মধ্যপাড়ায় পাথর উৎপাদন ও খনি উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক কল্যানে কাজ করছে জিটিসি

পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি : দিনাজপুরের মধ্যপাড়ায় পাথর উৎপাদন ও খনি উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক কল্যানে কাজ করছে খনির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)’। পাথর উৎপাদন ও খনি উন্নয়নের পাশাপাশি খনির সন্মুখে ‘জিটিসি চ্যারিটি হোম’ স্থাপন করে খনি শ্রমিকদের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যায়তরত সন্তানদের মাঝে শিক্ষা বৃত্তি, এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা এবং এলাকার আর্থ-সামাজিক নানা কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে এলাকাবাসীদের পাশে দাড়িয়ে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে।

দেশের পার্বতীপুরে একমাত্র ভু-গর্ভস্থ মধ্যপাড়া পাথর খনির দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক বছরের মধ্যে তা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি। ২০০৭ সালের ২৫ মে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানী লিমিটেড বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। উৎপাদন শুরুর পর থেকে নানা প্রতিকুলতায় পেট্রোবাংলা প্রতিদিন তিন শিফটে ৫ হাজার মে.টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এক শিফটে গড়ে ৬শ’ থেকে ৫শ’ মে.টন পাথর উত্তোলন করে আসছিল। ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ৬ বছরে খনিটি লোকসান গুনে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। খনিটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে খনির উৎপাদন ও রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় বেলারুশের জেএসসি ট্রেস্ট সকটোস্ট্রয় ও দেশীয় প্রতিষ্টান জার্মানিয়া করপোরেশন লিমিটেড নিয়ে গঠিত জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) কে। জিটিসি’র সাথে চুক্তি সাক্ষরিত হয় ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর। চুক্তি কার্যকর হয় ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী। জিটিসি তিন শিফট চালু করে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ হাজার মে.টন পাথর উত্তোলনের সক্ষমতা অর্জন করে এবং পাথর উৎপাদনে রেকর্ড গড়ে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনার কারণে তিন মাস বন্ধ থাকার পরও ৮ লাখ ২৩ হাজার ৯৫৯ মে.টন পাথর উৎপাদন হয়। এ সময়ে বিক্রি হয় ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৯শ’ ৬ দশমিক ৫২ মে.টন পাথর। এ থেকে মুনাফা হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬শ’ ৪৬ মে.টন পাথর উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ৭ লাখ ৩১ হাজার ৪শ’ ৯৩ টন পাথর বিক্রি করে মুনাফা হয়েছে ৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। শুধুমাত্র গত বছরের এপ্রিল থেকে নবেম্বর পর্যন্ত ৭ মাসে করোনাকালীন অবস্থাতেই ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০ টন পাথর বিক্রি করে রাজস্ব আয় হয়েছে ২শ’ ২৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। খনির উৎপাদন, রক্ষনাবেক্ষণ ও পরিচালনা ঠিকাদার জিটিসি’র ইউরোপিয়ান সুদক্ষ প্রকৌশলীদল ও দেশীয় খনি শ্রমিকদের প্রচেষ্টায় প্রতিদিন ৫ হাজার মে.টন পাথর উৎপাদন করছে। পাথর উৎপাদন ও খনি উন্নয়নের পাশাপাশি খনির সন্মুখে ‘জিটিসি চ্যারিটি হোম’ স্থাপন করে খনি শ্রমিকদের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যায়তরত সন্তানদের মাঝে শিক্ষা বৃত্তি, এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা এবং এলাকার আর্থ-সামাজিক নানা কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে এলাকাবাসীদের পাশে দাড়িয়ে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে।

চ্যারিটি হোমে একজন অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তার দিয়ে প্রতিদিন খনি এলাকার ৪০/৫০ জন রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ সেবা দিচ্ছে। প্রতিমাসে খনি শ্রমিকদের সন্তানদের মাসিক শিক্ষা উপবৃত্তি, নন এমপিভুক্ত মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয়কে মাসিক আর্থিক সহায়তা এবং এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে আর্থিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছে। এলাকার মানুষ বলছে, ইতিপূর্বে এই খনি এলাকাবাসীর জন্য এমন সামাজিক কর্মকান্ড নিয়ে এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কেউ তাদের পাশে দাড়ায়নি। জিটিসি’র এই সেবা মূলক কর্মকান্ড একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

শনিবার সকালে চ্যারিটি হোমে পাশ্ববর্তি পাচঁপুকুর গ্রাম থেকে ডাক্তার দেখাতে আসা বিধবা সফিরন বেওয়া (৭০) বলেন, বিনে টাকায় ডাক্তার দেখিয়েছি। শিক্ষা উপবৃত্তি নিতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আখিঁ আহম্মেদ বলেন, খনি শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে জিটিসি’র মত এমন করে কেউ কখনো ভাবেনি। মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোঃ ওবায়দুর রহমান বলেন, কলেজটি এমপিও ভুক্ত না হওয়ায় তাদের ২৮ শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারী কোন প্রকার বেতন ভাতা পান না। শিক্ষকদের এমন দূর্দশায় প্রতিমাসে আর্থিক ভাবে তাদের সহায়তা করে পাশে দাড়িয়েছে জিটিসি।

হরিরামপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি শাহবুদ্দীন শাহ বলেন, স্বাস্থ্য সেবা নেয়ার জন্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার দুরে উপজেলা হাসপাতাল যেতে হয়। জিটিসি চ্যারিটি হোম স্থাপনের মাধ্যমে সামাজিক কল্যানমূলক কাজের পাশাপাশি অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তার এলাকার গণমানুষের স্বাস্থ্য সেবায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরামর্শ সেবা দিয়ে যে অবদান রাখছে, তা নজিরবিহীন।

খনির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানীয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)’র নির্বাহী পরিচালক জাবেদ সিদ্দিকী জানান, এলাকাবাসীর খনির জন্য অনেক ত্যাগ এবং অবদান রয়েছে। এলাকার মানুষ এতদিন এই খনিটিকে লোকসানী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখেছে। জিটিসি’র হাত ধরে পর পর দু’বছর লাভের মুখ দেখেছে। এই খনি নিয়ে এলাকাবাসীর অনেক প্রত্যাশা। আমরা তাদের প্রত্যাশা বিবেচনায় এই খনির উন্নয়নের সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কোম্পানী খনি শ্রমিকদের উচ্চ শিক্ষায় অধ্যায়ররত সন্তানদের শিক্ষা উপবৃত্তি, এলাকাবাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সামাজিক কল্যানে তাদের পাশে দাড়ানোর জন্য একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘জিটিসি চ্যারিটি হোম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সামাজিক এই কাজে তিনি খনি এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন।