আমরা করোনাকালেই আছি

তুষার আবদুল্লাহ :

বছর ঘুরে মার্চে এসে আবার যেন জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়লাম। সেই ২০১৯-এর ডিসেম্বর থেকে শুরু, আজ অবধি অদৃশ্য অনুজীবটিকে নিয়ে কত নীরিক্ষা – পরীক্ষা, কিন্তু বছর পেরিয়ে এসেও বুঝতে পারছি এখনও অধরা ওই অদৃশ্য অনুজীবটি। এমন অনুজীবের বিরুদ্ধে এক বছরের মধ্যেই লড়াই শেষ হওয়ার কথাও ছিল না। এমন অনেক অনুজীবের সঙ্গে শতকের পর শতক ধরে লড়াই চলেছে, কোনও কোনোটি নির্মূল হওয়ার পর আবার ফিরে এসেছে। তবে কোভিড- ১৯ এর এভাবে প্রযুক্তির এই উত্তুঙ্গ সময়ে পৃথিবীকে থামিয়ে দেবে এটা কারো ভাবনায় ছিল না। মহাকালে করোনা একটি কাল দখল করে রেখে দিল। এই কালের সমাপ্তি কবে হবে আমরা জানি না। প্রযুক্তি নির্ভর মানব সভ্যতার অহংবোধকে তছনছ করে দিয়েছে কোভিড-১৯। উন্নতির দাবিদার বা মোড়ল দেশ থেকে শুরু করে, বাংলাদেশ সকলের স্বাস্হ্যখাত কত ঠুনকো তার প্রমাণ মিলেছে এই করোনাকালে। এই সময়টাতেই আমরা মানুষের মানবিকতা যেমন দেখেছি, তেমনই দেখেছি বেহায়াপনা। যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতিসহ অনেক রাজনৈতিক নেতার কোভিড-১৯ নিয়ে মিথ্যাচার,জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ও কোভিডকে রাজনীতির গুটি হিসেবে ব্যবহার করতে দেখলাম, দেখছি। অদৃশ্য এই অনুজীব কোথায় কেমন ভাবে কাকে কাদের ঘায়েল করছে, করবে সবই অদৃশ্য। কিন্তু তারপরও তাকে বাগে আনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা নিয়েও রাজনৈতিক শক্তিগুলো ছেলেখেলা খেলেই যাচ্ছে। করোনাকালে শ্রমজীবী মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কাজ- ব্যবসা হারালেও, বড় বণিকেরা কিন্তু ঠিকই বিস্তার ঘটিয়েছে বাণিজ্যে। বিশেষ করে যারা লুটেরা তাদের আয় বেড়েছে। নতুন লুটেরা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও নাকি বেড়েছে কোটিপতির সংখ্যা। অদৃশ্য অনুজীবকে দমন নয়, নিয়ন্ত্রণ করার দাবি নিয়ে প্রতিষেধক উদ্ভাবন, নিরীক্ষা এবং বাজারজাতকরণ নিয়েও চলেছে, চলছে পরাশক্তির রাজনীতি ও বাণিজ্য। এর মধ্য দিয়েই একপ্রকার আত্মপ্রবোধ কাজ করতে থাকে, অদৃশ্য শক্তি আটকাতে প্রতিষেধক দিয়েছি, অতএব স্বাভাবিক জীবনে ঝাঁপ দেওয়া যায়। বিশ্ব মেতে উঠে প্রতিষেধক নিয়ে। এর সঙ্গে যেমন রাজনীতি আছে, বাণিজ্য আছে তেমনি আছে মানবিক তাগিদ। রুজিতে কোনোভাবে ফিরে আসার।

এই ফিরে আসার তাড়না বাংলাদেশেরও আছে। কোভিড-১৯ অর্থনীতিতে বড় ক্ষত তৈরি করেছে। সেই ক্ষত সারিয়ে তুলতে করোনাকাল থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। তাই সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে সকলেই প্রতিষেধক টিকা নিতে শুরু করেছেন। যে আতঙ্ক ছিল ডিসেম্বর জানুয়ারি নিয়ে, সেই সময়টা বাংলাদেশ নিরাপদেই পেরিয়ে এসেছে বলা যায়। শীতকালে হাঁপানি, নিউমোনিয়ার প্রকোপ কিছুটা বাড়লেও বাড়েনি করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। কিন্তু মার্চে অর্থাৎ ফাগুন মাসে উষ্ণতা বাড়তে না বাড়তেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যেতে থাকে। বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা। এর একটি বড় কারণ হলো, তিন শতাধিক বার চরিত্রবদলকারী অদৃশ্য অনুজীবটিকে বর্তমান রেখেই আমরা অতি স্বাভাবিক ও সামাজিক জীবন শুরু করেছি। সামাজিক দূরত্ব, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার অনুশীলন থেকে সরে এসেছি দূরে। একইভাবে গণ জমায়েত, সামাজিক জমায়েতের আয়োজন করে যাচ্ছি একের পর এক। বিদেশ থেকে প্রবাসীরা আসা-যাওয়া করছেন, নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখছেন কারো সঙ্গে। সহজ মেলামেশা করে যাচ্ছেন। দৈনন্দিন অফিস, বাজার, ইবাদতখানা, স্টেশন, সরাইখানা, হাসপাতাল সব আগের রূপে। ভুলে গেছি কোভিড-১৯ রূপ পাল্টে তার সংক্রমণের ধর্ম থেকে সরে যায়নি। বরং কয়েকটি দেশে আরও শক্তি সঞ্চয় করে ফিরেছে। অনেকে ভাবছেন প্রতিষেধকেই মুক্তি। তাই প্রথম ডোজ নেওয়ার পর স্বাস্হ্য সুরক্ষাকে গুরত্ব দেননি। কিন্তু দ্বিতীয় ডোজ নিলেও যে একশ ভাগ নিশ্চয়তা আছে কোভিড-১৯ আক্রান্ত না হবার, এমন দাবি কেউ করেনি। শূন্যের চেয়ে অনেকটা নিরাপদ এমন কথা বলা হয়েছে। প্রতিষেধক নেবার পর রক্ত জমাট হওয়াসহ নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে, এগুলো এখনও প্রমাণিত সত্য নয়।

প্রমাণিত সত্য হলো কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালে বাড়ছে ভিড়। এই সত্যকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে আবারও স্বাস্হ্য সুরক্ষার অনুশীলন শুরু করতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রম পুরো পৃথিবীর মতোই এক প্রকার স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন ক্লাস নির্ভর শিক্ষা কতটা শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাচ্ছে তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি সকল কিছু খোলা রেখে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা কতটা যৌক্তিক? প্রশ্ন উঠেছে এ বিষয়েও। বিদ্যায়তন বন্ধ, কোভিড বাড়ছে এরমধ্যে বই মেলা হবে। সব কিছুর মধ্যেই একপ্রকার সমন্বয়হীনতা রয়েছে। একবছর পেরোতে গিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা কম হলো না। সেই অভিজ্ঞতা ও মাঠের সঠিক তথ্য উপাত্ত শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছলে, কোভিড-১৯ মোকাবিলা করা সহজ হবে। ভুললে চলবে না, আমরা কিন্তু লড়াইর মধ্যে আছি। সামনে হয়তো আরো শক্ত মোকাবিলায় মুখোমুখি হতে হবে, তাই কোনও গুজব, আতঙ্ক নয় সত্য তথ্য ও বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করেই পাড়ি দিতে হবে করোনাকাল।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।