১০ মিনিটের গরম বাতাসে কৃষকের সর্বনাশ, সব ধানে চিটা

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের শেফালী বিশ্বাস (৫৮)। ঘরে অসুস্থ পঙ্গু স্বামী আর চার মেয়ে। এবার ৩ বিঘা জমিতে ধান বুনে স্বপ্ন দেখেছিলেন ঘরে তোলার। যাতে সারা বছরের খাবার যোগান হয়। কিন্তু কালবৈশাখী ঝড়ের পরেই মাত্র কয়েক মিনিটের গরম বাতাসে তার সেই স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। এখন চিন্তায় রয়েছেন কীভাবে যোগান হবে সারা বছরের খাবার। কীভাবেই বা চলবে সংসার।

শুধু শেফালী বিশ্বাসই নয় তার মত একই অবস্থা ওই গ্রামের অপর্ণা রানী খান, দয়ানন্দ ঘরামী, জুড়ান বিশ্বাস, সুরেশ সেন, চিত্তরঞ্জন ঘরামী, দেবাশিষ মণ্ডলসহ জেলার চার উপজেলার শত শত কৃষকের।

এক রাতের মধ্যে শত শত হেক্টর জমির ধানের শীষ সবুজ থেকে সাদা হয়ে নষ্ট হয়েছে। কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন লু হাওয়ার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। জেলার অন্তত ১০টি ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। ইতিমধ্যে কৃষি বিভাগ খবর পেয়ে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠে নেমেছে।

সরেজমিনে ও গোপালগঞ্জ কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জে এ বছর ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এসব জমিতে এখন ধানের ফ্লাওয়ারিং স্টেজ চলছে। কিন্তু হঠাৎ করে গত রবিবার রাতে জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া, তাড়াইল, পাকুরতিয়া, লেবুতলা, বর্ণি, কুশলী, পাটগাতী, বরইহাটি ও গোপালপুর, কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের মাচারতারা, আমতলী, তালপুকুরিয়া, কান্দি, হিরণ ও আমতলী, কাশিয়ানী উপজেলার রাতইল ও সদর উপজেলার চর মানিদাহ গ্রামের উপর দিয়ে কাল বৈশাখীর গরম হাওয়া প্রবাহিত হয়।

এরপর সোমবার সকালে কৃষকেরা তাদের জমিতে গিয়ে দেখেন সব ধান সাদা হয়ে গেছে। ক্ষেতের উঠতি বোরো ধানের শীষে যে গুলোতে কেবল মাত্র ‘দুধ’ এসেছে সেই ধানের শীষ সব চিটায় পরিণত হয়ে সাদা বর্ণ ধারণ করেছে। যেসব জমিতে ধানের ফ্লাওয়ারিং হচ্ছে সে সব জমির ধান গরম বাতাসে পুড়ে গিয়ে সাদা বর্ণ ধারণ করেছে। এতে উৎপাদনের প্রায় শতকরা বিশ ভাগ ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আর এতে জেলার শত শত কৃষক কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। সারা বছর কী খেয়ে দিন কাটাবেন এখন সেই চিন্তায় পড়েছেন তারা। ধার দেনা, ব্যাংক লোন ও ঋণ নিয়ে এসব কৃষকরা তাদের জমিতে ধানের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু ধান নষ্ট হওয়ায় কীভাবে ধার দেনা ও ঋণ শোধ করবেন সেই চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের দয়ানন্দ ঘরামী ও জুড়ান বিশ্বাস বলেন, রাতে গ্রামের উপর দিয়ে কাল বৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। মাত্র বিশ মিনিটের গরম বাতাসে আমার জমির ধানের শীষ শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারবো না। সারা বছর পরিবার পরিজন নিয়ে কী খাবো চিন্তায় শেষ এখন।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জামাল উদ্দিন বলেন, কৃষকরা খবর দেয়ার পর আমি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানে গিয়ে দেখি জমির ধানগুলো সাদা বর্ণ ধারণ করে নষ্ট হয়ে গেছে। এ বছর টুঙ্গিপাড়ায় ৮ হাজার ৬শ’ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

জেলার বিভিন্ন স্থানে ধান নষ্ট হবার কথা স্বীকার করে গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. অরবিন্দ কুমার রায় বলেন, গরম বাতাসে জেলার টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও সদর উপজেলার বোরো ধানের বেশ ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে মাঠে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষতির পরিমাণ লিপিবদ্ধ করার জন্য বলা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বিষয়টি ভাঙ্গা ধান গবেষণা ইনিষ্টিটিউটকে জানানো হয়েছে। তাদের একটি দল গোপালগঞ্জে এসে বিষয়টি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখবেন। এরপর তারা আমাদের জানিয়ে করণীয় ঠিক করবেন।