মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায় তামাক

প্রতিবছর ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালন করা হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য তামাক ব্যবহারের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব এবং স্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় তামাকপণ্য ব্যবহারের কারণে। এ ছাড়া ধূমপানের পরোক্ষ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন আরও ছয় লাখ মানুষ। তামাকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে জনসচেতনতা বাড়াতে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারিভাবে ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালন করা হয়। কিন্তু সরকারিভাবে এখনও জাতীয় তামাকমুক্ত দিবস পালন করা হয় না। তবে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছরের ৯ অক্টোবর বাংলাদেশে তামাকবিরোধী জোট দেশব্যাপী জাতীয় তামাকমুক্ত দিবস উদযাপন করে আসছে। দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত সংগঠনগুলো তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন, কর বৃদ্ধি, ধূমপানমুক্ত স্থান বৃদ্ধি, প্যাকেটের গায়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রদান, তামাকজাত দ্রব্যের ওপর কর বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।

তামাকের নিয়মিত ব্যবহার মানব স্বাস্থ্যে নানা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। ১৯৫০ সালে বিজ্ঞানী রিসার্ড ডল ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন; যেখানে তিনি ধূমপান ও ফুসফুস ক্যান্সার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। ১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ ডক্টরস স্টাডি নামক আরেকটি গবেষণা প্রকাশ হয়। সেখানে ধূমপানের সঙ্গে ফুসফুস সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় এবং এর ওপর ভিত্তি করে সরকার ঘোষণা করে, ধূমপানের ফলে ফুসফুস ক্যান্সারের হার বৃদ্ধি পায়।

যেসব বস্তুর ব্যবহার বাদ দিলে অকাল মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস করা যায়, সেগুলোর মধ্যে তামাক শীর্ষে। বিংশ শতাব্দীতে তামাক প্রায় ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। তামাক মূলত হূৎপিণ্ড, লিভার ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। ধূমপানের ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (এমফাইসিমা ও ক্রনিক ব্রংকাইটিসসহ) ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। তামাক উচ্চ রক্তচাপ ও প্রান্তীয় রোগও সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব নির্ভর করে একজন ব্যক্তি দৈনিক কতটি ও কয় বছর ধরে ধূমপান করে তার ওপর। অল্প বয়স থেকে এবং অধিক তামাকের ঘনত্ব সম্পন্ন সিগারেট খাওয়ার ফলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত তামাকজাত ধোঁয়া এবং পরোক্ষ ধূমপানও সব বয়সী ব্যক্তির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। গর্ভবতী নারীদের ওপর তামাকের ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। ধূমপায়ী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটার হার বেশি। এ ছাড়া গর্ভস্থ ভ্রূণেরও অনেক ক্ষতি করে। অধূমপায়ীর তুলনায় ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে যৌন সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার হার ৮৫ শতাংশ বেশি।

তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদন ও বিপণনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এর দ্রব্যের ব্যবহার কমিয়ে আনতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স দিয়ে থাকে। দেখা যায়, মুদি দোকান থেকে শুরু করে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় হচ্ছে। যখন একটি লাইসেন্স প্রদান করা হয়ে থাকে, তখন সুনির্দিষ্টভাবে কোন ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে সেটা উল্লেখ করা থাকে। তাই মুদি দোকানের জন্য লাইসেন্স নিয়ে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে আইনের লঙ্ঘন ঘটে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যদি তার আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা প্রদান করে যে, তারা যে লাইসেন্সগুলো দিয়েছে তা সঠিকভাবে যেন তদারকি করা হয়। তাহলে তামাকজাত দ্রব্য যত্রতত্র বিক্রয় অনেকাংশে কমে আসবে।

তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে ও বিপণনের জন্য বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। এমনকি তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের সঙ্গে সম্পৃক্তদের নির্ধারিত কোনো ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণের ব্যবস্থাও নেই। যে কারণে বিভিন্ন স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তামাকজাত পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে। তামাকজাত পণ্য বিক্রয়ে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা প্রণয়ন করে এর বিস্তার রোধ করা সম্ভব।