বিদায় ২০২০, স্বাগত ২০২১

বিভুরঞ্জন সরকার :

২০২০ সাল বিদায় নিচ্ছে। এই বছরটিকে বরণ করার সময় কেউ ভাবেনি যে, বছরটি মানব জাতির জন্য এতটা বিষময় হবে। ২০২০ কাটলো আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে। প্রায় সারা বছরই থাকলো করোনাভাইরাসের মরণ-ভীতি। আগের বছরের একেবারে শেষ দিকে চীনের উহান শহরে যে ভাইরাস প্রথম সনাক্ত হয়েছিল, তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে খুব সময় লাগেনি। ২৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নতুন ভাইরাসটির নাম দেয় কোভিড-১৯।

২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দ কোভিড-১৯ বা মরণব্যাধি করোনাভাইরাস। বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করেছে করোনাভাইরাস। পৃথিবীর অর্ধেক জনগোষ্ঠী, প্রায় ৪০০ কোটি মানুষকে মাসের পর মাস ঘরবন্দি থাকতে বাধ্য করেছে এই মহামারি । প্রায় ৮ কোটি মানুষ করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। মৃত্যু বরণ করেছেন প্রায় ১৮ লাখ মানুষ। আরও কত মানুষের জীবন কেড়ে নিয়ে করোনা তার সংহার তাণ্ডব বন্ধ করবে তা এখনও বলা যাচ্ছে না। কারণ এখন দেশে দেশে চলছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। প্রতিদিনই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মৃত্যুবরণ করছে।

নানা ধরনের দুর্যোগ-দুর্বিপাক, মড়ক-মহামারির অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর আছে। প্রাণঘাতী অসুখও আগে একাধিকবার হয়েছে। মহামারিতে মৃত্যুর ঘটনাও নতুন নয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে প্লেগ রোগে বিশ্বের তখনকার মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ নিশ্চিহ্ন হয়েছিলেন বলে জানা যায়। ১৯১৮-১৯ সালে স্প্যানিশ ফ্লুতে কমপক্ষে ৫ কোটি মানুষের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তারপর এইডস রোগেও ৩ কোটি ৩০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছে। সে সব তুলনায় করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা কম হলেও পৃথিবীজুড়ে মানুষের মধ্যে এ নিয়ে যে ভয় ও অসহায় অবস্থা তৈরি হয়েছে তা তুলনাহীন। বিশ্বে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটির কাছাকাছি।

এই বিপুল জনগোষ্ঠীর এখন একটাই আশা, করোনা-ঝড় মোকাবিলা করতে সক্ষম হোক মানুষ। বছর বিদায়ের আগেই অবশ্য আশার আলো দেখিয়েছে চিকিৎসা-বিজ্ঞান। বিরুদ্ধ-পরিবেশের কাছে মানুষের পরাভব না মানার যে স্পৃহা তা আবার জয়ী হয়েছে। স্বল্পতম সময়েই আবিষ্কার হয়েছে করোনার ভ্যাকসিন। কয়েকটি দেশে ভ্যাকসিনের ব্যবহারও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশও নতুন বছরের শুরুতেই ভ্যাকসিন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সমতার ভিত্তিতে সবার কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছাতে কত সময় লাগবে, এটা কতটা সহজলভ্য হবে, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও আশাহত হওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না।

১০০ বছর আগে বা তারও আগে পৃথিবীটা এখনকার মতো এত নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তথ্যের আদানপ্রদান এখনকার মতো সহজ ছিল না। মহামারির বিস্তার ঘটতেও যেমন সময় লাগতো, তেমনি শঙ্কাও দ্রুত ছড়াতো না। এখন তো পুরো পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোয়। বিপদের কথা যেমন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে, তেমন আশা জাগানিয়া খবরের জন্যও অপেক্ষায় থাকতে হয় না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক উৎকর্ষ সাধন হয়েছে মানুষের হাত ধরেই, মানুষেরই অব্যাহত চেষ্টায়। আগে কোনো মহামারির ওষুধ আবিষ্কারে যেখানে লাগতো বছরের পর বছর, এখন সেখানে করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কার সম্ভব হলো কয়েক মাসের চেষ্টায়ই।

মানুষ যেমন মারণাস্ত্র আবিষ্কারে দক্ষতা দেখাতে পারছে, তেমমি জীবন রক্ষার ওষুধ আবিষ্কারও মানুষের সাধ্যের বাইরে নয়। মানুষ মরণশীল হলেও মানুষের অসাধ্য কিছু থাকছে না। পৃথিবীকে বাসঅযোগ্য করার জন্য যেমন কিছু মানুষের দুষ্ট বুদ্ধি দায়ী, তেমনি পৃথিবীকে নতুন করে গড়ে তুলতেও শুভবুদ্ধির মানুষেরাই এগিয়ে আসে। প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা, নিষ্ঠুরতা করার পাশাপাশি প্রকৃতি রক্ষায়ও উদ্যোগী হচ্ছে মানুষই। তাই মানুষের ওপর বিশ্বাস না হারিয়ে আশায় দিন গুণতে হবে আমাদের। ঝড় যেমন ওঠে, তেমনি ঝড় থেমেও যায়। করোনাকাল নিশ্চয়ই চিরস্থায়ী হবে না। করোনাভীতি কাটিয়ে উঠে হয়তো নতুন কোনো ভয়ের মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে ভয়ই শেষ কথা নয়। জয়ের হাতছানি থাকেই।

করোনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে কি শিক্ষা আমরা নেবো – সেই প্রশ্নের সঙ্গে এ প্রশ্নও আছে যে, করোনা-পরবর্তী পৃথিবীটা কি করোনা-পূর্ববর্তী পৃথিবীর মতোই থাকবে? ২০২১ সাল কি ২০২০ সালের কার্বন কপি হবে? না। নদীতে এক পানি দুইবার প্রবাহিত হয় না। পবিরবর্তন হলো জীবজগতের বড় বৈশিষ্ট্য। বেশির ভাগ মানুষই পরিবর্তন চায় এবং সে পরিবর্তন অবশ্যই ভালোর দিকে। করোনা সব দেশের সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতিতে কিছু না কিছু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, করবে। করেনাকালে সব কিছু একেবারে থেমে না থাকলেও, অস্বাভাবিক অবস্থা তো তৈরি হয়েইছে।

অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়েছে। মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অনেক মানুষ কর্মহীন হয়েছে। কাজের সুযোগ ও পরিধি সংকুচিত হয়েছে। অনেক মানুষকে বেকারত্বের জ্বালা সহ্য করতে হচ্ছে, হবে। খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে কোথাও কোথাও। দুনিয়াব্যাপীই শিক্ষার্থীদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হয়তো অনেকে ঝরে পড়বে। সমাজে দেখা দেবে সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া। করোনার কারণে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন না, এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধনী গরিব নির্বিশেষে সব দেশই করোনার ঝাঁকিতে কেঁপেছে। ২০২০ যে দুর্যোগ চাপিয়ে দিয়ে বিদায় নিচ্ছে, ২০২১ তা কতটুকু সামলে উঠতে পারবে, সেটাই দেখার বিষয়।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন বছরে পেতে চলেছে নতুন প্রেসিডেন্ট। গত ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজিত হয়েছেন। জিতেচেন ডেমোক্রেটিক পার্টির জো বাইডেন। যদিও ট্রাম্প তার পরাজয় মেনে নিতে গড়িমসি করছেন, তবুও এটাই সত্য যে তাকে নতুন বছরের ২০ জানুয়ারি বাইডেনের হাতে ক্ষমতা দিয়ে হোয়াইট হাউস ছাড়তে হবে।

ট্রাম্প তার ক্ষমতাকালে আমেরিকাকে কোনো নতুন মর্যাদার আসনে নিতে পারেননি। তার খামখেয়ালিপনার জন্য বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার দাপট বরং কমেছে। করোনা মোকাবিলায়ও তিনি চরমভাবে ব্যর্থ। করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকায় আমেরিকার শীর্ষ অবস্থানই ট্রাম্পের সাফল্য।

আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা চীনের ব্যাপারে কঠোর মনোভাবের কারণে ট্রাম্প কারো কারো কাছে প্রশংসিত হলেও খোদ মার্কিন মুলুকে তিনি যে বিভেদের বীজ রোপন করেছেন, তা নিয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে উদ্বিগ্ন মানুষের সংখ্যাই বেশি। বর্ণবাদকে উস্কে দিয়েছেন। মানুষে মমানুষে বিভেদ বাড়ানোর কোনো সুযোগ তিনি হাত ছাড়া করেননি। বাইডেন ক্ষমতায় এসে আমেরিকাকে কোন পথে চালাবেন, বিশেষ কোনো চমক দেখাতে পারবেন কি না, চীনের ব্যাপারে তার অবস্থান কি হয়, সেসব বিষয়ে যেমন দুনিয়াব্যাপী আগ্রহ আছে, তেমনি ট্রাম্পও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে অস্বাভাবিক কিছু করেন কি না, তা নিয়েও দুর্ভাবনা আছে বৈ কি!

বিদায়ী বছরে চীন-ভারতের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে যে অশান্তির আবহ তৈরি হয়েছিল, তা-ও পুরো দূর হয়নি। চীন এখন অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বসেরা। আমেরিকার আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা চীনের আছে। আবার চীনের খবরদারি না মানার মতো মিত্র আমেরিকারও আছে। এশিয়া অঞ্চলে ভারতও ক্ষমতাধর হয়ে উঠছে, যেটা চীনের না-পছন্দ। সব মিলিয়ে করেনাকালেও কিন্তু বিশ্বরাজনীতির বিভাজন সচেতন কারো নজরের বাইরে ছিল না। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেরই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে বিশ্বরাজনীতি। পৃথিবী যখন দুই শিবিরে বিভক্ত ছিল, তখন আদর্শগত অবস্থান থেকে দেশে দেশে সম্পর্ক নির্ধারণ হলেও এখন সবকিছুই স্বার্থকেন্দ্রিক। কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে কি লাভ, সে বিবেচনাই এখন বন্ধুত্ব তৈরির মাপকাঠি। বাংলাদেশও রাজনীতির বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক হিসাবনিকাশের বাইরে নয়।

২০২০ সাল বাংলাদেশের জন্য ভালোয়-মন্দয় মিশানোই ছিল। বাংলাদেশও করোনার ধকল মুক্ত থাকেতে পারেনি । তবে যতটা বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হয়েছিল ততটা হয়তো হয়নি। অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েনি। অনেকে কর্মহীন হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। রাজনীতিও অনেকটাই করোনাকবলিত। সরকার এবং সরকারি দলের প্রাধান্য নজর এড়ায় না। বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা সীমিত। অভ্যণ্তরীণ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারছে না এক সময়ের প্রবল প্রতাপশালী রাজনৈতিক দল বিএনপি । নতুন বছরে দলটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, এখনই তা বলা মুশকিল।

২০২০ সালে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মুজিববর্ষ হিসেবে পালন করে আওয়ামী লীগ দলীয় শক্তি সংহত করার যে পরিকল্পনা করেছিল, তা সম্ভব হয়নি করোনার কারণে। ২০২১ সাল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এ বছরটাও কি আগের পরিকল্পনা মতো উদযাপন করা যাবে? করোনার দাপট না কমলে রাজনীতির ময়দানে কেউই দাপট দেখাতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে নতুন বছরের জন্য নতুন পরিকল্পনা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নিশ্চয়ই আছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, বিএনপি চায় ক্ষমতায় যেতে। নতুন বছরে চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই রাজনৈতিক শক্তি একে অপরের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে কি না, দেখার বিষয় সেটাই। বিদায়ী বছর ২০২০- এ আমরা হারিয়েছি অনেক কিছু। অনেকে হারিয়েছেন স্বজন-প্রিয়জন। অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেকে। আবার কারো কারো প্রাপ্তিযোগও হয়েছে কোনো না কোনোভাবে। সালতামামি নিশ্চয়ই যে যার মতো করবেন। তবে ২০২০কে বিদায় জানাতে মন হয়তো ভারাক্রান্ত হবে কম, কারণ বিশ যে বিষ ছড়িয়েছে বেশি। নতুন বছর ২০২১-কে স্বাগত জানানো হবে আশায় বুক বেঁধে। কারণ একুশ যে আমাদের চেতনার সঙ্গে মিশে আছে। তাই ২০২১ হোক আশা ও প্রেরণার বছর।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।