করোনায় খেয়াল বেখেয়াল

 সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : 

করোনা পরিস্থিতির হঠাৎ অবনতি ঘটায় গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘আমাদের বেখেয়ালি চলাফেরা আগামীতে আরও বিপর্যয় ডেকে আনবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য বলেননি তার মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতর কতটা খেয়ালি ছিল এবং আছে।

খেয়ালের কিছু নমুনা দেওয়া যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এক বছরেরেও বেশি সময় ধরে, কিন্তু কওমি মাদরাসা খোলা। এত কথা হলো, কিন্তু বইমেলার আয়োজন ঠিকই করা হলো। বিসিএস পরীক্ষা নেও্য়া হলো, প্রচুর পরীক্ষার্থী অংশ নিলেন। গণপরিবহন খোলা, মার্কেট খেলা, পর্যটন ও বিনোদন স্থানগুলোয় উপচে পড়া ভিড়। বিয়ে, জন্মদিনের অনুষ্ঠান ধুমধাম করে চলেছে। কোথাও কোনো ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল না। স্বাস্থ্যবিধি কাকে বলে তার কোনো বালাই ছিল না। খুব খেয়াল করেই হয়তো করোনার মধ্যে মহা আয়োজনে পৌরসভা নির্বাচনও করা হলো।

করোনা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে এখন বাংলাদেশ। খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, উচ্চ সংক্রমণ রয়েছে এমন ৩১টি জেলার মধ্যে ১১টি জেলা ঢাকা বিভাগে এবং ১৫টি জেলায় আইসিইউ নেই। করোনার প্রথম ধাক্কায় ঢাকায় রোগী বেশি ছিল এবং ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে সংক্রমণের নিম্ন হার ছিল। কিন্তু এবার দেখা গেল প্রায় সব জেলায়ই নতুন রোগী বাড়ছে।

খেয়ালের আরেক দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা করা। গত বছরের ২ জুন একনেকের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে প্রতিটি হাসপাতালে ভেন্টিলেটর স্থাপন এবং উচ্চমাত্রার অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা বাড়াতে বলেন তিনি। এ জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার নির্দেশও দেন। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেওয়ার পরও জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ করা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে করোনার জটিল রোগীদের আইসিইউর চেয়েও উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন বেশি হয়। এ জন্য জেলা হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্তসংখ্যক অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা থাকা প্রয়োজন।

ব্যবস্থাপনার হ-য-ব-র-ল অবস্থায়ই এক সময় আক্রান্তের সংখ্যা কমায় একশ্রেণির মানুষের অতি উচ্ছ্বাস বিপদ ডেকে এনেছে। এ সময়টায় প্রশাসনের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসটাও দেখেছি আমরা। সবকিছু স্বাভাবিক করার নেশায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সব খুলে দেওয়া ছিল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের বড় দৃষ্টান্ত। এ কারণে নাগরিকদের বড় একটা অংশ যেভাবে করোনা বিধি শিকেয় তুলেছেন, তাতে আবার বড় বিপদ সামনে এসেছে। একটা পরিসংখ্যান প্রতিদিন দেওয়া হচ্ছে, এতে দেখা যাচ্ছে মৃত্যু ও সংক্রমণ দুটোই বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। সবাই আক্রান্ত হচ্ছেন সেটা যেমন নয়, তেমনই বেশি বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, এটাও সত্য।

যারা প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন এরা খেয়ালি হয়েছে, ভেবেছেন তারা ইমিউনিটি পেয়ে গেছেন। আরেক দল হলো, যাদের একার করোনা হয়ে গেছে। একবার করোনা হয়ে গেছে, আর কিছু হবে না—কিছু মানুষের এহেন ভ্রান্ত ধারণা নতুন করে বিপদ বাড়িয়েছে।

সরকারের খেয়ালের আরেক দিক আকাশপথে যাত্রী আসা যাওয়া। সারাবিশ্বের মানুষ জানল, দ্বিতীয় ঢেউয়ে যুক্তরাজ্যসহ সারা ইউরোপে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ইউ কে ভ্যারিয়েন্ট অনেক বেশি আগ্রাসী। নানা দেশ যুক্তরাজ্যের সাথে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ঠিক তা বজায় রাখে। লন্ডন থেকে দলে দলে মানুষ এসেছে এবং তারা কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম ভেঙে সর্বত্র ঘুরে বেরিয়েছে। এমনকি হোটেল থেকে পালানোর ঘটনাও ঘটেছে।

এই মুহূর্তে যখন অতিরিক্ত সতর্কতার কথা সরকার নিজেই বলছে, তখনও এক আজব সিদ্ধান্ত পাওয়া গেল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাজ্য ছাড়া পুরো ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের ১২টি দেশ থেকে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। ১২টি দেশ হচ্ছে- আর্জেন্টিনা, বাহরাইন, ব্রাজিল, চিলি, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, পেরু, কাতার, সাউথ আফ্রিকা, তুরস্ক ও উরুগুয়ে। ৩ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। যুক্তরাজ্য এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই। কেন নেই তার কোনো ব্যাখ্যাও নেই। বিষয়টা যেন এমন যে, যে উরুগুয়ে থেকে দশ বছরে পাঁচজন লোকও আসবে না, সেই উরুগুয়ে থেকেও যুক্তরাজ্য অনেক বেশি নিরাপদ। ইউ কে ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে ঢুকেছে ডিসেম্বরে। দুই মাস তা প্রকাশই করা হয়নি। এখন সংক্রমণ সর্বোচ্চ। বিশ্বের ৯০টি দেশে ছড়িয়েছে ইউ কে ভ্যারিয়েন্ট। তাহলে কিছু দেশের সাথে এখন বিমান চলাচল বন্ধ রেখে লাভ কী? এবং খোদ ইউ কে’র সাথে বিমান চলাচল স্বাভাবিক রেখে?

সরকার কতটা খেয়ালি তার আরেকটা দিকও আমরা দেখলাম। হঠাৎ ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়ে বলা হলো, গণপরিবহন চলবে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে, এ জন্য ভাড়াও বাড়িয়ে দেওয়া হলো ৬০ শতাংশ। কিন্তু অফিস-আদালত খোলা। তাহলে মানুষ কি করে যাবে? রাস্তায় রাস্তায় করোনাকে উপেক্ষা করে শত সহস্র মানুষের জটলা, বিক্ষোভ। করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহনে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসে গত বুধবার। এ নিষেধাজ্ঞা আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য বা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। কিন্তু এই মানুষগুলোর জীবন কি করে চলবে? তাই রাজপথে এখন বিক্ষোভ করছেন পাঠাও, উবারের চালকরা।

সরকার কি কেবল সরকারি কর্মীদের জন্য? বলে দেওয়া হলো সরকারি অফিস চলবে অর্ধেক লোকবল নিয়ে। মানুষের ভাবনা কোথায় করোনা বিষয়ক সরকারি সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনায়? একটা বছর চলে গেল। এক বছর আগে করোনার শুরুতে হাসপাতাল বেড, আইসিইউ এবং অক্সিজেনের সঙ্কট ছিল। এক বছর পর তা আরও বাড়ল। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ব্যবস্থাপনার উন্নতিটা আমরা এমন খেয়াল করেই দেখছি।

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।