চাহিদা বেড়েছে কুরিয়ার সেবাপ্রতিষ্ঠানের

অর্থনীতি রিপোর্ট : কুরিয়ার সেবা বলতে এক সময় মানুষ বুঝতো শুধুই চিঠিপত্র বা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র আদান-প্রদান। গেল এক দশকে সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে। ই-কমার্সে কেনাকাটা বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য পরিবহনে গুরুত্ব বেড়েছে কুরিয়ারের। ডিজিটালাইজেশন তথা স্মার্ট ফোন, ইন্টারনেট, অ্যাপভিত্তিক কেনাবেচায় গত ছয় বছরে বাজারে এসেছে শতাধিক অনলাইন বা অ্যাপভিত্তিক ই-কুরিয়ার কোম্পানি।

নথি ও কাগজপত্রের পাশাপাশি যেকোনো জায়গায় পোশাক, মাছ, মাংস এমনকি রান্না করা খাবারও পৌঁছে দিচ্ছে এই সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো। করোনাকালে কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর চাহিদা বাড়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান হয়েছেন কয়েক লাখ যুবকের। তাদের মধ্যে অসংখ্য উচ্চশিক্ষিত যুবকও এ পেশায় আগ্রহী হয়ে যুক্ত হয়েছেন। ফলে স্মার্টনেসের সঙ্গে বেড়ে পেশাদারিত্বের মানও।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাকালে ফ্যাশন পণ্যের বিক্রি কিছুটা কমেছে। তবে প্রায় ৩০০ গুণ বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অর্ডার ও বিক্রি। পার্সেল ডেলিভারিতে কুরিয়ার কোম্পানিগুলোরও এজন্য কদর বেড়েছে। দ্রুততর সময়ে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। এ কাজে তাদের মূল ভরসা ডেলিভারি ম্যান। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ঘরে বসে সেবা পাচ্ছেন ভোক্তারা।

জানা গেছে, পচনশীল পণ্য দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে ডেলিভারি করছে কোম্পানিগুলো। আর অন্যান্য পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে সবোর্চ্চ সময় লাগছে ৪৮ ঘণ্টা। ডিজিটালাইজেশনের কারণে ই-কুরিয়ার সেবার বিস্তৃতি ঘটেছে। জাহাজ ও বিমান কিংবা ডাকযোগে বিদেশে, আন্তঃজেলায় পণ্যবাহী গাড়ির মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় পণ্য পাঠানো যাচ্ছে।

তবে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এখন এই সেবা ডিজিটাল বা অ্যাপভিত্তিক হয়েছে। এখন ক্রেতা বা বিক্রেতা স্মার্ট ফোনে থাকা ডেলিভারি কোম্পানির অ্যাপে দেখতে পান তার পণ্য কতদূর পৌঁছেছে। পণ্যেও ট্রাকিং থাকায় হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা যেমন কমেছে, তেমনি দ্রুত গন্ত্যব্য পৌঁছে যাচ্ছে।

ই-কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লব ঘোষ  বলেন, ‘কুরিয়ার নতুন কোনো সেক্টর না। আগে থেকেও অনেকেই এটাতে কাজ করত। ডিজিটালাইজেশনের হওয়ার পরে অনেক নতুন নতুন কুরিয়ার সার্ভিস এসেছে, যারা ডিজিটালি কানেকটেড। এতে করে মানুষের দোরগোঁড়ায় এখন হোম ডেলিভারি সার্ভিসটা জনপ্রিয় হয়েছে।’

জানা গেছে, দেশে লাইসেন্সধারী কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭০টি। আর ফেসবুক ও অ্যাপভিত্তিক কুরিয়ার সেবা প্রদানকারী সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। তবে কুরিয়ার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় আনতে কাজ করছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ই-ক্যাব।

ডেলিভারির শীর্ষে মুদিপণ্য

করোনাকালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ডেলিভারি বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এ প্রসঙ্গে ই-কমার্স সাইট অথবা ডটকম-এর হেড অব বিজনেস বলেন, করোনাকালে আমাদের অর্ডার দ্বিগুণ হয়েছে। আমরা ডেলিভারি ম্যান দিয়ে দ্রুতই অর্ডারগুলো ক্রেতার বাসায় পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি। এখন মুদিপণ্যের চাহিদা বেশি। তার পরে ক্লিনিং পণ্য যেমন- ঝাড়ু, সাবান এসব পণ্যেরও চাহিদা আছে।

চাল ডালের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জিয়া আশরাফ বলেন, গত বছরে করোনা শুরু হওয়ার পর আমাদের অর্ডার বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার। এর বেশিরভাগই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। আমাদের নিজস্ব ডেলিভারি ম্যান দিয়ে ক্রেতাদের কাছে দ্রুতই পণ্য পৌঁছে দিচ্ছি।

আয় বেড়েছে কুরিয়ার সেবাপ্রতিষ্ঠানের

করোনাকালে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তায় অনেকেই ঘর থেকে বের হচ্ছেন কম। কেনাকাটা সারছেন ই-কমার্সে বা এফ-কমার্সে। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ডেলিভারি সেবা থাকলেও বাকিরা কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর কাছে দ্বারস্থ হচ্ছেন। চলতি বছর লকডাউন শুরু হলে লোকজন আবারও অনলাইনমুখী হয়েছেন। ফলে ডেলিভারি সার্ভিস বেড়েছে।

জানা গেছে, বর্তমানে রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকায় এর চালকরা কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি পার্সন হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়া ই-কমার্স ও কুরিয়ার কোম্পানিগুলো প্রতি মাসেই ডেলিভারি পার্সন নিচ্ছে।

বিপ্লব ঘোষ  বলেন, করোনার কারণে এই সেক্টরে তিন থেকে চার বছর পর যে পরিমাণ গ্রোথ আসার কথা ছিল, সেটা আগেই চলে এসেছে। যে ফিডব্যাক আমরা ২০২৪, ২০২৫-এ আশা করেছি সেটা এখন ২০২১-এ দেখছি।

ই-কুরিয়ার সার্ভিস ডেলেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও রফিকুল রঞ্জু বলেন, করোনাকালে আমাদের ডেলিভারি বেড়েছে। আমাদের ডেলিভারী পার্সন বাড়াতে হয়েছে। গত বছর করোনার পরে অনেক মার্চেন্ট ব্যবসা বন্ধ করে দেয়াতে অর্ডার কম ছিল। তবে এ বছর আবার অর্ডার বেড়েছে। এ জন্য আমাদের ডেলিভারি পার্সনও বেড়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের এই সেবার একটা বাজার আছে, যেটার ৩০ ভাগ ও আমরা সবাই মিলে ধরতে পারিনি। তবে সরকারের সহযোগিতা পেলে এ সেক্টর দেশের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।

ডেলিভারিতে ঝুঁকছেন উচ্চশিক্ষিতরা

কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর পার্সেল বাড়ায় তাদের প্রচুর ডেলিভারি পার্সনের প্রয়োজন হচ্ছে। এ জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানই নিয়োগ দিচ্ছে ডেলিভারি পার্সন। করোনাকালে কাজ হাতছাড়া করছেন না উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবকরা। অনেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য পার্টটাইম হিসেবে এ কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ রাসেল  বলেন, ডেলিভারির ক্ষেত্রে ক্রেতা যেনো দ্রুত পণ্য পায় সেজন্য আমাদের ৬ হাজার ইভ্যালি হিরো বা ডেলিভারি পার্সন কাজ করছে। এছাড়া আমরা চাহিদানুযায়ী ডেলিভারি পার্সন নিয়োগ দিচ্ছি।

বিপ্লব ঘোষ বলেন, ‘আগে আমরা ডেলিভারি পার্সন পেতাম না। তরুণরা এ কাজ করতে চাইতো না। দুই বছর আগেও যারা রাইড শেয়ার করতো, তারা ডেলিভারিতে আসতে চাইতো না। এখন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। এখন মাস্টার্স পাশ করা ছেলে ডেলিভারি পার্সন হিসেব কাজ করতে চায়। গ্রাম থেকে আসা ছেলে-মেয়েরা কাজ করে এমন আর নেই বিষয়টা। উচ্চ শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরাও এখন ডেলিভারি পার্সন হিসেবে কাজ করছে। আমরা এই বিষয়টা খুব পজেটিভলি দেখছি।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ডেলিভারি পার্সন সজীব আহমেদ বলেন, সাইকেলে বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই ঘুরতে বের হতাম ব্যায়ামের জন্য। গত লকডাউনে সব বন্ধ থাকায় সাইকেল নিয়ে ফুড পান্ডায় ডেলিভারি পার্সন হিসেবে কাজ শুরু করলাম। দূরত্বভেদে প্রতি পার্সেলে ৩০-৪০ টাকা করে আমি পাই। সেক্ষেত্রে দুই থেকে ৩ ঘন্টায় ১০-১২ টি পার্সেল ডেলিভারি করা যায়। প্রতিদিন ৩ ঘন্টা সাইকেল চালিয়ে সাড়ে তিনশ থেকে ৪০০ টাকা আয় করা যাচ্ছে। আবার ব্যায়াম, ঘোরাঘুরিও হচ্ছে।

নাদভী কিচেনের স্বত্বাধিকারী নাহিদা সুলতানা বলেন, ‘আমাদের করা খাবার সময়মতো ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে কুরিয়ারগুলো যথেষ্ট সহযোগিতা করছে। আমি যেহেতু খাবার বিক্রি করি, সাবধানে প্যাকেজিং করে দেই। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। বরং দ্রুত খাবার পেয়ে অনেক ক্রেতা সন্তুষ্ট হয়েছেন।’