খাবারের কষ্টে ফ্রিল্যান্সারের আত্মহত্যা

রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহীতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন আনারুল ইসলাম টুটুল নামের এক ফ্রিল্যান্সার। তার বাড়ি নগরীর হোসেনীগঞ্জে। মঙ্গলবার (১ জুন) সকাল ১১টায় পুলিশ আত্মহত্যার বিষয়টি জানতে পারে। এরপর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। বিকাল সাড়ে ৪টায় ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিবারণ চন্দ্র বর্মণ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সোমবার দিবাগত রাতের যেকোনো সময় আনারুল ইসলাম টুটুল আত্মহত্যা করেছেন। তাকে ঘুম থেকে উঠতে না দেখে বাড়ির লোকজনের সন্দেহ হয়। এরপর তারা পুলিশে খবর দেয়। আমরা গিয়ে তাকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করেছি। তিনি অনেক ঋণগ্রস্ত ছিলেন বলে আমরা জেনেছি।

তিনি আরও বলেন, মারা যাওয়ার আগে সোমবার রাত ১১টা ১৩ মিনিটে আনারুল ইসলাম টুটুল তার ফেসবুকে দীর্ঘ একটি স্ট্যাটাস দেন।

সেখানে তিনি লিখেছেন, ফ্রিল্যান্সিং করে অনেক টাকা আয় করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অসুস্থতার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আবার কিছুটা সুস্থ হলে ফ্রিল্যাসিং শুরু করেন। কিন্তু তিন মাস না যেতেই আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। এজন্য কাজ বন্ধ রাখতে হয়।

আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঋণগ্রস্ত থাকায় তার পরিবারে অভাব-অনটন দেখা দেয়। এছাড়া স্ট্যাটাসে উল্লিখিত একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা ১৭ লাখ টাকা না পাওয়ায় হতাশাবোধও তৈরি হয়। এসব কারণে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বলে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন।

তিনি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম। আমার পোস্টটি অবশ্যই পড়বেন। আমি মো. আনারুল ইসলাম টুটুল। অসুস্থ থাকা অবস্থায় অনেকেই সাহায্য করেছিলেন। আমি একটু সুস্থ হওয়ার পর মনে করলাম জীবনে তো অনেক কষ্ট করেছি; একটু ছেলেমেয়েকে সুখ দেওয়ার চেষ্টা করি। তাই নেমে পড়লাম জীবন যুদ্ধে। কারণ আমি জানি বসে থেকে খেলে রাজার ভান্ডারও একসময় শেষ হয়ে যায়। আমি যেহেতু অসুস্থ সেজন্য বাড়ি ভাড়া নিয়ে কয়েকটি কম্পিউটার কিনে কাজ শুরু করে দিলাম। ২-৩ মাস ভালোই গেলো, শুরু হলো আবার শরীর খারাপ। অনেক বিনিয়োগ, অনেক ক্ষতি হলো। কোনোভাবেই সব ঠিক করতে পারছিলাম না। আমার ছোট মেয়ে রুকু মনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। তার প্যান্ট ছিঁড়ে গেছে। ওর আম্মুকে বলছে সেলাই করে দাও। আমার স্ত্রী ছেঁড়া জামা, বোরকা পরে, এগুলো দেখে কীভাবে সহ্য করি।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘ওরা কিছু চাওয়ার আগেই তো আমি হাজির করে দিয়েছি। যত দিন থেকে এই অনলাইন জগতে এসেছি; একটা রাত আরামে ঘুমাতে পারিনি, শুধু টেনশন আর টেনশন। লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগ শেষ। তবু সব ঠিক করে নিতে পারতাম, কাজ জানি। কিন্তু মানুষ আমাকে প্রতারক ভাবতে পারে। কাকে বলবো আমার দুঃখের কথা। কাউকে তো পাশে পাবো না। আমি মানসিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত।’

তিনি লিখেছেন, ‘রেক্স আইটির আব্দুস সালাম পলাশের কাছে ১৭ লাখ টাকা পাবো। আমার ব্যাচ নম্বর ১৬৬। পলাশকে কয়দিন আগে সিআইডি ধরেছে। পলাশের জন্য হাজারো পরিবার শেষ হয়ে গেছে, কয়েক হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েছে। সকল রেক্সার ভাই যারা আমাকে চেনেন; আমার পরিবারের পাশে থাকবেন। আপনাদের হতভাগা টুটুল ভাইকে ক্ষমা করে দেবেন।’

‌আমার স্ত্রীকে কেউ দোষারোপ করবেন না উল্লেখ করে তিনি আরও লিখেছেন, ‌’সে আমার কিছুই জানে না। সে আমাকে সব থেকে বেশি বিশ্বাস করে। ওর সব টাকা-পয়সা আমাকে দিয়ে দিয়েছে। আমি কোনো সময় আমার কাজের বিষয়ে ওর সঙ্গে কোনো কিছু শেয়ার করি না। আমাকে সুস্থ করার জন্য একসময় ওর সব গয়না বিক্রি করে দিয়েছিলো। শুধু একটা কথা বলতো, তুমি সুস্থ হও আবার বানিয়ে দিবা। আমার স্ত্রী অনেক সরল মানুষ। সে আমাকে অনেক ভালোবাসে। এজন্য এতো কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছে। দুই মাস ধরে সারা দিন কাজ করে, দোয়া ও কালিমা পড়ে, আমল করে, রোজা থাকছে। আবার রাতে তাহাজ্জুত নামাজ পড়ে। শুধু আমার জন্য এত কষ্ট করছে। আমি ওর কষ্ট আর দেখতে পারছি না। সব থেকে ভালো স্ত্রী আল্লাহ দিয়েছেন, আমি তার যোগ্য না। তার কথামতো চললে আজ আমার আত্মহত্যা করতে হতো না। তাই নিজেই নিজেকে শাস্তি দিচ্ছি।

সন্তানদের কথা উল্লেখ করে টুটুল আরও লিখেছেন, ‌’রুবি, টুম্পা, নাফিস, রুকু তোমরা আমার জান গো। আমাকে মাফ করে দিও। আমি অনেক চেষ্টা করলাম। কোনোভাবেই কিছু করতে পারছি না। অনলাইন জগতে কেউ কাউকে হেল্প করতে চায় না। অনেক চেষ্টা করলাম বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু পারলাম না। কোনোভাবেই কাজ হচ্ছে না। আমি বেঁচে থাকলে আরও ঋণ বেড়ে যাবে। তার থেকে আমি চলে যাই।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘সাদীপ ভাই আমার, নাফিস, রুকু, টুম্পাকে দেখে রেখো। কখনও ধমক দিয়ে কথা বলিও না। ওরা কষ্ট পাবে, মনে হবে আব্বু নেই; তাই এমন করছে। দীপ ভাই আমার বুঝতে দিও না ওদের আব্বু নেই। আমি বাড়িতে থাকলে তোমাকে সব কথা বলতাম। অনেকবার গেছি; তোমাকে সব বলবো ভেবে। কিন্তু পারিনি। ভাই মাটি দিতে তাড়াহুড়ো করিও না। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীসহ দেশের অনেক ভাইবোন আছে। যারা আমাকে অনেক ভালোবাসে। তাদের দেখার সুযোগ দিও।’

টুটুল লিখেছেন, ‌’বড় আব্বা, বড় মা আপনারা- আমার স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের দেখে রাখবেন। বড় আব্বা, বড় মা, আমার তো মা-বাবা নেই। আমি ছোটবেলা থেকেই আপনাদের বাবা-মা জানি। এই কয়েকদিন অনেকবার বাড়িতে গেছি। এজন্য মনে করেছিলাম সব বলবো। যে আমি অনেক বিপদে আছি। কিন্তু যদি পাশে কাউকে পাইনি। যারা আত্মহত্যা করে তারা নিজেকে একবার খুন করে ফেলার আগে বহুবার নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে; কেউ সেটা বুঝতে পারে না।’

তিনি আও লিখেছেন, ‘প্রিয় দেশবাসী গত তিন মাস থেকে আমার ঘরে খাবারের কষ্ট। আমার স্ত্রী অনেক কষ্টে খাবার জোগাড় করতেছে। আমার মৃত্যুর পর আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়ের পাশে থাকবেন। ওদের থাকার জায়গাটাও আমি রেখে যেতে পারলাম না। কথাগুলো লিখতে লিখতে অনেক কাঁদলাম। সবাইকে অনেক মনে পড়ছে। আর থাকতে পারলাম না চলে যাচ্ছি। ক্ষমা করে দিয়েন; ক্ষমা করে দিও আল্লাহ। আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়ের জন্য কিছুই করে যেতে পারলাম না। বেঁচে থাকলে আরও ঋণ বেড়ে যাবে। তাই চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। যদি সম্ভব হয় আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়ের থাকার একটা ব্যবস্থা করে দেবেন আপনারা।’