ভোজ্যতেলের দাম আবার বাড়বে কেন?

অর্থনীতি রিপোর্ট : আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দুই দফায় বাড়ানোর পর ভোজ্যতেলের দাম আবারও বাড়বে কেন? এমন প্রশ্ন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বাজারে ভোজ্যতেলের দাম আরও বাড়ানোর কোনও কারণ নেই বলে মনে করে বাংলাদেশ ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড কমিশন। অপরদিকে দেশের ভোজ্যতেল আমদানিকারকরা মনে করে ভোজ্যতেলের দাম আরও বাড়াতে হবে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে।

সে কারণেই ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ভোজ্যতেলের দাম প্রতি লিটারে আরও পাঁচ টাকা বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে চিঠি দিয়ে ৫ টাকা বাড়িয়ে তেলের নতুন দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন মনে করে, তিন কারণে বাজারে ভোজ্যতেলের দাম আবার বাড়ানোর কোনও যৌক্তিকতা নেই। প্রথমত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভোজ্যতেল আমদানির ওপর থেকে চার শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। দ্বিতীয়ত, এই মুহূর্তে সয়াবিন ও পামতেল উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিল ও মালয়েশিয়ায় ভোজ্যতেলের সংগ্রহের মৌসুম চলছে। তাদের সংগ্রহ করা শেষ হয়ে গেলে চাহিদা কমে যাবে।

এতে আগামী অল্প কিছু দিনের মধ্যে ভোজ্যতেলের দাম কমবে। তৃতীয়ত, বর্তমানে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে যে তেল বাজারজাত করছে সেগুলো অনেক আগে কম দামে কেনা। কাজেই এই তিন কারণে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোনও যৌক্তিকতা নেই।

জানা গেছে, দেশে ভোজ্যতেলের দাম আরেক দফা বাড়াতে চায় উৎপাদন ও বিপণনকারী কোম্পানিগুলো। প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে সয়াবিনের দাম ১৪৪ টাকা করার জন্য ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে কোম্পানিগুলোর অ্যাসোসিয়েশন। এর আগে গত ১৫ মার্চ পণ্য বিপণন পরিবেশক নিয়োগ আদেশ, ২০১১ অনুযায়ী গঠিত জাতীয় কমিটি চার টাকা বাড়িয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার সর্বোচ্চ ১৩৯ টাকা দাম নির্ধারণ করে। যা আগে ছিল ১৩৫ টাকা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান সরকারের অতিরিক্ত সচিব মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে প্রতি লিটার ভোজ্যতেলের দাম আরও পাঁচ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব পেয়েছি। আমরা মনে করি এই মুহূর্তে তেলের দাম বাড়ার কোনও কারণ নেই। তাই আমরা প্রস্তাবটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।

একই প্রসঙ্গে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সদস্য শাহ্ মো. আবু রায়হান আলবেরুনী জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পাম ও সয়াবিনের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। অপরদিকে পাম ও সয়াবিন উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিল ও মালয়েশিয়ায় সংগ্রহ মৌসুম চলছে। কয়েক দিনের মধ্যে তাদের সংগ্রহ শেষ হয়ে গেলে চাহিদা কমে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারেই ভোজ্যতেলের দাম কমে যাবে। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে ভোজ্যতেল আমদানির ওপর থেকে চার শতাংশ হারে অ্যাডভান্স ট্যাক্স প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, তেল কোম্পানিগুলো এই মুহূর্তে যে তেল বাজারজাত করছে তা অনেক আগে অর্থাৎ ছয় মাস আগে কম দামে কেনা। কাজেই আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দর হিসাব করলে চলবে না। তাই আমরা মনে করি ভোজ্যতেলের বর্তমানে যে দর ঠিক করা আছে সেটিই যৌক্তিক। আর বাড়ানোর কোনও কারণ নেই।

অপরদিকে তীর ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল প্রস্তুতকারী ও দেশের ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা জানিয়েছেন, ভোজ্যতেলের দাম আরও বাড়াতে হবে। এর কোনও বিকল্প নেই। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে এখনও প্রতিটন অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম সাড়ে ১২শ’ ডলারের ওপরে। আমাদের কাছে আগের কম দামে কেনা কোনও তেল নেই। বর্তমান দরে কেনা তেল বাজারজাত করছি।

তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চার শতাংশ অ্যাডভান্স ট্যাক্স প্রত্যাহারের পরেও প্রতি লিটার ভোজ্যতেলের ওপর থাকা বিভিন্ন নামে ২২ টাকা ট্যাক্স সরকারকে দিতে হচ্ছে। সরকার যদি জনসাধারণের কথা বিবেচনা করে এই ২২ টাকা ট্যাক্স প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলেই সহজে প্রতি লিটার ভোজ্যতেলের দাম ২২ টাকা কমে যাবে।

জানা গেছে, কোম্পানিগুলোর দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী লিটারপ্রতি দাম আরও পাঁচ টাকা বাড়ানো হলে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিনের দাম হবে ১২২ টাকা, যা বর্তমানে রয়েছে ১১৭ টাকা। এছাড়াও পাঁচ লিটারের বোতল ৬৮৫ টাকা এবং পাম সুপার তেল ১১৩ টাকায় বিক্রি হবে। পাম সুপার তেলের দাম বাড়বে লিটারে ৪ টাকা।

ট্যারিফ কমিশন সূত্র জানিয়েছে, চিঠিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভোজ্যতেলের মূল্য পুনরায় নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশ্ববাজারের দাম অনুযায়ী তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫২ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও রমজান ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিপণনকারীরা লিটারে ছাড় দিয়ে ১৪৪ টাকা নতুন মূল্য প্রস্তাব করছে। এই দর গত ২৪ এপ্রিল থেকে কার্যকর করার কথা জানানো হলেও কমিশন সে বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ না নিয়ে চিঠি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে।