নারী দিবসে একজন আয়েশার ‘একটু অন্যরকম’ চাওয়া

ফুলবাড়ি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি : আর্ন্তজাতিক নারী দিবসে দিনাজপুরের আয়েশা সিদ্দিকার চাওয়া একটু অন্যরকম। কোনো নারী বিবাহ রেজিট্রার (কাজি) পদে আসীন হতে পারবেন না, হাইকোর্টের এমন রায় প্রকাশের পরও হাল ছাড়তে নারাজ তিনি। তাই তিনি আবারও সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে ওই পদে চাকুরীর জন্য রিট করেছেন। আগামী ৪ এপ্রিল শুনানি হবে। আয়েশা সিদ্দিকার চাওয়া তার পক্ষেই রায় দেবেন বিজ্ঞ বিচারক। আয়েশা সিদ্দিকার একমাত্র মেয়ে স্কুলপড়ুয়া উম্মে হাবিবা মায়ের লড়াইয়ের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বলে, ‘বেগম রোকেয়ার মতো আমার মা’ও লড়াই করে নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) হওয়ার দাবি আদায় করে, নারীদের জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রারের পদটি উন্মুক্ত করবেন।’

আয়েশা সিদ্দিকার বাড়ি দিনাজপুরের ফুলবাড়ি উপজেলার পৌর শহরের ৮নং ওয়ার্ডের কাটাবাড়ি এলাকায়। স্বামীর নাম সোলায়মান মন্ডল। তিন সন্তান নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন তিনি। বাবার রেখে যাওয়া সিদ্দিকীয় হোমিও হল নামের একটি চিকিৎসালয় পরিচালনা করেন তিনি। সোমবার সকালে কথা হয় আয়েশা সিদ্দিকাসহ তার পরিবারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে শহরের দারুস সুন্নাহ সিদ্দিকীয় ফাজিল (ডিগ্রি) কেন্দ্রীয় মাদরাসা থেকে দাখিল, ১৯৯৮ সালে আলিম এবং ২০০০ সালে ফাজিল পাস করেন। দাখিল পাস করার পর বিয়ে করেন তিনি। আয়েশার বাবা ছিলেন হোমিও চিকিৎসক। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে বাবা মারা যান। সেই থেকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্দিকীয় হোমিও হল চিকিৎসালয়ে সময় দেন।

আয়েশা বলেন, ২০০৯ সালে ফুলবাড়ি পৌরসভা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হলে, প্রতি তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) প্রয়োজন হয়। এর আগে পৌরসভাটি তৃতীয় শ্রেণির থাকায়, একজন বিবাহ রেজিস্ট্রার দিয়েই কাজ চলছিল। সেই সময় নিয়ম পরিবর্তন হওয়ায় ৪, ৫, ৬ এবং ৭, ৮, ৯ নং ওয়ার্ড বিবাহ রেজিস্ট্রার লাইসেন্স প্রদানের নিমিত্তে বিধি-৬(২) ধারা মোতাবেক দরখাস্ত আহ্বান করে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ পাঁচ সদস্যদের একটি সুপারিশ কমিটি করা হয়। কমিটিতে ছিলেন সাবেক গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান এমপি, তৎকালীন ফুলবাড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার এবং পৌর মেয়র। সেই বিজ্ঞপ্তি দেখে ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের জন্য আয়েশা সিদ্দিকা, আলেয়া খাতুন এবং নাজমুন নাহার নামে তিনজন নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার আবেদন করেন। সুপারিশ কমিটি তাদের মধ্যে আয়েশা সিদ্দিকাকে প্রথম করে মন্ত্রণালয়ে একটি সুপারিশ পাঠায়। একই সময় ৪, ৫ ও ৬নং ওয়ার্ডের জন্য সাকোয়াত হোসেন নামের এক ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকেও ওই সুপারিশ কমিটি অনুমোদন দেয়। পরে সাকোয়াত হোসেনকে নিকাহ রেজিস্ট্রার করা হলেও, আয়েশা সিদ্দিকাকে নারী প্রার্থী হওয়ার কারনে বাদ দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিজ্ঞপ্তিতে নারী বা পুরুষ বলে কিছুই উল্লেখ ছিল না।

আয়েশার স্বামী সোলায়মান হোসেন বলেন, আয়েশাকে বিবাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ না দেওয়ায়, ২০১৪ সালের জুলাই মাসে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। সাড়ে ছয় বছর আইনি লড়াই শেষে ২০২০ সালের ২৬ ব্রেুয়ারি কোনো নারী বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) পদে আসীন হতে পারবেন না, এমন রায় দেন আদালত। একই বছরের মার্চ মাসে রায়ের বিপক্ষে আবারও সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন তিনি। মামলাটি চলমান থাকলেও সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ হয় ২০২১ সালের ১০ জানুয়ারি। ওই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আবারও সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন।

ফুলবাড়ি পৌরসভার ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম বলেন, নিকাহ রেজিস্ট্রার সম্পাদনের জন্য মসজিদে প্রবেশ বাধ্যতামূলক নয়। বিয়ে পড়ার সঙ্গে, বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, একই সময় যদি চারটি বিয়ের অনুষ্ঠান হয় তাহলে একজন কাজি যে কোনো একটি বিয়েতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। অন্য বিয়েগুলো ইমাম দ্বারা পড়িয়ে নেয়া হয়। পরে কাজি গিয়ে সেই বিয়ের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করবেন। এটাই নিয়ম। ফুলবাড়ি উপজেলার বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার মোমেনুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বলতে পারবেন। ফুলবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, একজন মানুষের অধিকার রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। তিনিও সেখানে গেছেন। আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার জন্য রিটকারী আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, নারী বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) হতে শেষ পর্যন্ত তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চান তিনি। চান দেশের জনগণের সমর্থন।