জলবায়ুর ক্ষতির মূল দায় নিতে হবে উন্নত দেশকে: প্রধানমন্ত্রী

মুজিবুর রহমান, ঢাকা : জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকেই মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফরেন পলিসির ভার্চুয়াল জলবায়ু সামিটে ধারণ করা এক বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘জলবায়ূ পরিবর্তনের কোনো সীমানা নেই। কোনো একটি দেশ কার্বন নির্গমন করলে প্রতিটি দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জন্য প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। ‘অবশ্য ধনী দেশ, বিশেষ করে জি টুয়েন্টি দেশগুলোকেই এ ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিই সব সমস্যার কারণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ‘বৈশ্বিক তাপমাত্রার ক্রমবর্ধমান উল্লফন মানবজাতির জন্য সবচেয়ে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘বৈশ্বিক তাপমাত্রা যাতে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি না পায় তা নিশ্চিত করতে আমরা প্যারিস জলবায়ু অ্যাকর্ডে একমত হয়েছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কিছু করা হয়নি যাতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিন হাউজ গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পুরো বিশ্বই এখন একটি কঠিন সময় পার করছে, যখন প্রতিদিনই কোভিড ১৯ অতিমারির কারণে অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং হাজার হাজার মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। এই মরণঘাতি ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

‘কোভিড ১৯-এর পরে সম্ভবত সবচেয়ে আলোচ্য বিষয়টি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তন এখন বিশ্বের সব দেশের জন্যই অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য।’

জলবায়ূ পরিবর্তনের সংকটগুলো তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে প্রতিনিয়তই প্রকৃতির বিরূপ কর্মকাণ্ড যেমন বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঝোড়ো বাতাস এবং বজ্রের মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমানে আমাদের দেশের ওপর দিয়ে হিট ওয়েভ বয়ে যাচ্ছে।

‘গত বছর আমাদের অতি বৃষ্টির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যার ফলে দেশের এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে চলে যায়। সুপার সাইক্লোন আম্পানসহ বেশ কয়েকটি সাইক্লোনও গত বছর আমার দেশে আঘাত হানে। এ সবই হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ নির্গমনকারী দেশ নয়। সত্যি বলতে, ক্লাইমেট ভলনারেবল ফোরামের কোনো দেশই উল্লেখযোগ্য নির্গমনকারী নয়। কিন্তু আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। প্রতিবছর আমার দেশের জিডিপির ২ শতাংশই চলে যায় এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায়।

‘তালিকার নিচের সারিতে থাকা ১০০টি দেশ বিশ্বে কার্বন নির্গমনের মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশের জন্য দায়ী, অন্যদিকে জি টুয়েন্টি দেশগুলোর দায় ৮০ শতাংশ। সিভিএফ দেশগুলো জলবায়ু অভিযোজনের পুরোভাগে অবস্থান করছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশই স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে প্রথম একটি জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে। এখন পর্যন্ত ৮০০-এর বেশি অভিযোজন ও প্রশমন প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা ৪১৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি আমাদের নিজস্ব সক্ষমতায় খরচ করেছি।

‘২০১৯ সালে আমাদের সংসদে একটি মোশন গ্রহণ করা হয়, যাতে বর্তমান জলবায়ূর নাজুক অবস্থাকে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে মুজিব জলবায়ু উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে সারা দেশে ৩০ মিলিয়ন গাছের চারা রোপণ করছি। জলবায়ু অভিযোজন ও ক্ষতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতি বছর মোট জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ যা ৫ বিলিয়ন ডলারের সমান আমরা প্রতিবছর খরচ করছি।’

সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা ১২ হাজার সাইক্লোন শেল্টার ও ২ লাখ হেক্টর কোস্টাল গ্রিন বেল্ট তৈরি করেছি। আমাদের বিজ্ঞানীরা লবণাক্ততা ও বন্যা সহিষ্ণু শস্য, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জলাধার এবং পুকুর-বালু ফিল্টার, ভাসমান চাষাবাদ প্রযুক্তি এবং ভ্রাম্যমাণ পানি পরিশোধন কেন্দ্র উপকূলীয় মানুষের জন্য উদ্ভাবন করেছে।

‘যেকোনো প্রকল্প গ্রহণ করার সময় জলাধার তৈরি ও বৃক্ষরোপণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমরা উপকূলীয় জেলার বিভিন্ন চরে কৃত্রিমভাবে উপকূলীয় বনাঞ্চল গড়ে তুলছি। আমার সরকার ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় দরিদ্র মানুষদের জন্য ঘূর্ণিঝড় সহনশীল ঘর তৈরি করছে। পানি ধারণ ক্ষমতা ও নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য আমরা সারা দেশেই নদী ও খাল ড্রেজিং করছি।’

এ সময় প্যারিস চুক্তিতে প্রত্যাবর্তন করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে অভিবাদনও জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘প্যারিস চুক্তি অনুসারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অভিযোজন ও প্রশমন প্রক্রিয়ার জন্য প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ফান্ড গঠনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল।

‘প্যারিস চুক্তির শক্ত বাস্তবায়নই বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানোর একমাত্র উপায়। এই গ্রহকে বাঁচানোর জন্য আজই কাজ করার সময়, কাল নয়।’

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গও। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আমরা পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিতে থাকা কক্সবাজারে আশ্রয় দিয়েছি, এর ফলে ওই এলাকার বাস্তুসংস্থান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।