সরকারের কঠোরতা নয়, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জরুরি

বিভুরঞ্জন সরকার : নতুন করে করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার বাড়তে থাকায় সরকার আমাদের দেশে ৫ এপ্রিল, সোমবার থেকে লকডাউন ঘোষণা করেছে। প্রাথমিকভাবে সাত দিনের জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। প্রয়োজনে অর্থাৎ সাত দিনের মধ্যে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা না কমলে লকডাউন আরো বাড়তে পারে। গত বছর মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত এবং মৃত্যুর পর পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল। ২৬ মার্চ শুরু হয়ে ওই ছুটি চলেছিল ৬৬ দিন। সারাদেশে লকডাউনের পরিবর্তে স্থানে স্থানে লকডাউন বা অবরোধ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু করোনার বিপদ নিয়ে আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব লক্ষ করা গেছে। করোনার তেমন কোনো চিকিৎসা নেই। তারপরও নানা সীমাবদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি-অনিয়ম, স্বাস্থ্যখাতের অদক্ষতা স্বত্ত্বেও আমাদের অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবাদান অব্যাহত রেখেছেন।

গত এক বছরে আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমাদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে হয়তো কিছু ধারণা হয়েছে। এই এক বছরে আমরা অনেককে হারিয়েছি। তারপরও অন্য অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল তা হয়নি। যেভাবেই হোক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। আশা করা হয়েছিল, করোনার টিকা আবিষ্কার হলে এই মহামারি থেকে মানুষের জীবন রক্ষা করা সহজ হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নিরলস সাধনার ফলে স্বল্পতম সময়েই কয়েকটি দেশে করোনার টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। আবিষ্কৃত টিকাগুলো শতভাগ কার্যকর কিনা তা নিয়ে কিছু সংশয় থাকলেও এটা যে সংক্রমণ বিস্তার রোধে সহায়ক হবে তা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়ার পর টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সব দেশের সব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত টিকা উৎপাদন এখনও সম্ভব না হলেও কয়েকটি দেশে টিকার প্রয়োগ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও জরুরিভাবে করোনার টিকা সংগ্রহে সফলতা দেখিয়েছে। ৫০ লাখের মতো মানুষকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে।

তবে আশঙ্কার কথা হলো করোনাভাইরাস এক বছরের বেশি সময় পরেও দুর্বল না হয়ে আরও প্রথম দফার থেকে বেশি মারণ-ক্ষমতা নিয়ে দেশে দেশে মানুষের ওপর হামলে পড়ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নেই। গত কয়েকদিনে করোনার ভয়াবহতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সেজন্য লকডাউন দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লকডাউন করোনা প্রতিরোধের একমাত্র কিংবা ধন্বন্তরি উপায় নয়। স্বাস্থ্যবিধি মানা অর্থাৎ মাস্ক ব্যবহার করা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত সাবান দিয়ে ঘন ঘন ধোয়া– এসবই হচ্ছে করোনা প্রতিরোধের কার্যকর উপায়।

কিন্তু এসব বিষয়ে আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। করোনা সংক্রমণ যে বাড়ছে তার জন্য অনেকে ভাইরাসের নতুন নতুন রূপান্তরকে যতটা দায়ী করছেন তার চেয়ে বেশি দায়ী করছেন মানুষের উদাসীনতা ও খামখেয়ালিপনাকে। বলা হচ্ছে, যেকোনো ভাইরাস টিকে থাকার জন্য তার রূপ পরিবর্তন করবে, এটাই স্বাভাবিক। এই পরিবর্তনের ফলে কখনো আরো শক্তিশালী হয়, কখনো আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। করোনাভাইরাসও প্রতিনিয়ত তার রূপ বদল করছে। কিন্তু সে আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটির যে নতুন ধরন দেখা দিচ্ছে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে, বলা হচ্ছে সেটির সংক্রমণক্ষমতা বেশি; কিছুদিন আগে বাংলাদেশে এই ধরনের করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। এজন্যই বাংলাদেশে নতুন বিপদ দেখা দিল কিনা তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে বাস্তব হলো গত বছরের চেয়ে এবারের ভাইরাস বেশি দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে।

আমাদের দেশে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি কোনো সময়ই তেমন গুরুত্ব পায়নি। মাস্ক ছাড়া লোকজন ঘোরাফেরা করছে। গণপরিবহনে গাদাগাদি করে চলা, রাস্তাঘাটে আড্ডা, বিয়েশাদি, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে হুমড়ি খেয়ে পড়া, ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন, হেফাজতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমাবেশ,, বিক্ষোভের মতো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করোনার বিরুদ্ধে সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার বদলে প্রতিরোধ ব্যুহ ভেঙে দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এখন আর কেউ সুরক্ষিত নয়, প্রতিদিন বেশি বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠছে ।

এই অবস্থায় লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। লকডাউনের সময় সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। অফিস-আদালত সীমিত পরিসরে চলবে। শিল্পকারখানা ও নির্মাণকাজ চলবে, তবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের আনা-নেওয়া করতে হবে। গণমাধ্যমসহ জরুরি সেবা চালু থাকবে। ব্যাংক লেনদেন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চালু থাকবে। শপিংমলসহ অন্যান্য দোকানপাট বন্ধ থাকবে তবে কাঁচা বাজার ও নিত্যপণ্য কেনাবেচা চলবে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। হোটেল-রেস্তরাঁ খোলা থাকবে কিন্তু বসে খাওয়া যাবে না।

এই সব নির্দেশনা নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি আছে। কিছু বিষয় অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। জরুরি কাজের সংজ্ঞা কি – তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। দোকানপাট বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার প্রতিবাদে লকডাউনের প্রথম দিনেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসায়ী-কর্মচারীরা বিক্ষোভ করেছেন। কোথাও কোথাও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

কিছু জিনিস খোলা, কিছু বন্ধ – এটা কার্যকর করা কঠিন। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কলকারখানা চালু রাখার যে কথা বলা হয়েছে, তা-ও বাস্তবসম্মত নয়। গণপরিবহন বন্ধ করায় অনেকেরই যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাবে। রিকশা ভাড়া প্রথম দিনই বেড়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তগুলো খুব ভেবেচিন্তে নেওয়া হয় বলে মনে হয় না। একদিকে মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের কথা বলে অন্যদিকে কিছু মানুষকে বাইরে রাখার মাধ্যমে আসল যে লক্ষ্য – ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ, সেটা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

আমাদের দেশে আইন না মানার একটি প্রবণতা অনেকেরই আছে। সরকার বলপ্রয়োগ না করলে অনেকেই বিধিবিধান মানতে চায় না। লকডাউন যে খুন সফল হবে না তার কিছু আলামত প্রথম দিনই পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে বলপ্রয়োগ না করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার কাজ পুলিশ করবে বলে জানানো হয়েছে। তবে অভিজ্ঞ জনেরা মনে করেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে সরকার কঠোর না হলে একক ব্যক্তি-সচেতনতায় কোনো কাজ হবে না। সরকার কিছুদিন ট্রেনে যাত্রীর সংখ্যা আসনসংখ্যার চেয়ে অর্ধেক করেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ট্রেনের টিকিটের অর্ধেক ছেড়ে বিনা টিকিটের সমানসংখ্যক লোকজন উঠিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফাঁকা আসনগুলোতে বসিয়ে দিয়েছে। আবার যখন সরকার সব আসনের টিকিট ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দিল, তখন রেল কর্তৃপক্ষ সব আসন পূর্ণ করে আগের মতো লোকজনকে গাদাগাদি করে দাঁড় করিয়ে নেয়া শুরু করল। সেখানে বেশিভাগ যাত্রীর কোনো মাস্ক নেই, এ নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষেরও মাথাব্যথা নেই, বরং তারাও মাস্ক ছাড়া ট্রেনে ঘোরাঘুরি করেছে।

টিকা নিলেই যে করোনার আশঙ্কামুক্ত হওয়া যাবে– এটা বহুবার বলা হলেও দেখা গেছে , প্রথম ডোজ টিকা নিয়ে কেউ কেউ মাস্ক ছাড়া ঘোরাফেরা করেছেন। বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে গিয়ে কেউ কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ করোনার টিকা নিলেই তার আর করোনা হবে না, এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারছেন না। উপসর্গ কম হতে পারে, জটিলতা কমতে পারে , মৃত্যুর হারও কমে যেতে পারে কিন্তু দেশের ৭০-৮০ ভাগ লোক টিকার আওতায় না এলে সংক্রমণ রোধে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যাবে না। তাই যত দ্রুত সম্ভব সবার টিকা নেওয়ার বিকল্প নেই। টিকার দুই ডোজের মধ্যে মাস দুয়েকের ব্যবধান থাকলে অ্যান্টিবডি ভালো কাজ করে বলে বলা হচ্ছে । সেজন্য দুই ডোজ টিকা নেওয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেও সতর্ক থাকতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে ।

করোনাভাইরাসের শুরু থেকেই বলা হচ্ছে, করোনা প্রতিরোধে মাস্কের বিকল্প নেই। সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। উদাসীনতা ও খামখেয়ালিপনা পরিহার করে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে,স্বাস্থ্য বিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। সরকার কঠোর না হলে আমরাও কঠোর হবো না– এই মনোভাব নিয়ে চললে বিপদ বাড়বে। মনে রাখতে হবে, করোনার কারণে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। অনেকের আয়রোজগার কমেছে। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষদের অবস্থা খুবই খারাপ। করোনায় বাঁচলেও না খেয়ে মরার পরিস্থিতি যেন কোনোভাবেই তৈরি না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে সবার সম্মিলিত চেষ্টায়। সব বিষয়ে সরকারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আত্মসচেতনতার মাধ্যমে নিজের এবং আপনজনদের জীবন রক্ষায় সচেষ্ট হওয়াই এখন সময়ের দাবি। সরকারের কঠোরতা মানে বলপ্রয়োগ। আর বলপ্রয়োগের ফল কখনই ভালো হয় না। তাই করোনা মোকাবিলায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেই তৈরি হতে পারে নতুন দৃষ্টান্ত।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।