সময় পরিক্রমা আল্লাহর অপূর্ব নিদর্শন

মিরর ডেস্ক : প্রাচীন কালে চন্দ্র-সূর্যের গতি-প্রকৃতি ও সময়ের গতিময়তা নিয়ে কাল্পনিক বিভিন্ন কুসংস্কারের প্রচলন ছিল। বিভিন্ন তারিখকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করা হতো। অনুরূপ বিভিন্ন তারিখকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক বা অপয়া মনে করে ওই দিন বিয়েশাদি, বিদেশযাত্রা থেকে বিরত থাকত। ইসলামে এই অমূলক ধারণা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। চাঁদের হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা একটি প্রাকৃতিক ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করে দিয়েছেন। চাঁদকে কেন্দ্র করে হিজরি মাসের হিসাব, সূর্যকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টীয় বছরের হিসাব করা হয়।

আল্লাহ তাআলা নিজেই চান্দ্রমাসের হিসাব সংরক্ষণের নির্দেশ প্রদান করে বলেন, ‘মানুষ আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। (হে নবী) আপনি বলুন, তা মানুষ ও হজের জন্য সময় নির্দেশক।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৯) আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনার মাস ১২টি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান…।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)

সময়ের নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতেই : সময়কে মহান আল্লাহই নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনিই দিবারাত্রির আবর্তন ঘটান। ইহকাল-পরকালের সময় নির্ধারণ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ দিন ও রাত্রির পরিবর্তন ঘটান। এতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য চিন্তার উপকরণ আছে।’ (সুরা : আন-নুর, আয়াত : ৪৪)

আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বলেছেন, মানুষ সময়কে গালি দিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়। অথচ আমিই সময় (সময়ের স্রষ্টা)। সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ আমার হাতেই। আমি রাত-দিনের পরিবর্তন করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৮৯১)

সময়ের পরিক্রমায় দিবারাত্রির পরিবর্তন : মানুষের জন্য আল্লাহ দিবারাত্রি সৃষ্টি করেছেন। সূর্যের আলোতে দিবাভাগে মানুষ জীবিকা অন্বেষণ করে থাকে। এরপরই আসে রাত। মুমিনের জীবনে দিনের পরে রাত আসে, অন্ধকারের পর আসে আলো, বৃদ্ধি পাওয়ার পরে তৈরি হয় হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি। এসবই আল্লাহর এক একটি নিদর্শন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি রাত ও দিনকে দুটি নিদর্শন করেছি। অতঃপর নিষ্প্রভ করে দিয়েছি রাতের নিদর্শন এবং দিনের নিদর্শনকে দেখার উপযোগী করেছি, যাতে তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করো এবং যাতে তোমরা স্থির করতে পারো বছরের গণনা ও হিসাব। আর আমি সব বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ১২)

মুমিনের সময় অত্যন্ত মূল্যবান : মুমিনের কাছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। তাই কোনো মুমিন অযত্নে অবহেলায় সময় নষ্ট করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিনরা সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাজে বিনয় ও নম্র, যারা অনর্থক কথাবার্তায় বিমুখ।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১-৩)

রাসুল (সা.) বলেন, মানুষ যখন অনর্থক বিষয়াদি ত্যাগ করে, তখন তার ইসলাম সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস : ৯৪৮)

পরকালে সময়ের হিসাব নেওয়া হবে : আল্লাহ তাআলা মানুষকে নির্দিষ্ট হায়াত দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। হায়াতের বাজেট শেষ হয়ে গেলে তাকে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। আলমে বারজাখ তথা কবরের জগতের নির্দিষ্ট সময় অতিক্রম করে তাকে কিয়ামতের কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে সব কিছুর হিসাব দিতে হবে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘এমন দুটি নিয়ামত আছে, যে দুটিতে বেশির ভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে সুস্থতা ও অবসর (তথা সময়)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪১২, তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৪)

রাসুল (সা.) আরো বলেন, চারটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত বিচার দিবসে কোনো মানুষ তার পা নাড়াতে পারবে না। ১. তার হায়াত বা জীবন কোথায় ব্যয় করেছে। ২. তার যৌবন সম্পর্কে, তা কোথায় বিলীন করেছে। ৩. তার সম্পদ সম্পর্কে, তা কোথা থেকে আয় করেছে এবং কোথায় খরচ করেছে। ৪. সে যা জেনেছে, সে অনুযায়ী কতটা আমল করেছে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৬)

সকাল, সন্ধ্যা ও রাতের শেষাংশের বিশেষ মর্যাদা : দিনের কিছু নির্দিষ্ট সময়কে আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, অতএব (হে নবী) এই লোকেরা যেসব কথা বলে আপনি সে বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করুন এবং সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের আগে নিজ প্রতিপালকের তাসবিহ ও প্রশংসা করুন। এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন রাত্রির কিছু অংশ ও দিবাভাগে, সম্ভবত তাতে আপনি সন্তুষ্ট হবেন। (সুরা তা-হা, আয়াত : ১৩০)। সুতরাং মুমিনের উচিত হলো রুটিন মেনে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সময় অতিবাহিত করা।

সময়ের প্রতি কর্তব্যবোধ : রাসুল (সা.) প্রত্যেক কিছুর অধিকার ও কর্তব্য ভাগ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, তোমার ওপর তোমার প্রভুর হক রয়েছে, তোমার দেহ ও পরিবারের হকও রয়েছে। এতএব প্রত্যেককে তাদের প্রাপ্য আদায় করে দাও। সুতরাং পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামের সব বিধি-বিধান পালনের জন্য জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকলেও সময়মতো তা আঞ্জাম দিলে আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।

দিনের হিসাব অনুযায়ী সাত দিনে এক সপ্তাহ, ৩০ দিনে এক মাস, আবার ১২ মাসে এক বছর ধরে হিসাব করা হয়। সময়ের এই বিভাজনে মহৎ শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য। এর মাধ্যমে যারা খোদাভীরু তারা উপকৃত হয়ে থাকে। তারাই এর মাধ্যমে পরকালের রসদ সংগ্রহ করে এবং আল্লাহর এই নিদর্শন দেখে কৃতজ্ঞতাবোধ আরো বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা দিন যত দীর্ঘ হোক না কেন রোজা রাখা বন্ধ করেনি, ঠাণ্ডা যত গভীর হোক না কেন তারা গভীর রাতের নামাজ ত্যাগ করেনি। তারা দিন-রাত, ঠাণ্ডা-গরম, ঝড়-তুফান সব ক্ষেত্রেই ইবাদতে অটল থাকে।

লেখক : সহকারী শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)