কারসাজি চক্রকে সঙ্গ দিচ্ছে ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন?

অর্থনীতি রিপোর্ট : শেয়ারবাজারে ইন্স্যুরেন্স বা বীমা কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে মেতে উঠেছে একটি চক্র। ইতোমধ্যে সংঘবদ্ধভাবে কয়েকটি গ্রুপ বেশিরভাগ বীমা কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে তুলেছে। এখন অস্বাভাবিক দামে বীমা কোম্পানির শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে এই সংঘবদ্ধ চক্র।

এক্ষেত্রে বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) একটি বিজ্ঞাপনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এ সংঘবদ্ধ চক্র। যে কারণে অভিযোগ উঠেছে বীমা কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ চক্রকে সঙ্গে দিচ্ছে ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী মোটরযানের বীমা করা বাধ্যতামূলক নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।

বিআরটিএ’র এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি পুলিশ মহাপরিদর্শক, সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, হাইওয়ে পুলিশপ্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা না থাকলে সংশ্লিষ্ট মোটরযান বা মোটরযানের মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করার কোনো সুযোগ নেই।

বিআরটিএ থেকে মোটরযানের বীমার বিষয়টি স্পষ্ট করা হলেও কয়েক দিন ধরেই শেয়ারবাজারে সংঘবদ্ধ চক্র গুঞ্জন ছড়িয়েছে সব ধরনের মোটরযানের জন্য কম্প্রিহেনসিভ বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিগগিরই বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হবে। এতে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর মুনাফা অনেক বেড়ে যাবে। এ গুঞ্জন ছড়িয়ে এ চক্র কয়েকটি সাধারণ বীমা কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে।

চক্রের এই পাঁয়তারার মধ্যেই মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) একাধিক জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিয়ে বীমা মালিকদের সংগঠন বিআইএ বলেছে, সড়ক পরিবর্তন আইন-২০১৮ এর ৬০(২) অনুযায়ী প্রতিটি মোটরযানের বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং উক্ত ধারা অনুযায়ী প্রতিটি মোটরযানের জন্য ‘কম্প্রিহেনসিভ মোটর ইন্স্যুরেন্স’ সংগ্রহ করতে হবে।

বিআইএ থেকে এমন বিজ্ঞাপন দেয়ায় মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) লেনদেনের শুরুতে প্রায় সবকটি বীমা কোম্পানির শেয়ার দাম বেড়ে যায়। যদিও পরে কিছু বীমা কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে।

একাধিক ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তারা অভিযোগ করে বলেন, বিআইএ থেকে মোটরযানের বীমার বিষয়ে যে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে, তা মূলত বাজারে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জনকে সত্য প্রমাণ করেছে। এতে বীমার শেয়ার দাম বাড়ানোর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সঙ্গে বিআইএ’র যোগাযোগ আছে এমন ধারণা করাই স্বাভাবিক।

তারা বলছেন, বিআরটিএ থেকে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে মোটরযানের বীমা আর বাধ্যতামূলক নেই। তাহলে ‘সব মোটরযানের বীমা বাধ্যতামূলক’ বিআইএ কীভাবে এ ধরনের বিজ্ঞাপন দিতে পারে। বিআইএ’র এ ধরনের বিজ্ঞাপনের পেছনে মূলত কী কারণ আছে তা ক্ষতিয়ে দেখা উচিত।

তারা আরও বলেন, বিআইএ যে ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়েছে তা মূল্য সংবেদশীল তথ্যের মধ্যে পড়ে। এতে সাধারণ বীমা কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়তে পারে। এমনিতেই বর্তমানে বেশিরভাগ বীমা কোম্পানির শেয়ার দাম অস্বাভাবিক। এই দামে শেয়ার কিনলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মধ্যে পড়তে পারেন। বিনিয়োগকারীদের উচিত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সার্বিক বিষয়ে ভালোভাবে ক্ষতিয়ে দেখা।

যোগাযোগ করা হলে বিআরটিএ’র পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী জাগো নিউজকে বলেন, ‘মোটরযানের ক্ষেত্রে বীমা আর বাধ্যতামূলক নেই। আইনে বীমা না থাকলে মামলা দেয়ার কোনো সেকশন নেই।’

বিআইএ’র দেয়া বিজ্ঞাপনের তথ্য তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, ‘আইনে প্রথমেই বলা আছে মালিক ইচ্ছা করলে বীমা করবেন। ভাষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু আমি বীমা করলাম না, তাতে আমার কী হবে? আমার কিছু হবে? আইনে তো পেনাল্টির (জরিমানা) কোনো সেকশন (ধারা) নেই। ওরা যতই এটা (বিজ্ঞাপন) দিক না কেন, কেউ যদি না করে পানিশমেন্টের কোনো সেকশন নেই। যার পানিশমেন্টের সেকশন থাকে না, তা বাধ্যতামূলক হয় কী করে?’

বিআইএ’র বিজ্ঞাপনের একটি অংশে বলা হয়েছে, ‘আইনের ১১১ ধারা অনুযায়ী পুলিশ অফিসার কর্তৃক মোটরযানের বীমা পলিসিসহ অন্যান্য কাগজপত্র পেনাল কোড ১৮৬০ এবং ৪৬৪ এ মোতাবেক মিথ্যা বা জাল কাগজপত্র রাখিবার জন্য কৈফিয়ত প্রদানের উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট মোটরযান চালক অথবা মালিককে তলব করিতে পারিবেন। এমতাবস্থায় সকল মোটরযান মালিককে কম্প্রিহেনসিভ মোটর ইন্স্যুরেন্স সার্টিফিকেট নিয়ে তাদের যানবাহন নিরাপদে রেখে সড়কে চলাচল করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

বিজ্ঞাপনের এ অংশ তুলে ধরা হলে বিআরটিএ’র পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, ‘এটা দেয়ার তারা কে? কোন আইনে তারা এটা দিয়েছে? আমাদের কথা হলো- আমাদের আইনে কোনো পেনাল্টি নেই। একটা জিনিস ম্যান্ডেটরি (বাধ্যতামূলক) তখন হয়, যখন পেলান্টি থাকে। যেমন ব্লু বুক না থাকলে পানিশমেন্ট হবে। আমরা যে সার্কুলার দিয়েছি, সেটাই ঠিক।’

কেউ আপনাদের সার্কুলারের অপব্যাখ্যা করলে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের বিজ্ঞাপন আমরা এখনো দেখিনি। আমরা আগে এটা দেখি।’

এদিকে বিআইএ’র একটি সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা পলিসি বাতিল করায় সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাবে। তবে কম্প্রিহেনসিভ মোটর ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক করা হলে আয় বড় অঙ্কে বাড়বে। যেহেতু বিআরটিএ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, মোটরযানের বীমা বাধ্যতামূলক না, সেহেতু কম্প্রিহেনসিভ মোটর ইন্স্যুরেন্স এখন বাধ্যতামূলক না। এটা জানার পরও বিআইএ’র কিছু কার্যনির্বাহী সদস্য এ ধরনের বিজ্ঞাপন দেয়ার ক্ষেত্রে বেশ তৎপর ছিলেন। শেয়ারের দাম বাড়ানোর জন্য তারা এটা করেছে কি-না তা ক্ষতিয়ে দেখা উচিত।

এ বিষয়ে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে প্রশ্ন শুনে বিআইএ’র সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘আমি একটি মিটিংয়ে আছি। আপনি আমাদের সেক্রেটারি জেনারেলের (মহাসচিব) সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’

এরপর বিআইএ’র মহাসচিব নিশীথ কুমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সব মোটরযানের বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, এটা আইনে বলা আছে। এটা আমরা বলিনি।’

এ সময় তাকে পাল্টা প্রশ্ন করা হয় বিআরটিএ বলছে- আপনারা আইনের ভুল ব্যাখ্যা করছেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা অপব্যাখ্যা করছি, আর ওনারা (বিআরটিএ) সঠিক ব্যাখ্যা করছেন। তাহলে আপনিই বলেন কোনটা ঠিক হবে?’

বিআইএ’র বিজ্ঞাপনের কারণে শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মধ্যে পড়লে তার দায়দায়িত্ব কে নেবে? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘তা তো ভাই আমি বলতে পারবো না। তবে আমাদের সব বীমা বিশেষজ্ঞরাই এটা (বিজ্ঞাপন) তৈরি করেছেন।’

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের সার্ভিলেন্সের নজরে এসেছে। যেহেতু এটা (বিজ্ঞাপন) একটি অ্যাসোসিয়েশন থেকে দেয়া হয়েছে, সেহেতু আইন অনুযায়ী মোটরযানের বীমা বাধ্যতামূলক কী না তা আমরা পরীক্ষা করে দেখবো। দরকার হলে বিআরটিএ’র মতামত চাওয়া হবে এবং পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি মোটরযানের বীমা বাধ্যতামূলক না হয়, তাহলে এই বিজ্ঞাপন দিয়ে শেয়ারের দাম ইনফ্লুয়েন্স করার চেষ্টা করা হয়েছে কী না তা পরীক্ষা করা হবে এবং সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

নতুন সড়ক পরিবহন আইনে বীমার বিষয়ে কী আছে-
মোটরযানের বীমার বিষয়ে নতুন আইনের ধারা ৬০ এর উপধারা (১) (২) ও (৩)-এ বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এই তিন উপধারায় বলা হয়েছে-

১. যেকোনো মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলে তার মালিকানাধীন যেকোনো মোটরযানের জন্য যে সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট করা তাদের জীবন ও সম্পদের বীমা করতে পারবে।

২. মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠানের অধীন পরিচালিত মোটরযানের জন্য যথানিয়মে বীমা করবেন এবং মোটরযানের ক্ষতি বা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি বীমার আওতাভুক্ত থাকবে। বীমাকারী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন।

৩. মোটরযান দুর্ঘটনায় পতিত হলে বা নষ্ট হলে ওই মোটরযানের জন্য ধারা ৫৩ এর অধীন গঠিত আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাবে না।