গণফোরামের সভাপতির পদ থেকে ড. কামালকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব

ঢাকা : গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে সভাপতির পদ থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শনিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে গণফোরামের এক পক্ষের ডাকা বর্ধিত সভায় সাবেক নির্বাহী কমিটির সদস্য মহসিন রশিদ বর্ধিত এই প্রস্তাব তুলে ধরেন। গণফোরামের নেতাদের একটি পক্ষ বর্ধিত সভার আয়োজন করেন। এতে নেতৃত্ব দেন মোস্তফা মোহসীন মন্টু।

এসময় মহসিন রশিদ বলেন, দলের মধ্যে অনেক বিভাজন চলছে। এই বিভাজন বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে সভাপতির পদ থেকে ড. কামাল হোসেনকে বাদ দেওয়া উচিত। কমিটির সাবেক সদস্য সত্তার পাঠানও একই প্রস্তাব করেন। পরে জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এই প্রস্তাব সমর্থন করেন।

সকাল ১০ টায় গণফোরামের ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল উপলক্ষে অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদের সভাপতিত্বে গণফোরামের বর্ধিত সভায় শোক প্রস্তাব পাঠ করেন অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী এবং সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও ত্রাণ কার্যক্রমের রিপোর্ট উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক। বর্ধিত সভায় সারাদেশের ৫৬ জেলা থেকে ২৮১ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।

সভায় আগামী ২৮ ও ২৯ মে গণফোরামের ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার হয়। এসময় দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, আমরা জাতি হিসাবে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে এটা প্রত্যাশিত ছিল না। দুঃশাসনের এ বাংলাদেশে আমরা বিভিন্নভাগে বিভক্ত। এই প্রেক্ষাপটে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল দলের ঐক্য চাই। রাতের ভোটে নির্বাচিত স্বঘোষিত সরকারের পদত্যাগ চাই। প্রয়োজনে দেশ রক্ষায় জাতীয় ঐক্যেরে সরকার চাই।

তিনি বলেন, গণফোরামকে দেশবাসীর আকাঙ্খা অনুযায়ী সুসংগঠিত করতে হবে। আগামী ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল দলকে শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাড় করানোর জন্য আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই।

সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ বলেন, দেশে আইনের শাসন বলতে কিছু নেই। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে জনগণের বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। জেলখানায় লেখক সাংবাদিকদের মৃত্যু প্রমাণ করে বন্দি অবস্থাতেও কারো জীবনের নিরাপত্তা নেই।

অ্যাডভোকেট সুব্র্রত চৌধুরী বলেন, ভোট চুরির মধ্য দিয়ে স্বঘোষিত সরকার লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে। দেশী-বিদেশি মিডিয়ায় সরকারের গোপন কর্মকান্ডের তথ্য ফাঁস হওয়া শুরু হয়েছে। সরকারি সম্পদ লুটপাটের মহোৎসব চলছে। সরকারের ব্যর্থতা সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান। এ অবস্থা থেকে উত্তোরণে দেশবাসীকে সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান।

সভায় গণফোরামের ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনে প্রস্তুতি কমিটিসহ চারটি কমিটির প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়। আগামী জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২১ সদস্য বিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটি গঠিত হয়। অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে আহবায়ক এবং ১৫ জনকে যুগ্ম আহবায়ক করে গণফোরাম জাতীয় নির্বাহী কমিটিও গঠিত হয়।

এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা মহসীন মন্টুকে আহবায়ক এবং সুব্রত চৌধুরীকে সদস্য সচিব করে ২০১ সদস্য জাতীয় কাউন্সিল প্রস্ততি কমিটি গঠিত হয় এবং মহান স্বাধীনতার সুর্বণ জয়ন্তী উপলক্ষে অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদকে আহবায়ক করে এবং ১৫ জনকে যুগ্ম আহবায়ক করে ৩০১ সদস্য বিশিষ্ট উৎসব উদযাপন কমিটি গঠিত হয়।

কমিটিতে ড. কামাল হোসেনকে রাখা হয়নি। তবে মোকাব্বির খান এমপিকে রাখা হয়েছে। তিনি ড. কামাল হোসেন গ্রুপের।

মোকাব্বির খানকে কেন কমিটিতে রাখা হলো সে বিষয়ে মোস্তফা মহসিন মন্টুকে প্রশ্ন করলে বলেন, আমরা সবাইকে নিয়ে গণফোরামে থাকতে চাই। এ জন্য তাকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। তবে তিনি কমিটিতে না থাকতে চাইলে থাকবেন না।

ড. কামালকে গণফোরাম থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, এটি বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত না, বিভিন্ন নেতারা প্রস্তাব দিয়েছেন। আগামী কাউন্সিলে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মোস্তফা মহসিন মন্টু আরো বলেন, আমরা সরকারের পদত্যাগ দাবি করছি, পাশাপাশি নতুন নির্বাচন চাই। আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছে। নতুন নির্বাচন না দিলে স্বৈরাচার এ সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।

সভায় দেওয়া বক্তব্যে অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ বলেন, ড. কামাল হোসেন পলিটিশিয়ান নয়। তাকে নিয়ে রাজনীতি হবে না। তিনি একটা জিরো পারসন। তিনি ক্ষমতার লোভে রাজনীতি করেন।

অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ বলেন, ‘ড. কামাল ও রেজা কিবরিয়া দুজনেই মিথ্যাবাদী। দলীয় এমপি মোকাব্বির হঠাৎ করে এমপি হয়েছেন। কীভাবে এমপি হয়েছেন, দেশবাসী সবাই জানে। ড. কামাল হোসেনকে বাদ দিয়েই গণফোরামকে এগিয়ে নিতে হবে।’

অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ আরও বলেন, গত নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্য ফোরাম গঠন করা হলো। কী উদ্দেশ্য নিয়ে ড. কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্য ফোরাম গঠন করলেন তা বোধগম্য নয়। ঐক্যফ্রন্টে কারা যোগ দিলেন? জামাতের লোকজন। আর ড. কামাল হোসেন তাদের নিয়ে সুস্থ রাজনীতি স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়ন করতে চাইলেন। আমি প্রস্তাব করছি ড. কামাল হোসেন ‘ননসেন্স’ তাকে গণফোরাম থেকে বাদ দিয়ে সামনে চলুন।

রংপুর বিভাগের পক্ষে বক্তব্য দেন মির্জা হাসান, ময়মনসিংহের অ্যাডভোকেট রায়হান উদ্দিন ও ঢাকা বিভাগের বিশ্বজিৎ গাঙ্গুলি। আ্যাডভোকেট হাফিজ উদ্দিন ঠাকুরগাঁও জেলা গণফোরামের সদস্য সচিব জাফর সাদেক, রাজবাড়ী জেলা সাধারণ সম্পাদক ওয়াজি উল্লাহ কুষ্টিয়া জেলা সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম পর্বতসহ অন্যরা।

ঢাকা বিভাগের গণফোরাম নেতা বিশ্বজিৎ গ্যাঙ্গুলি বলেন, ড. কামাল হোসেনকে অদৃশ্য একটি সুতা টেনে ধরেছে। ফলে গণফোরাম পেছনের দিকে ছুটছে। সামনে আর এগুতে পারেনি। তাই সময় এসেছে সুতা কেটে দেওয়ার। সুতাটি কেটে দিন গণফেরাম সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।