে দুপুরে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুযাল বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘দেশের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়েই আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হবে। আমাদের লক্ষ্যই থাকবে দেশের মানুষকে বাঁচানো, ব্যবসায়ীদের বাঁচানো। সুতরাং সবার স্বার্থ দেখেই আমরা বাজেটটি করছি। আমাদের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষকে সঙ্গে রাখা, তাদের সঙ্গে রেখেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৩শ’ ২৪ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ২০ হাজার ১শ’ ৭৯ কোটি টাকা বেশি। কাঙিক্ষত মাত্রায় এডিপি বাস্তবায়ন না হওয়ায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ কমিয়ে এক লাখ ৯৭ হাজার ৬শ’ ৪৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। করোনা মহামারিতে এডিপি বাস্তবায়ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও চলতি অর্থবছর তা বাস্তবায়নের হার খুবই হতাশাজনক। গত এপ্রিল শেষে, অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৯৮ হাজার ৮শ’ ৪০ কোটি টাকার, যা সংশোধিত বরাদ্দের ৪৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। বাস্তবায়নের এই হার গত পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন।