ধারণার চেয়ে এগিয়েছে আফ্রিকার শিল্পায়ন

মিরর ডেস্ক : যতটা ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছে আফ্রিকার শিল্পায়ন। অনেকেই এ নিয়ে বেশ আশাবাদী। ইউরোপে ১৮ বছর কাজ ও পড়াশোনা করার পর দেশে ফেরেন ইব্রাহিম সর। দেশের জন্যই তার ফিরে আসা। তিনি নিজের দেশের শিল্পায়ন-প্রক্রিয়ায় সাহায্য করছেন।

সেনেগালে তিনি যে কারখানাগুলো চালাচ্ছেন তার দিকে ইঙ্গিত করে ইব্রাহিম সর বলেন ‘ভবিষ্যত এখানে’। তিনি আফ্রিকা ডেভেলপমেন্ট সলিউশন নামের একটি মালিয়ান বানিজ্য-সংস্থার সাথে আছেন যারা এখানে বৈদ্যুতিক বাইক ও পাইপ তৈরির অনেকগুলো কারখানা পরিচালনা করছে। শিগগিরই তারা পোশাক তৈরির কারখানাও প্রতিষ্ঠা করবেন।

আফ্রিকার শিল্পায়ন নিয়ে ইব্রাহিম একাই আশাবাদী নন। সেনেগাল তার উচ্চাভিলাষী শিল্পায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণ করেছে। আফ্রিকার অন্য দেশ ঘানা ফক্সওয়াগন ও নিশানের মতো শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিগুলোকে তাদের দেশে কারখানা স্থাপন করার আহ্বান জানাচ্ছে। ঘানায় কারখানা স্থাপন করলে গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিগুলোকে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঘানা সরকার। আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়াও এ ক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ করছে।

শুধু তাই নয়, আফ্রিকায় এখন জন্ম হচ্ছে ইউসুফ বিলেসনমির মতো আবিস্কারকদের; যিনি কিছুদিন আগে খুবই কম খরচে নির্মান করা যায় এমন একটি ভেন্টিলেটর আবিষ্কার করেছেন। ভেন্টিলেটরটি বিদ্যুতবিহীন হাসপাতালেও ব্যবহার করা যাবে। কোভিড -১৯ রোগীদের চিকিৎসায় এটিকে কাজে লাগানো যাবে। তার এই আবিস্কারটি রয়্যাল একাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আফ্রিকা পুরষ্কারের জন্য মনোনয়নের সংক্ষীপ্ত তালিকায় রয়েছে।

মহামারির কারণে যখন আফ্রিকায় চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, তখন আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় তিনি এটি উৎপাদন করতে চান। আফ্রিকানদের এরকম নিজস্ব আবিস্কারগুলো উৎপাদনে গেলে সেখানেও প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যানি রড্রিক ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধে দাবি করেছিলেন, সাব-সাহারান আফ্রিকার কারখানাগুলোতে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। মোট দেশজ উৎপাদনে কারখানাগুলোর অংশীদারিত্বের হারও কমে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এর বিপরীত চিত্রই প্রকাশ করছে। গ্রোনিঞ্জেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যাগেন ক্রুস ও অন্যদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সাব-সাহারান আফ্রিকায় শিল্প কারখানাগুলোতে এখন কাজ করছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ, ২০১০ সালে কাজ করতো ৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ। শ্রমিক বৃদ্ধির এই হার এশিয়ার দেশগুলোর সাথে তুলনীয়। এ ছাড়া মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প কারখানাগুলোর অংশীদারিত্ব এখন প্রায় ১১ শতাংশ।

টাফটস ইউনিভার্সিটির মার্গারেট ম্যাকমিলান বলেন, আফ্রিকার শিল্পায়ন-প্রক্রিয়া মন্থর হয়ে যাচ্ছে বলে যে অনুমান এটির কেনো ভিত্তি নেই। বিশ্ব ব্যাংক সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে বলেছে, সাব-সাহারান আফ্রিকায় শিল্পায়ন-প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। এমন কি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যানি রড্রিক নিজেও এখন অনেক বেশি আশাবাদী। তিনি মনে করেন ভবিষ্যতে আফ্রিকার বহু দেশে শিল্প কারখানাগুলোতে ২০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। এটি বর্তমান সংখ্যার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি।

তবে এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক অনেক খবরও আছে। এর মধ্যে একটি হলো আফ্রিকান দেশগুলোতে কারখানা ও শ্রমিকের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে উত্পাদন সেই হারে বাড়ছে না। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, তানজানিয়া ও ইথিওপিয়ায় বেশিরভাগ নতুন কারখানা গড়ে তুলেছেন নতুন ও অদক্ষ উদ্যোক্তারা। এগুলো আশানুরূপ পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না। বড় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন কিন্তু ঠিকই বেড়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক খাদ্য-নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি নতুন গবেষণাপত্র অনুসারে বড় কোম্পানিগুলো বেশি শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে না। কারণ উন্নত দেশগুলোতে পণ্য বিক্রয়ের জন্য তাদেরকে উৎপাদনের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মেশিন ব্যবহার করতে হয়। এই মেশিনগুলো পরিচালনায় শ্রমিকের প্রয়োজন হয় কম।

তবুও আফ্রিকার শিল্পায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বড় কোম্পানিগুলোর অংশিদারিত্বই বাড়াতে হবে। এটি সামগ্রিকভাবে উত্পাদনশীলতা বাড়াবে। প্রাথমিক পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়তো আশানুরূপ হারে বাড়বে না, কিন্তু কোম্পানিগুলো যদি আন্তর্জাতিক বাজারে সাফল্যের সাথে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে পারে, তবে শিগগিরই তারা এতো বেশি উত্পাদন করতে পারবে যে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা যদিও সহজ হবে না। কারণ আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশে শ্রমিকদের মজুরি (কিছু দেশ ব্যতিক্রম যেমন ইথিওপিয়া) এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর তুলনায় বেশি। আফ্রিকায় জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেশি।

কোভিড ১৯ মহামারির কারণে আফ্রিকার কোম্পানিগুলো কিছুটা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। অনেক পোশাক কারখানায় বিদেশি অর্ডার বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক পোশাক কারখানা বিকল্প হিসেবে এখন মাস্ক তৈরি করছে। ইব্রাহিম বলেন, এই মহামারি আফ্রিকার শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কোভিড -১৯ এর কারণে আমদানি বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে। আফ্রিকার চরম আমদানি নির্ভরতা যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে তা স্পষ্টই বোঝা গেছে। তিনি মনে করেন, যে উৎপাদন করে তার হাতেই ক্ষমতা।

সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট