তরুণদের বিভ্রান্ত করবেন না, প্লিজ…

রেজানুর রহমান :

ক্ষমা করবেন এই লেখাটির জন্য। তারুণ্য,আর দশ জনের মতো আমারও পছন্দের বিষয়। দেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন বাজি রেখে তরুণরাই সামনের কাতারে এগিয়ে ছিল। বর্তমান সময়ে খেলাধুলা,ব্যবসা-বাণিজ্য,সাংবাদিকতা এবং আইটি সেক্টরসহ নানা ক্ষেত্রে মূলত তরুণরাই নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু তরুণদের কথা লিখতে গিয়ে ক্ষমা চাইছি কেন? কী এমন ঘটলো যে ক্ষমা চাইতে হবে?

মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আমরা সামনে থেকে চোখের দেখা যা দেখি সেটাই কি আসল সত্য? খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাংবাদিকতা, আইটি সেক্টরে আমাদের তরুণদের ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে। কিন্তু এটা হলো চোখের দেখা। সামনা-সামনি দেখা। তবে যা কিছু দেখতে পাই না তা মোটেই সুখের নয়। দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ একটু যেন বিভ্রান্ত, দিশাহীন। আমরা অনেকেই তা জানি। অনেকে আড্ডা, আলোচনায় সে কথা বলিও। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, যেখানেই কোনও ঘটনা সেখানেই তরুণদের উপস্থিতি। পকেটমার ধরা পড়েছে। তাকে ধোলাই করতে হবে? কেউ একজন শুরু করলেই দেখবেন উৎসাহী তরুণের অভাব হয় না। বুঝে না বুঝে ‘ধোলাই’ শুরু হয়ে গেলো। হয়তো বিপদে পড়েছে কোনও মানুষ। সে ক্ষেত্রে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধারের চেয়ে সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে অনেকে। অথবা ফেসবুকে লাইভ টেলিকাস্ট শুরু করে দেয়। অথচ ‘লাইভ’ না করে সে যদি আশপাশের আরও কিছু মানুষের সহায়তা নিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষটির পাশে দাঁড়ায় তাহলে হয়তো অসহায় মানুষটি বেঁচে থাকার সাহস করতে পারে। রাস্তায় মিছিল নেমেছে। কোনও কিছু না বুঝেই মিছিলে নেমে যায় অনেক তরুণ। গাড়ি ভাঙে,পথচারীদের হুমকি দেয়। কেন সে এটা করে নিজেও জানে না। অথচ অতীতকালে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঝোঁকটাই বেশি ছিল তরুণদের মধ্যে। বিপদগ্রস্ত মানুষ পাশে কোনও তরুণকে দেখলে বুকে সাহস পেতো। তরুণদের মিছিল দেখলে সাহস করে এগিয়ে এসে বাহবা দিতো। আর ইদানীং তরুণদের মিছিল দেখলে অনেকেই ভয়ে সটকে পড়ে। পাছে না কোনও বিপদে পড়ি! এই ভয়ে মিছিলের মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহস করেন না অনেকে।
এই তো মাত্র দু’দিন আগে আমাদের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার হলো। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালা চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুরু হয়েছে বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে বইমেলা। বইমেলায় যাবার জন্য টিএসসি এলাকা অতিক্রম করছিলাম। হঠাৎ দেখি এলাকায় মানুষের ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেলো। ঘটনা কী? ঘটনা হলো মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন উপলক্ষে একটি ছাত্র সংগঠনের মিছিল আসছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মিছিল। হোক না কোনও ছাত্র সংগঠনের মিছিল। সাধারণ মানুষও তো ওই মিছিলে অংশ নিতে চাইবে। অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও হাততালি দিয়ে মিছিলটিকে তো স্বাগত জানাতে চাইবে অনেকে। কিন্তু সে সুযোগ কোথায়? মিছিলের অধিকাংশ মুখে অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাবার ছায়া স্পষ্ট। সরে যান সরে যান… বলে কয়েকজন তরুণ পথচারীদের হুমকি দিচ্ছে। সামনে একটা রিকশাকে ধাক্কা দিয়ে উল্টে ফেলে দিলো তারা। চরম একটা ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হল। চলন্ত গাড়ির ড্রাইভার অর্থাৎ চালককে গালাগাল দিচ্ছে তরুণদেরই একজন– অয় মিয়া কানে বাতাস যায় না? গাড়ি সরাও…।

ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সবকিছুই দেখলাম। মিছিলকে ভয় পাচ্ছে কেন সাধারণ মানুষ? আবার মিছিলকারীরাই বা ভয় দেখাচ্ছে কেন? কাজটা অর্থাৎ চর্চাটা কি ঠিক হচ্ছে? একসময় সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা ছিল তরুণদের মিছিল। এখন কেন তারা তরুণদের মিছিল দেখে ভয় পায়?

একুশে বইমেলার কথা যখন উঠলো তখন এবারের বইমেলারই একটি ঘটনা বলি। যে ঘটনায় আমি যারপরনাই ক্ষুব্ধ,ব্যথিত এবং লজ্জিতও বটে। কোন পরিস্থিতিতে ফেব্রুয়ারির বইমেলা মার্চে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এটা আমরা সবাই জানি। স্বীকার করতেই হবে, নানান প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ এবারের বইমেলাকে অন্যবারের তুলনায় আরও সুন্দর করে সাজিয়েছে। দেখে মনে হবে ছবির মতো সাজানো সবকিছু। যেহেতু মহান স্বাধীনতার মাস পেয়েছে এবারের একুশে বইমেলা, তাই মেলা মাঠে এবার একটি নতুন আয়োজন করেছে মেলা কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ বাংলা একাডেমি। সুদৃশ্য একটি বোর্ড স্থাপন করেছে মেলার মাঝ মাঠে। বোর্ডের মাথায় লেখা রয়েছে ‘হে স্বাধীনতা’ লিখুন আপনার কথা। অর্থাৎ প্রিয় স্বাধীনতা সম্পর্কে কার কী ভাবনা এটা দেখার জন্যই বাংলা একাডেমি বোর্ডটি স্থাপন করেছে। খুশি মনে বোর্ডটির সামনে দাঁড়ালাম। অসংখ্য মন্তব্য লেখা হয়েছে বোর্ডটিতে। মন্তব্যগুলো পড়তে গিয়ে হোঁচট খেলাম। স্বাধীনতার বোর্ডে এসব কি লিখেছে তরুণেরা? ভুল দেখছি না তো? না, ভুল দেখছি না। লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারছি না। কয়েকজন তরুণ বোর্ডের বিভিন্ন মন্তব্য পড়ছে আর নিজেরা হাসাহাসি করছে। সাহস করে আবার বোর্ডটির দিকে তাকালাম। অশালীন, অশোভন মন্তব্যে ভরে গেছে বোর্ডটি। লিখতে বলা হয়েছে দেশের স্বাধীনতা নিয়ে। অথচ শতকরা ৯০ জনই লিখেছে তার প্রেমিকার কথা। নারীর শরীরের অশ্লীল বর্ণনাও স্থান পেয়েছে বোর্ডটিতে।

বোর্ডটির সামনে অনেকক্ষণ অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম। মনে অনেক প্রশ্ন। স্বাধীনতার বোর্ডে এই যে তরুণেরা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য লিখলো এজন্য দায় কার? বাবা মা? শিক্ষক-শিক্ষিকা? নাকি সমাজের? অনেকে হয়তো বলবেন, এটা আমাদের তরুণ প্রজন্মের আসল চিত্র নয়। মানলাম এটা আসল চিত্র নয়। কিন্তু আমরা বোধকরি একটা বিষয় সবাই জানি যে এক বালতি দুধকে নষ্ট করতে এক ফোঁটা তেঁতুলের টকই যথেষ্ট। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম একাডেমির বইমেলায় স্বাধীনতার বোর্ডে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য লেখা তরুণেরা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করে না। কাজেই এ নিয়ে না ভাবলেও চলবে। তবু কথা থেকে যায়। তরুণ প্রজন্মের এরাও একটি অংশ। কাজেই বিষয়টিকে গুরুত্বহীন ভাবলে আমরা ভুল করবো।

গ্রামের সঙ্গেই তো আমাদের নাড়ির সম্পর্ক। খেয়াল করেছেন কি গ্রামেও তরুণদের মধ্যে একটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে। শহরের চেয়ে গ্রামের তরুণদের মধ্যে ফেসবুকচর্চা প্রকট। রাত দিন ২৪ ঘণ্টা মোবাইল নিয়েই পড়ে থাকে অনেকে। পাশাপাশি বেড়েছে দলবাজি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখবেন জাতীয় পর্যায়ের নেতা-নেত্রীদের ছবির সঙ্গে নিজের ছবি যুক্ত করে দিয়ে ব্যানার টানার তীব্র প্রতিযোগিতা স্পষ্ট। লেখাপড়ার কোনও খোঁজ নেই। অথচ অনেকেই ছাত্র সংগঠনের নেতা! অনেকেই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আদর্শ-উদ্দেশ্য সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। শুধু জানে নেতার জন্য মিছিল করতে হবে। মিছিলে লোক আনতে হবে। মিছিল করতে করতেই একদিন বড় নেতা হতে হবে… তরুণদের অনেকের মধ্যেই এই প্রতিযোগিতা স্পষ্ট।

ধর্মভিত্তিক অনেক রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ ও মিছিলে তরুণদেরই সামনের কাতারে রাখা হয়। চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহিংস ঘটনায় অসংখ্য তরুণকে দেখলাম জ্বালাও, পোড়াওর মতো নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। ওরা কি সবাই জানে কেন তারা এসব করছে? এতে দেশের কতটুকু লাভ হবে? দেশের লাভ না হোক, নিজেদেরই বা কতটুকু লাভ হবে? জানে কী ওরা?

আমরা কথায় কথায় বলি শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষতিকর কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাং প্রতিপক্ষকে খুন করতেও দ্বিধা করছে না। প্রায় সব রাজনৈতিক দলের মিছিল মিটিংয়ে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় টাকার বিনিময়ে। ফলে নেতানেত্রীর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য অনেক কিশোর ভয়ানক সন্ত্রাসী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এ তো এক ভয়ংকর খেলা?

দেশের জন্য ক্ষতিকর এই প্রবণতায় শেষ কোথায়? কার কাছে জবাব খুঁজবো? জাগো বাহে কোনঠে সবায়!

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার; সম্পাদক, আনন্দ আলো

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।