আত্মতু্ষ্টি নয়, চাই সতর্কতা

প্রভাষ আমিন : বাংলাদেশের জন্য এপ্রিল ছিল একটা ভয়ঙ্কর মাস। চারদিকে হাহাকার। প্রতিদিনই মৃত্যু আর সংক্রমণের রেকর্ড হচ্ছিল। টিকা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, হাসপাতালে সিট নেই, আইসিইউ যেন সোনার হরিণ। সে অবস্থা থেকে মে অনেকটাই স্বস্তি নিয়ে এসেছে। প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক। তবু মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে। সংক্রমণের হারও কমতির দিকে, অনেকদিন পর সংক্রমণ ১০ ভাগের নিচে নেমেছে। সবকিছু যে ইতিবাচক দিকে এগুচ্ছে, তা টের পাওয়া যায় হাসপাতালের দিকে তাকালে। এখন আইসিইউ, আসন- দুইই অর্ধেকের বেশি খালি। ভয়ঙ্কর এপ্রিলের পর মে সত্যিই স্বস্তি নিয়ে এসেছে। তবে এই আপাত স্বস্তি দেখেই আমার মনে গভীর শঙ্কার ঢেউ খেলে যায়। রাতের তারা যেমন লুকিয়ে থাকে দিনের আলোর গভীরে।

করোনা সংক্রমণ কেন কমে এলো, তা নিয়ে অনেকের অনেক রকম ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই আছে। তবে আমি মনে করি হাস্যকর হলেও চলমান লকডাউনের পথ বেয়েই এসেছে এই স্বস্তি। এখন এই স্বস্তি ধরে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। লকডাউন নিয়ে নানারকমের মত আছে। সরকার প্রথমে নানান নির্দেশনা দিয়ে চেষ্টা করেছে। এরপর এসেছে ‘লকডাউন’, তারপর এসেছে ‘কঠোর লকডাউন’। কিন্তু সবই কাগজে-কলমে। কাজীর গরু কেতাবে থাকলেও গোয়ালে ছিল না। রাস্তায় বেরুলে যে কেউ বলবেন, লকডাউন আসলে নামেমাত্র। তবে তারপরও সংক্রমণ কমে আসার কৃতিত্ব এই নামকাওয়াস্তে লকডাউনকেই দিতে হবে। গতবছরের সাধারণ ছুটি আর এ বছরের লকডাউন দেখে আমার একটা জিনিস মনে হয়েছে, ঘনবসতির এই দেশে লকডাউন কার্যকর করা কঠিন শুধু নয়, অসম্ভবও বটে। সরকারকে মানুষের জীবনের পাশাপাশি জীবিকার কথাও ভাবতে হয়।

সরকার নানাভাবে গরীব মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছে বটে। তবে সব মানুষের সব চাহিদা মেটানো কখনোই সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারকে বাধ্য হয়েই লকডাউনের ব্যাপারে ছাড় দিতে হয়। এখন কার্যত সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর গণপরিবহন ছাড়া সবই খোলা। শিগগিরই খুলে যাবে গণপরিবহনও। রাস্তায় যানজট প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। গণপরিবহন খুলে গেলে সেটা আরো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে যে ধরনের লকডাউন দরকার, সেটা বাংলাদেশে কখনো হয়নি, হবেওনা। এই লকডাউন দিয়ে সরকার আসলে করোনা ছড়ানোর চেইনটা ভাঙা আর হাসপাতালের ওপর চাপটা সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছে। এই চেষ্টায় সরকার শতভাগ সফল। সরকার তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এখন আমাদের দায়িত্ব।

রাতের সব তারা দিনের আলোর গভীরে লুকিয়ে থাকার মত, আপাত স্বস্তির পেছনেই লুকিয়ে আছে গভীর শঙ্কা। গত দুদিন ধরে শপিং মলগুলোতে মানুষের যে ঢল দেখছি, করোনা না আবার সুনামি হয়ে ফিরে আসে, সে ভয় আমার যাচ্ছে না। শপিংমল খোলার সময়ই বলা হচ্ছিল, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই সব চলবে। কিন্তু বসুন্ধরার সামনে একটু দাড়ালে আপনিও মানবেন, স্বাস্থ্যবিধি শপিংমলে ঢোকার সুযোগ পাবে না।
করোনা শুধু অনেকের শরীরে আঘাত হানেনি, অনেক মানুষের সামর্থ্যেও আঘাত হেনেছে। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, অনেকের ব্যবসা শেষ, প্রান্তিক মানুষের জীবন বাঁচানোই দায়। আপনার পাশের বাড়ির মানুষটি যখন হাসপাতালে, আপনার পাশের ঘরের মানুষের যখন চুলা জ্বলে না; তখন আপনি কীভাবে সপরিবারে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে শপিংমলে ছুটে যান, আমার বিশ্বাসই হয় না।

মাঝে মাঝে আামার মনে হয়, শপিংমলে গিয়ে মানুষের কাছে জানতে চাই তারা কেন এসেছেন, কী এমন জরুরি জিনিস তাদের কিনতে হবে, আমার একটু ব্যাগটা খুঁজে দেখতে ইচ্ছা করে। অনেকবারই বলা হয়েছে, করোনা এমন এক ভাইরাস, এর কবল থেকে একা বাঁচার কোনো উপায় নেই। বাঁচতে হবে সবাই মিলে। আপনি যত সতর্কই থাকুন, আপনার পাশের লোকটি সতর্ক না থাকলে আপনিও কিন্তু ঝুঁকিতে থাকবেন। তাই সতর্কতা, স্বাস্থ্যবিধি সবাইকেই মানতে হবে।

টিকা আসার পর আমাদের সবার মধ্যে একধরনের শৈথিল্য চলে এসেছিল। ভেবেছি, আমি টিকা দিয়ে দিয়েছি, আমার আর ভয় নেই। কিন্তু টিকা হলো করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনেকগুলো অস্ত্রের একটিমাত্র। আর টিকা দিলেই আপনি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত তাও কিন্তু ঠিক নয়। টিকা দেয়ার পরও করোনার সংক্রমণ হতে পারে। তবে দুই ডোজ টিকা দেয়া থাকলে সংক্রমণের মাত্রা কিছুটা কমে, মৃত্যুঝুঁকিও কমে এই যা। আর এত হৈ চৈ এর পরও বাংলাদেশের মাত্র ৪ ভাগ মানুষ টিকার আওতায় এসেছে। এর মধ্যেই ফুরিয়ে আসছে টিকার স্টক। ভারত থেকে টিকা আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টিকা নিয়েও হাহাকার তৈরি হয়েছিল। তবে সরকার দ্রুত চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করেছে। এখনও টিকা আসেনি। তবে আাশা করা যায় টিকার সঙ্কট কেটে যাবে। কিন্তু আগেই যেটা বলেছি, টিকা দেয়ার পরও আমাদের গা ছাড়া ভাব দেখানোর সুযোগ নেই। ফেব্রুয়ারিতে শৈথিল্যের খেসারত আমরা দিয়েছি এপ্রিলে। কিন্তু এখন যদি আবার সব ছেড়ে দেই, তার খেসারত না জানি সামনে কী ভয়ঙ্করভাবে দিতে হয়। আত্মতুষ্টিই আমাদের জন্য কাল হতে পারে।

শপিংমল খোলা আছে, আপনার পকেটে টাকা আছে; আপনি শপিং মলে যাবেন, তাতে আমার বলার কিছু নেই। কিন্তু মনে রাখবেন, নতুন কাপড়ে ঈদ করার চেয়ে, সবাই মিলে এক সাথে ঈদ করার আনন্দ অনেক বেশি। আপনার বাড়তি টাকা আপনি গরীব মানুষকে দিয়ে দেবেন, এমন আবদারও আমি করছি না। আপনার টাকা আপনার কাছেই রাখুন। কখন, কার হাসপাতাল-আইসিইউ লাগে তার তো কোনো গ্যারান্টি নেই। করোনা কিন্তু ধর্ম-বর্ণ-দেশ-জাতি চেনে না। করোনার বিশ্বভ্রমণে কিন্তু পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না। কুম্ভ মেলায় লাখো লোকের সমাবেশ, জমজমাট নির্বাচন করার মূল্য দিচ্ছে এখন পাশের দেশ ভারত। কয়দিন সীমান্ত আটকে রেখে আমরা সেই ঢেউ ঠেকাতে পারবো?

শপিং তো আপনাদের শেষ। এবার নিশ্চয়ই নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে চাইবেন। ঈদের সময় রাস্তার অবস্থা কী হবে, ভাবতেই আমার ভয় লাগছে। শপিংমল আর বাড়ি ফেরার তাড়া না আমাদের নতুন কোনো বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। করোনা অর্থনীতির ওপর ভয়ঙ্কর চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বলা হচ্ছে, এই সময়ে সবচেয়ে বড় মুনাফা হলো বেঁচে থাকা, সুস্থ থাকা। বেঁচে থাকলে আবার চাকরি খুঁজতে পারবেন, আবার ব্যবসা দাড় করাতে পারবেন। তাই সুস্থ থাকার ওপরও সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করুন। আর করোনা থেকে বাঁচার উপায়গুলো কিন্তু কঠিন নয়। করোনার সবচেয়ে বড় টিকা হলো- মাস্ক। আপনি যদি আপনার মুখ আর নাকটা ঢেকে রাখেন, তাহলে করোনা আপনার শরীরে ঢোকার সুযোগ পাবে না। তাই বাসার বাইরে সার্বক্ষণিকভাবে মাস্ক পরতে হবে। এটা খুব সহজ। জুতা আবিষ্কারের গল্পের মত আপনার নাক আর মুখ শুধু ঢেকে রাখুন, দুনিয়া বন্ধ না করলেও চলবে। করোনা ছড়ায় মানুষ থেকে মানুষে। তাই জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। আর পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। যাদের পেটের ভাত জোগাতে কাজে যেতেই হয়, তাদের কথা আলাদা। যাদের ঘরে থাকার সুযোগ আছে, প্লিজ ঘরেই থাকুন। প্রার্থনা করি, ঈদটা যেন সবাই মিলে আনন্দে উদযাপন করতে পারি। কারো ঈদ যেন হাসপাতালে, আইসিউইতে বা কবরস্থানে না কাটে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।