গণফোরামে সম্মেলনের প্রস্তুতি বিদ্রোহী গ্রুপের : ড. কামাল জিম্মি!

মাসুদ কার্জন : আবারও গণফোরামের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। আগামী শনিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ড. কামাল হোসেনকে পাশ কাটিয়ে বর্ধিত সভা ডেকেছে দলটির বিদ্রোহী অংশ। এই অংশের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী দাবি করেছেন, গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. কামাল হোসেন তিন জনের একটি চক্রে ‘জিম্মি’ হয়ে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বিকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এদিন সকালে বিদ্রোহী অংশ গণমাধ্যমে শনিবারের (২৭ ফেব্রুয়ারি) বর্ধিত সভার কথা জানানোর পর; দুপুরে মতিঝিলের চেম্বার থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে কামাল হোসেন জানিয়েছেন, গণফোরামের নামে প্রেস ক্লাবে শনিবার তার বা তার দলের কোনও সভা হচ্ছে না।

গণফোরামের উভয় অংশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল বিশেষ কাউন্সিলের পর বিরোধ প্রকাশ্যে আসে গণফোরামে। মোস্তফা মোহসীন মন্টুকে বাদ দিয়ে ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করার পর গণফোরাম কার্যত দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি অংশ কামাল হোসেনকে কেন্দ্র করে এবং দ্বিতীয় বিদ্রোহী অংশটি মন্টু-সুব্রত চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এরপর ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে ড. কামাল হোসেন ঘোষণা করেন— গণফোরামে গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া সব বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কার অকার্যকর করা হচ্ছে। এরপর একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর বেইলি রোডে নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি জানান, তার দলে কোনও সমস্যা নেই, যা বিরোধ ছিল তা কেটে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন ড. রেজা কিবরিয়া। কিন্তু এই পদত্যাগের মধ্য দিয়েও গণফোরামে শৃঙ্খলা ফেরেনি।

কেন আবারও এই অসন্তোষ, এমন প্রশ্নের উত্তরে বিদ্রোহী অংশের অন্যতম উদ্যোক্তা সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘উনি (কামাল হোসেন) তো দুই নম্বরি করছেন। উনি কী করে মিটিং ডেকে আবারও মিটিং পসপন্ড করেন, কারও সঙ্গে আলাপ না করে।’
কারণ কী জানতে চাইলে উত্তরে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘কাউকে দিয়ে করাইছেন আরকি। যাই হোক, আমরা এটা ডিজওন করি, মিটিং হবে।’

সুব্রত চৌধুরী জানান, শনিবার মিটিং হবে। সেদিন দুপুর ১টার সময় সংবাদ সম্মেলনও হবে। তার মন্তব্য, ‘উনি (কামাল হোসেন) এখন কুচক্রী মহলের কাছে বন্দি। জিম্মি হয়ে আছেন। সো কলড এমপি মোকাব্বির, শফিকউল্লাহ আর মুশতাক—এই তিন জনের একটি কুচক্রী উনার পেছনে লেগে আছে। সকাল-বিকাল অন্যরকম বুঝায়। অন্য কাজ করে। উনারে শেষ করবে আরকি।’

সুব্রত চৌধুরীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মোকাব্বির খান এমপি বলেন, ‘উনাদের তো বর্ধিত সভা ডাকার কোনও এখতিয়ারই নাই। তারা পার্টিকে দখল করতে চান। কিন্তু সুব্রত দা’র তো এটা জানা থাকার কথা, প্রত্যেকটা সংগঠনের গঠনতন্ত্র থাকে। আমাদেরও আছে। গঠনতন্ত্র মোতাবেক বর্ধিত সভা ডাকলে তো সভাপতি হিসেবে কামাল হোসেন স্যার ডাকবেন।’

মোকাব্বির খান আরও বলেন, ‘শনিবার যেটা তারা করছেন, এটা তো বর্ধিত সভা হতে পারে না। নাগরিক হিসেবে তারা যেকোনও কিছু করতে পারেন। আমরা যদি দেখি সাংগঠনিক নীতিমালার পরিপন্থী, তখন আমরা তাদের শোকজ করবো। তারা আগেও সাংগঠনিক নীতিমালা অনুসরণ না করে অনেক কাজ করেছেন। ওই সময় শোকজ করেছি, বহিষ্কার করেছি কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং ডেকে। এরপর তারা আবার দাবি জানান—ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চান। তাদের সাসপেনশন প্রত্যাহার করলে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এরপর তো কামাল হোসেন স্যার তাদের কথা মেনে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেন। তাদের একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করলেন। এরপরও তারা কী চান, সেটা কেবল তারাই বলতে পারবেন।’

নতুন করে ঘনীভূত দলীয় সংকট নিয়ে বিদ্রোহী অংশের নেতা অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিকের কথা হয়। ড. কামাল হোসেনকে বাদ দিয়ে গণফোরামের দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা ২৭ তারিখে চূড়ান্ত হবে। সম্মেলন প্রস্তুতি ঘোষণা করা হবে। সম্মেলনে তাকে বাদ দেওয়া হবে।’

রেজা কিবরিয়ার পদত্যাগের পরও সংকট কাটেনি? এ প্রশ্নে জগলুল হায়দার আফ্রিক বলেন, ‘প্রবলেম কিছু না। দুই-তিন জন আছে, যারা স্যারকে ভুল বুঝায়। ভুল তথ্য দেয়।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. রেজা কিবরিয়া মিরর টাইমসকে কাছে উদ্ধৃত হতে রাজি হননি। তার ভাষ্য—তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। ফলে দল নিয়ে কোনও মন্তব্য করবেন না। তবে তিনি বলেন, ‘কামাল হোসেন কারও চক্রে পড়ে থাকার ব্যক্তি নন। তিনি দেশের অত্যন্ত একজন সহনশীল রাজনীতিক।’

বিদ্রোহী অংশের নেতারা জানিয়েছেন, শনিবার মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন ও দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন নেতারা। এরপর সম্মেলনে কামাল হোসেনসহ অপছন্দের নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি করবে বিদ্রোহী অংশ।

কামাল হোসেনের অনুসারী এক নেতা বলেন, বিদ্রোহী অংশের মূল সমস্যা দলের পজিশন নিয়ে। তারা যে অংশ করেছে, পজিশন নিয়ে স্বয়ং তাদের মধ্যেও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তাদের রাজনৈতিক কোনও এজেন্ডা নেই। কামাল হোসেনের রাজনৈতিক এজেন্ডার সঙ্গেও তাদের কোনও মিল নেই।

উল্লেখ্য, এর আগে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে কামাল হোসেনকে পাশ কাটিয়ে প্রথম বর্ধিত সভা করে বিদ্রোহী অংশ।