‘২০২০ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যা ১৮৮’

মিরর ডেস্ক : বিগত বছরগুলোর মতো এই অতিমারির বছরেও (২০২০) মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন কমিটির প্রশ্ন ও উদ্বেগ ছিল বলে বৃহস্পতিবার (৩১ ডিসেম্বর) এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জানায় সংগঠনটি।

বিচারবহির্ভূত হত্যা

আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানায়, ২০২০ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও গুলিবিনিময়ে নিহত হয়েছেন ১৮৮ জন। তবে সরকার কখনও এগুলো অস্বীকার করেছে, আবার কখনও এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এ বছরের ১৪ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য ধর্ষককে সরাসরি ক্রসফায়ারে দিয়ে হত্যার দাবি জানান। রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নকারী ব্যক্তিদের এমন বক্তব্য ‘ক্রসফায়ার’ এর মতো আইন ও সংবিধানবহির্ভূত পন্থাকে উৎসাহিত করে বলে অনেকে মনে করেন।

হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু

আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলেছে, ২০২০ সালে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে (গ্রেফতারের পর) নিহত হয়েছেন ১১ জন। এছাড়া গ্রেফতারের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনে মারা যান ৫ জন এবং গুলিতে নিহত হয়েছেন ৮ জন। অপরদিকে এ বছর দেশের কারাগারগুলোতে অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে মারা গেছেন ৭৫ জন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ ও গুম

ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানায়,বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার গুমের ঘটনা অস্বীকার করা হলেও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার ব্যবস্থার আওতাধীন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ কমিটি এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

২০২০ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও নিখোঁজের শিকার হন ৬ জন। এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে ৪ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন ২ জন।

সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতন

সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বারবার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও কমেনি সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা। সর্বশেষ গত ২২-২৬ ডিসেম্বর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের মধ্যে ৫১তম সীমান্ত সম্মেলনেও সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা-নির্যাতনের বিষয়ে বিজিবি’র পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং বিএসএফের পক্ষ থেকে তা শূন্যে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। সংগঠনটির তথ্যমতে, এ বছর ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে ৪২ জন এবং শারীরিক নির্যাতনে ৭ জনসহ মোট ৪৯ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

নারী অধিকার পরিস্থিতি

করোনা মহামারির সময়েও থেমে থাকেনি নারীর প্রতি সহিংসতা। এ সময়কালে নারী নির্যাতন, বিশেষ করে ধর্ষণ ও পারিবারিক নির্যাতন বেড়েছে। আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ৩১ ডিসেম্বর (২০২০) পর্যন্ত ১৬০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

২০২০ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট এক হাজার ৬২৭ নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৫৩ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। অথচ ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এক হাজার ৪১৩ নারী এবং ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২।

নির্যাতন, উত্ত্যক্তকরণ ও যৌন হয়রানি

 ২০২০ সালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ২০১ নারী। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন ১০৬ পুরুষ। এ বছর উত্ত্যক্তকরণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১৪ নারী। এ ছাড়া যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ নারী ও ১১ পুরুষসহ খুন হয়েছেন মোট ১৪ জন।

পারিবারিক নির্যাতন ও যৌতুক

এ বছর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ৫৫৪ নারী। এদের মধ্যে নির্যাতনের কারণে মারা যান ৩৬৭ জন এবং আত্মহত্যা করেন ৯০ জন।

গৃহকর্মী নির্যাতন ও অ্যাসিড নিক্ষেপ

 ২০২০ সালে ৪৫ নারী গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের পরবর্তী সময়ে মারা যান ৩ নারী। অন্যদিকে এ বছরে অ্যাসিড নিক্ষেপের শিকার হয়েছেন ২৭ নারী।

স্বাস্থ্যের অধিকার

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ (করোনা) ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের কারণে স্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয় নেমে আসে। সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে ‘করোনাভাইরাসে আক্রান্ত’ সন্দেহে রোগীদের বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পাওয়া এবং আইসিইউ সাপোর্টের অভাবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে অনেকের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। এছাড়া অন্যান্য সাধারণ রোগের চিকিৎসা প্রত্যাশীরাও মারাত্মক বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন।

৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মোট ১২৭ জন চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করেছেন। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন ৮২ জন।

করোনা সংক্রমণকালে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃত। এটি মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদসহ অন্যান্য মানবাধিকার দলিলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতি নাগরিকের এ অধিকার খর্ব করছে।

মত প্রকাশের অধিকার

করোনাকালে মত প্রকাশের অধিকার খর্ব করাসহ দমন-পীড়ন বেড়েছে। বিশেষ করে এ সময়কালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হয়রানিমূলক মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১৩০টি মামলা হয়েছে এবং এসব মামলায় ২৭১ জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী কর্তৃক ভিন্নমতের প্রতি হুমকি, হামলা ও ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

সাংবাদিক নির্যাতন

আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানায়, করোনাকালেও স্বাধীনভাবে খবর সংগ্রহ এবং তা প্রকাশের কারণে নির্যাতন, মামলা ও গ্রেফতারসহ বিভিন্ন হয়রানির শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। ২০২০ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সন্ত্রাসী, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতন, হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানিসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৪৭ সাংবাদিক। এর মধ্যে ২ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হন।

অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে ১৩ মার্চ মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে এনে ‘মাদকবিরোধী অভিযানে’ আটক দেখানো হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। ১৫ মার্চ স্থানীয় আদালত সাংবাদিক আরিফুলকে জামিন প্রদান করেন।

সভা-সমাবেশে বাধাদান

শান্তিপূর্ণভাবে সভা সমাবেশ করা ও প্রতিবাদ জানানো নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, যা বিভিন্ন মানবাধিকার দলিলেও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে।

সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার

বিগত বছরগুলোর মতো ২০২০ সালেও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপসনালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরও হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বছরের বিভিন্ন সময়ে।

শিশু অধিকার

২০২০ সালের শিশু অধিকার লঙ্ঘনের চিত্রে দেখা যায়— শিশু হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, বলাৎকার, অনলাইনে যৌন হয়রানি, সরকারি শিশু-কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো বছরজুড়ে অব্যাহত থেকেছে। ২০২০ সালে শারীরিক নির্যাতনের কারণে মৃত্যু, ধর্ষণের পরে হত্যা, ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে নিহত হয় মোট ৫৮৯ শিশু।

শ্রমিক অধিকার

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটি ও লকডাউন চলাকালে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন শ্রমজীবী মানুষেরা। এই সংকটকালীন সময়ে শ্রমিকদের চাকরি হারানো, বেতন না পাওয়াসহ নানা ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া অন্যান্য বছরের ন্যায় ২০২০ সালেও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অনেক শ্রমিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

অভিবাসী শ্রমিক

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ বছরের মার্চ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ২১টি দেশে ২ হাজার ৩৩০ জন বাংলাদেশি অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। অপরদিকে বিগত বছরগুলোর মতো ২০২০ সালেও সৌদি আরব, লেবানন, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী নারী শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন। এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৬৩ জন নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফেরত এসেছে। করোনাকালে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা চাকরি হারানোসহ নানা প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেক শ্রমিককে তাদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ না করে বা বকেয়া মজুরির অল্প কিছু পরিশোধ করে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।

 গণপিটুনি

বিগত বছরগুলোর ন্যায় এ বছরেও গণপিটুনির প্রবণতা কমেনি। বাংলাদেশে গণপিটুনি সংক্রান্ত কোনও সুনির্দিষ্ট আইন নাই। তবে গত বছরের আলোচিত ‘গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম রেনু নামে এক নারীর মৃত্যু’র ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত এ বছরের ১ মার্চ গণপিটুনি বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঁচটি নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে গণপিটুনির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক এফআইআর গ্রহণ, সরকারের পক্ষ থেকে গণপিটুনির বিষয়ে সচেতনামূলক প্রচার চালানো প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে গণপিটুনির ঘটনায় মোট ৩৫ জন নিহত হয়েছেন।