প্রাণবায়ু অক্সিজেনের সংকট কি মানবতার বিলুপ্তি ঘটাবে?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম :

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট এখন বিশ্বব্যাপি করোনা সংক্রমণের উর্ধ্বমুখী প্রবণতা। স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রাণবায়ু অক্সিজেন সংকট। কয়েকমাস আগে করোনার নতুন ঢেউ এসেছে তৃতীয় ভেরিয়েন্টের মারাত্মক ভয়াবহতা নিয়ে। সারা পৃথিবীর সাথে ভয়ে কাঁপছে উপমহাদেশের মানুষ। বাংলাদেশেও করোনার কালো ছোবল এনে দিয়েছে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন ও চতুর্মুখী অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশে সংক্রমণের গতি কিছুটা কম মনে হলেও মৃত্যুর উর্ধ্বগতি বেশি ভাবনার বিষয়। বিশ্বে এপ্রিল ২৬ পর্যন্ত ১৪ কোটি ৮৪ লাখ ১৭ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুবরণ করেছেন ৩১ লাখ ৩৩ হাজার মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ২৬৪ জন, ব্রাজিলে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৯২৫ জন এবং ভারতে মারা গেছেন ১ লাখ সাতানব্বই হাজার ৮৮০ জন।

ভারত আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র। আমাদের দেশের তিনদিকেই ভারতের সীমান্ত। তাই ভারতে কোন বিপর্যয় ঘটলে তার ঢেউ খুব সহজে এবং খুব দ্রুত আমাদেরকে প্রভাবিত করে থাকে। করোনার তৃতীয় ভেরিয়েন্ট ও বেঙ্গল ভেরিয়েন্টের মারাত্মক ভয়াবহতা খুব দ্রুত রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোভিড-১৯ তাণ্ডবে সর্বত্র ভেঙ্গে পড়েছে ওদের স্বাস্থ্যসেবা। অক্সিজেন, শয্যা, ওষুধ হাসপাতাল সবকিছুর সংকটে নিপতিত এই খাত। ভারতে টানা ষষ্ঠদিন তিনলাখের উপর সংক্রমণ দেখা দেয়ায় মৃত্যুর ভয়াবহতা এখনও নিরুপণ করা যাচ্ছে না। দেশটির আগরায় রেণু সিংহল তাঁর করোনাক্রান্ত স্বামীকে অটোরিক্সায় দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার পথে অবস্থার আরো অবনতি হলে নিজের মুখ দিয়ে স্বামীর মুখে শ্বাস দেয়ার চেষ্টা করার ছবি মানুষের হৃদয়ে করুণভাবে ধরা দিয়েছে। সরোজিনী নাইডু মেডিকেল কলেজের দ্বারে নিয়ে গিয়েও তাঁর স্বামী রবি সিংহলকে শত চেষ্টা করেও তিনি বাঁচাতে পারেননি।

করোনা রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় কোথাও শয্যা খালি নেই। অক্সিজেনের অভাবে হাসপাতালগুলো রোগি ভর্তি করাচ্ছে না। হোয়াটস্অ্যাপ, ইন্সট্রাগ্রামে অক্সিজেন সহায়তা চেয়ে মেসেজ পাঠিয়ে হাহাকার শুরু হয়েছে সোস্যাল মিডিয়ায়। জায়গা দিতে না পারায় হাসপাতালগুলো রোগীকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করার পরামর্শ দিচ্ছেন। রোগীর ভয়াবহ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে আত্মীয়-স্বজনেরা দৌড়াদৌড়ি করে অক্সিজেন সিলিন্ডার সংগ্রহ করছেন। কিন্তু বাড়ি তো আর হাসপাতালের মত চিকিৎসা কৌশল জানে না বা দিতেও পারছে না।

অপরদিকে, এই গভীর সংকটবস্থায় কোথাও স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না অক্সিজেন সিলিন্ডার। কালোবাজারে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ছয় হাজার রুপী দামের অক্সিজেন সিলিন্ডার কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে পঞ্চাশ হাজার রুপীতে! অংশুপ্রিয়া নামের একজন নারী তাঁর স্বামীর জন্য পঞ্চাশ হাজার দিয়ে একটি সিলিন্ডার কিনেছেন। তবুও জীবন রক্ষা করার চেষ্টা নিয়ে কথা। যত দাম চাওয়া হোক তত দাম দিয়ে কিনতে চেয়েও কেউ কেউ অক্সিজেন অক্সিজেন সংগ্রহ করতে পারছেন না। এভাবে করোনাক্রান্ত মুষূর্ষু প্রিয়জনদের নিয়ে অনেকে লড়াই করে চলেছেন যমের সাথে।

অক্সিজেন কালোবাজারীর পাশাপাশি মোবাইল ফোন ও অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছেন অনেকে। কমদামে ইঞ্জেকশন ও দশহাজার রুপীতে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করার কথা বলে অগ্রিম টাকা পাঠানোর পর তথ্য নেয়ার সাথে সাথে ওপাশের নম্বর বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা! তবে কি করোনায় মুমূর্ষু প্রিয়জনদের জীবন বাঁচানোর চেষ্ট করার সময় কিছু ঠগ্-বাটপার ও প্রবঞ্চক এ ধরনের মানবতা বিবর্জিত কাজ করতেই থাকবে? তবে কি এই দুর্দিনে প্রাণবায়ু অক্সিজেনের সংকট মানবতার বিলুপ্তি ঘটাবে?

মুমূর্ষু প্রিয়জনদের দিকে তাকালে কার মাথা ঠিক থাকে? এই দুঃসময়ে কেউ প্রতারণার ফাঁদ পাতলে কেমন লাগে? এগুলো সৃষ্টির সেরা জীবের দাবিদার মানুষের কাজ হওয়া উচিত নয়। কারণ, মৃত্যু কাউকে কোনভাবেই ছাড় দিবে না। আমাদের দেশেও গত এক সপ্তাহের মৃত্যুর উর্ধ্বগতি বেশ মারাত্মক। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে সরকারী নিয়ন্ত্রণ খুব শিথিল। বাজার-ঘাট নতুন করে খুলে দেয়া হয়েছে। নতুন টিকা সংগ্রহের অভাবে টিকার প্রথম ডোজ প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মজুত যা ছিল শেষ। একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়ায় বিল পরিশোধ করার পরও সময়মত টিকা প্রাপ্তিতে বিপত্তি সৃষ্টি হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন- “ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় সরকার বেক্সিমকোর চাপে টিকার বিকল্প উৎসে যেতে পারেনি। যদিও চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করতে চেয়েছিল।” বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন- ‘টিকার জন্য চুক্তি অনুযায়ী অর্ধেক টাকা অগ্রিম পেমেন্ট দিয়েছি। আমাদের কিছু করার নেই। সরকারকে চাপ দিয়ে টিকা আদায় করাতে হবে।’

সরকারের কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরী কমিটির পরামর্শক কমিটির প্রধান ডা. শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘ভারতের সিরাম ইন্সিটিউটের সাথে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিন কোটি টিকার যে চালান পাবার কথা ছিল সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। এ পর্যন্ত মাত্র এক কোটি দুই লাখ পাওয়া গেছে।’ভারত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ করতে পারছে না। অপরদিকে নিজেদের অপ্রতুলতার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে আমাদের দেশে অক্সিজেন সংকট ঘণীভূত হয়েছে।

করোনার আঘাতে জীবন সংহারী সংকট এখন বিশ্বব্যাপি। ডব্লিউএইচও প্রধান বলেছেন, ‘ভারতের অবস্থা মর্মান্তিক।’ ভ্রাম্যমান ফিল্ড হাসপাতাল, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, ও প্রয়োজনীয দ্রব্য সহায়তার জন্য আমরা ৬০০ জন বিশেষজ্ঞকে কাজে লাগিয়েছি’। তিনি আরো বলেন, ‘ভারতের করোনার আসল চিত্র বর্তমানে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়ে ভয়ংকর’।

এই সন্দেহজনক পরিসংখ্যানের বিষয়টি আসলে ভয়ানকভাবে নতুন চিন্তার উদ্রেক করে। কারণ দেশে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হবার সেই প্রথম থেকে আসল তথ্য নিয়ে লুকোচুরি করেছে কর্তৃপক্ষগুলো রাজনৈতিক ও নানা অজানা কারণে। আমাদের দেশে করোনার প্রকোপ আজ সামান্য কমে কাল বাড়ে। যার ভবিষ্যৎ গতি নিয়ে কোন মন্তব্য করার ক্ষমতা কারুরই নেই। তাই সংক্রমণ ও মৃত্যু কিছুটা কমলে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোন কারণ নেই। আমাদের প্রায় চারপাশে প্রতিবেশি দেশের অবস্থা বর্তমানে বেশ টালমাটাল। তৃতীয় ভেরিয়েন্টের ভয়ংকর এই ছোঁয়াচে রোগ যে কোন মুহূর্তে আমাদের মত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে গণমৃত্যুর গভীর সংকট তৈরি করতে পারে। সেজন্য আমাদের যথার্থ প্রস্তুতি নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে প্রাণবায়ু অক্সিজেনের সংকট যেন আর কোন প্রাণ কেড়ে না নেয় সেজন্য রাত দিন চেষ্টা করে এর উৎপাদন বাড়াতে হবে। অক্সিজেন ও করোনার চিকিৎসা সামগ্রী যেন কোনভাবেই কালোবাজারিদের দখলে গিয়ে ভারতের মতো আমাদের দেশেও চিকিৎসা সংকটকে ঘণীভূত করতে না পারে সেজন্য আমরা সবাই আরো মানবিক হই প্রতিবেশিদের দুঃসময়ে আশু রোগমুক্তির জন্য সহমর্মিতা প্রকাশ করি ও নিজেরা বেশি বেশি সতর্ক থাকি।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।