বন্য প্রাণীর অধিকার রক্ষায় ইসলাম

মিরর ডেস্ক : মহান আল্লাহ মানব সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের প্রয়োজন পূরণের জন্য সব ক্ষেত্রে সৃষ্টি করেছেন জীবজন্তু ও উদ্ভিদ। এগুলো মহান আল্লাহর সুবিশাল সৃষ্টির অংশ। প্রকৃতির ভারসাম্যতা রক্ষা করা ও মানুষের বসবাসের উপযোগী করার ক্ষেত্রে প্রাণিজগতের অসামান্য অবদান আছে। হয়তো সেটি অনুধাবন করেই ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশনে ৩ মার্চকে ‘বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

পশু-পাখির মধ্যে প্রাণের উপস্থিতির পাশাপাশি আছে আহার-বিহার, বিচরণ ও সন্তান ধারণের ক্ষমতা। রয়েছে আরাম-আয়েশ ও বেদনা। তাই ইসলাম মনে করে, এই পৃথিবীতে মানুষের পরেই প্রাণিজগতের স্থান। পবিত্র কোরআনে প্রাণিজগেক পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী আছে আর যত পাখি দুই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, তারা সবাই তোমাদের মতো একেক জাতি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

পবিত্র কোরআনে বিক্ষিপ্তভাবে অসংখ্য আয়াতে প্রাণিজগতের প্রসঙ্গ  উল্লেখ হওয়ার পাশাপাশি অনেকগুলো সুরারও নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর নামে। যেমন সুরা বাকারা (গাভি), সুরা আনআম (উট, গরু, বকরি), সুরা নাহল (মৌমাছি), সুরা নামল (পিপীলিকা), সুরা আনকাবুত (মাকড়সা), সুরা ফিল (হাতি) ইত্যাদি। এসব নামকরণ থেকে প্রাণিজগতের প্রতি ইসলামের উদার দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট ফুটে ওঠে।

ইসলাম প্রাণিজগেক প্রকৃতি ও পৃথিবীর সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবেও চিহ্নিত করেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমাদের আরোহণের জন্য এবং শোভার জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন ঘোড়া, খচ্ছর ও গাধা এবং তিনি সৃষ্টি করেন এমন অনেক কিছু, যা তোমরা জান না।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৮)

ইসলাম ধর্ম মতে, পশু-পাখির প্রতি নম্রতা প্রদর্শন ইবাদতের পর্যায়ভুক্ত। পশু-পাখিকে কষ্ট দেওয়া গুনাহের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একবার এক পিপাসাকাতর কুকুর কূপের পাশে ঘোরাঘুরি করছিল। পিপাসায় তার প্রাণ বের হওয়ার উপক্রম। হঠাৎ বনি ইসরাঈলের এক ব্যভিচারী নারী তা দেখতে পেয়ে নিজের পায়ের মোজা খুলে কুকুরটিকে পানি পান করাল। এ কারণে তার অতীত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি, হাদিস: ৩৪৬৭)

অন্য একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘একজন নারী একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল। সে তাকে খাবার দিত না আবার জমিনে বিচরণ করে খাবার সংগ্রহ করার সুযোগও দিত না। এ কারণে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে।’ (বুখারি, হাদিন : ৩৩১৮)

ইসলাম যেকোনো জীবের প্রতি দয়া করতে শেখায়। হাদিসে এসেছে : ‘যেকোনো প্রাণীর ওপর দয়া করার মধ্যেও সওয়াব আছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০০৯)

ইসলামে কোনো জীবন্ত পশু-পাখি আগুনে পোড়ানো নিষিদ্ধ। আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ (রা.) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে এক সফরে আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গী ছিলাম। তিনি দেখতে পেলেন, আমরা একটা মৌমাছির বাসা জ্বালিয়ে দিয়েছি। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কে এটি জ্বালিয়ে দিয়েছে? আমরা নিজেদের কথা বললাম। তিনি বলেন, আগুনের স্রষ্টা ছাড়া কারো জন্য আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া শোভা পায় না।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬৭৫)

পশু-পাখি আল্লাহর সৃষ্টি। এগুলোকে শুভ-অশুভ মনে করা অজ্ঞতা আর কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। অহেতুক পশু-পাখির পেছনে লেগে থাকা, অযথা এগুলোকে শিকার করা ইসলামে নিন্দনীয়। ইবনে ওমর (রা.) একবার কোরাইশ গোত্রের একদল বাচ্চাকে দেখতে পেলেন, তারা পাখি শিকার করছে। এটা দেখে ইবনে ওমর (রা.) তাদের পৃথক করে দেন এবং বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে কোনো প্রাণবিশিষ্ট বস্তুকে লক্ষ্যবস্তু বানায়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৯৫৮)

তাই আসুন, জীবজন্তু ও প্রাণিজগতের প্রতি সদয় আচরণ করে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় উদ্যোগী হই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও মুহাদ্দিস।