অপচয়ের গর্তে যেন উন্নয়ন গতি না হারায়

প্রভাষ আমিন :

অনেক আগে শোনা দুটি গল্প। হুবহু মনে নেই। যতটুকু মনে আছে, ততটুকুই শেয়ার করছি। মফস্বল শহর থেকে কর্মকর্তারা কেন্দ্রে চিঠি পাঠালেন, এলাকার মানুষের সুপেয় পানির চাহিদা মেটানো এবং পরিবেশের স্বার্থে একটি পুকুর খনন করা দরকার। জমি অধিগ্রহণ,পুকুর খনন বাবদ মোটা অঙ্কের বরাদ্দ এলো। সেই বরাদ্দ ভাগবাটোয়ারা হয়ে গেলো, পুকুর আর খনন করা হলো না। ভালোই চলছিল। হঠাৎ খবর এলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেই মফস্বল শহর পরিদর্শনে আসবেন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মাথায় বাজ পড়লো। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যদি খনন করা পুকুর পরিদর্শন করতে চান। দ্রুত তারা কেন্দ্রে আরেকটি প্রস্তাব পাঠালেন, এলাকায় একটি পুকুর আছে। এটা নোংরা-আবর্জনা ভর্তি। মশার প্রজনন কেন্দ্র। এই পুকুরের কারণে মারাত্মকভাবে এলাকায় পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। তাই অবিলম্বে পুকুরটি ভরাট করা দরকার। পুকুর ভরাটের জন্যও বড় বরাদ্দ এলো। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সফরে এলেন, ভরাট করা পুকুর দেখলেন। সন্তুষ্টচিত্তে ফিরে গেলেন। নিশ্চয়ই সেই কর্মকর্তাকেও সন্তুষ্ট করা হয়েছিল। দেখুন, পুকুর খনন করা হলো না। কিন্তু কৌশলে দুই দফা টাকা বরাদ্দ হলো। পুকুর খননই হলো না, অথচ টাকা জলে গেলো।

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও বাংলাদেশের তিন ঠিকাদার ব্যক্তিগত বিমানে ঘুরছেন। বিমান যখন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে তখন সে দেশের ঠিকাদার একটা সেতু দেখিয়ে বললেন, এই সেতুটি আমার বানানো। এই কাজের লাভ দিয়ে আমি একটি গাড়ি কিনেছি। বিমান যখন রাশিয়ার আকাশে সে দেশের ঠিকাদার একটি সেতু দেখিয়ে বললেন, এটি আমার বানানো। এর লাভ দিয়ে আমি বাড়ি সংস্কার করেছি। বিমান যখন বাংলাদেশের আকাশে, তখন বাংলাদেশের ঠিকাদার একটি নদী দেখিয়ে বললেন, এই সেতুর লাভ দিয়ে আমি এই বিমানটি কিনেছি। বাকি দুই ঠিকাদার উঁকিঝুকি মেরে সেতু খুঁজলেন, কিন্তু পেলেন না। বাংলাদেশের ঠিকাদার হাসতে হাসতে বললেন, সেতু বানালে তো আর বিমান কিনতে পারতাম না।

কেউ সিরিয়াসলি নেবেন না। এসব নিছকই কৌতুক। বাংলাদেশের অবস্থা এখনও অত খারাপ না। তবে গত কয়েকদিনে সেতু সংক্রান্ত কয়েকটি নিউজ দেখে মনে হলো, অবস্থা খুব একটা ভালোও না। পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক নদের ওপরে একটি সেতু নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর। সেতুটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। সংযোগ সড়ক নির্মাণ হলেই এটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। চমৎকার একটি সেতু বানানো হয়েছে, এটি অবশ্যই সুখের খবর। কিন্তু যখন জানবেন, এই সেতুর ৩ কিলোমিটার পূর্বে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর আরেকটি সেতু বানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একটি সেতু চালু হওয়ার আগেই আরেকটি সেতু কেন? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে সব রহস্য। পটুয়াখালীর পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সংলগ্ন অন্যান্য স্থাপনার ভারী যানবাহন পরিবহনের জন্য বাড়তি সক্ষমতার সেতু দরকার। আর সে কারণেই নতুন আরেকটি সেতু নির্মাণ করতে হচ্ছে।

ব্যাপারটি এমন নয় যে, আগের সেতুটি নির্মাণকাজ শুরুর পর পায়রা বন্দরের পরিকল্পনা হয়েছে। বরং সেতুটির নির্মাণকাজ শুরুর আগেই পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ এলজিইডিকে চিঠি দিয়ে ভারী যান চলাচল করতে পারে, তেমন সক্ষমতার সেতু নির্মাণের অনুরোধ করেছিল। কিন্তু পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সে অনুরোধ আমলে না নিয়েই ২০১৬ সালে এলজিইডি সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে এবং প্রায় শেষ করে এনেছে। এলজিইডির আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, পায়রা বন্দর বাংলাদেশের কোনও বন্দর নয়। কিন্তু ভারী যানবাহন চলাচল উপযোগী সেতু ছাড়া তো পায়রা বন্দরের চলবে না। তাই তারা সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষকে আরেকটি সেতু নির্মাণের অনুরোধ করে। আর নির্মাণের অনুরোধ কখনোই কেউ ফেলে না। পুরনো সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১২০ কোটি টাকা। আর নতুন সেতুর বাজেট ৭৩৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশের যা বাস্তবতা তাতে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তাছাড়া নতুন সেতু চলাচল উপযোগী করতে দুই পাশে রাস্তা বানাতে হবে। তার মানে পায়রা বন্দরের চাহিদা অনুযায়ী সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় হাজার কোটি টাকা আন্ধারমানিকের জলে যাবে। কেউ যদি এটাকে সমন্বয়হীনতা বলেন, আমি সেটা মানতে রাজি নই। যদি পায়রা বন্দরের পরিকল্পনা পরে হতো, যদি পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ এলজিইডিকে চিঠি না দিতো; তাহলে সমন্বয়হীনতার দাবি করা যেতো। কিন্তু এটা স্রেফ ১২০ কোটি টাকার কাজের ভাগবাটোয়ারার ব্যাপার। অবশ্য সমন্বয়হীনতার কারণে অপচয়ের উদাহরণও কম নয়। এক সংস্থা রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে, তার এক মাস পর আরেক সংস্থা এসে সেই একই রাস্তা কেটে একাকার করে ফেলে। অপচয়ের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে আন্ধারমানিক নদের ওপরের সেতু। কারণ, এ দুটিই নয়, আন্ধারমানিক নদের ওপর ১০ কিলোমিটারের মধ্যে আরও একটি সেতু আছে। তার মানে একটি নদের ওপর ১০ কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি সেতু নির্মাণ হচ্ছে। এত সেতু বিলাসিতা করার সক্ষমতা কী আমাদের আছে?

ঢাকা একটি অসাধারণ শহর। বিশ্বেই এই শহরটি অনন্য। কারণ,একটি শহরের চারপাশে চারটি মিঠা পানির নদী বিশ্বের আর কোথায়ও আছে? ঢাকার যানজট সমস্যা মেটাতে চারপাশের নৌপথ হতে পারতো দারুণ বিকল্প। বিকল্পটি নিয়ে সরকার ভাবছেও। ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ চালু করতে কম উচ্চতার ১৬টি সেতু ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করছে সরকার। কিন্তু মজার বিষয় হলো, বৃত্তাকার নৌপথ এলাকার মধ্যেই কম উচ্চতার আরও দুটি সেতু নির্মাণ করছে সরকারেরই দুটি সংস্থা। সড়ক ও জনপথ তুরাগ নদের ওপরে কামারপাড়ায় একটি সেতু বানাচ্ছে। টঙ্গীর তুরাগে আরেকটি সেতু বানাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই দুটি সেতু নির্মাণে খরচ হচ্ছে প্রায় ১১০ কোটি। কিন্তু বৃত্তাকার নৌপথ চালু করতে হলে আগের ১৬টির সাথে এই দুটি সেতুও ভাঙতে হবে। বৃত্তাকার নৌপথের পরিকল্পনা তো বাংলাদেশের বাইরের নয়।

সেতু সংক্রান্ত অপর নিউজটি আরও ইন্টারেস্টিং। সুনামগঞ্জের পাগলা– জগন্নাথপুর-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কের কুন্দানালা খালের ওপর নির্মীয়মাণ সেতুটি নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ধসে পড়েছে। ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছিল। কোনোরকমে কাজটি বুঝিয়ে বিল আদায় করতে পারলেই হাওয়া হয়ে যেতো নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। অল্পের জন্য বেচারা ধরা খেয়ে গেছে। একই মহাসড়কে মোট ৭টি সেতু বানাচ্ছে এম এম বিল্ডার্স নামে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। এখন আমার ভয় বাকি ৬টি সেতু নিয়ে। যাদের বানানো সেতু নির্মাণের আগেই ধসে পড়ে তাদের ওপর কি ভরসা করা যায়?

এখানে গত এক সপ্তাহের তিনটি উদাহরণ। চাইলে অপচয়, সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতির এমন তিনশ’ উদাহরণ পাওয়া যাবে। নির্মাণকাজে রডের বদলে বাঁশের ব্যবহার, নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ধসে পড়ার এমন অসংখ্য উদাহরণ আমাদের চারপাশে। কাজ পেতে ঠিকাদারদের পদে পদে কমিশন দিতে হয়, তাই নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করে তারা সেটা পুষিয়ে নেন। বরাদ্দের পুরো টাকা ব্যয় হলে বাংলাদেশ আরও অনেক এগিয়ে যেতো। তবে তাতে ঠিকাদার আর প্রকৌশলীদের আয়ে একটু টান পড়বে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের তালিকায়। ২০২৬ সাল থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করবে বাংলাদেশ। উন্নয়নশীল দেশ হওয়াটা আমাদের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি চ্যালেঞ্জেরও। সেই চ্যালেঞ্জে জিততে হলে আমাদের দুর্নীতি রোধ করতে হবে, অপচয় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে, অর্থনীতিতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। হবে যে সেটা সবচেয়ে ভালো করে জানেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত মঙ্গলবার একনেক বৈঠকেও তিনি বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এখন আর কারও কাছে হাত পাতা যাবে না। তাই অনেক হিসাব করেই খরচ করতে হবে। শেখ হাসিনা যেটা বোঝেন সেটা কি এই প্রকৌশলী, ঠিকাদার, পরিকল্পনাকারীরা বোঝেন না। নাকি তারা দেশের নয়, শুধু নিজের ভালোটাই বোঝেন। প্রধানমন্ত্রী মুখে বললেও এই অপচয়, দুর্নীতি বন্ধ হবে না। বন্ধ করতে হলে দায়ীদের চিহ্নিত করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কার অবহেলায় আন্ধারমানিক নদের ওপর একের পর এক সেতু তৈরি হচ্ছে, বৃত্তাকার নৌপথের কথা জেনেও কারা তুরাগ নদের ওপর নিচু সেতু বানাচ্ছে, কাদের অবহেলায় নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগে সুনামগঞ্জে ভেঙে পড়লো সেতু। এদের খুঁজে বের করা কঠিন নয়। এদের শাস্তি দিন, তাহলে অন্যরা সাবধান হবে। মিষ্টি কথায় কাজ হবে না।

বাংলাদেশের উন্নয়নের গাড়ি এখন দারুণ গতিতে মহাসড়ক ধরে এগিয়ে চলছে। নিশ্চিত করতে হবে অপচয়ের গর্তে যেন সেই গাড়ি হোঁচট না খায়।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।