আলোচিত স্বাস্থ্য খাত

উন্নত পাশ্চাত্য বিশ্বের মতো বছরের আলোচিত সেরা ব্যক্তিত্ব, সেরা ঘটনা কিংবা বিতর্কিত অথবা আলোড়িত কোন বিষয় নিয়ে বিশেষ করে গণমাধ্যমে তুলে ধরার রেওয়াজ আমাদের দেশে প্রায় নেই বললেই চলে। অধুনা অবশ্য সেই চেষ্টা-চরিত্র চলছে গত কয়েক বছর ধরে। বর্তমান বাংলাদেশ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে ফোর্বসসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছেন বিভিন্ন সময়ে প্রধানত কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য। যেমন-মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয়ের স্থান করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে অভিহিত হয়েছেন ‘মানবতার জননী’ অভিধায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও অনেক বিরল সম্মান, মর্যাদা ও অভিধায় তিনি ভূষিত হয়েছেন, যা প্রভূত সুখ্যাতি বয়ে এনেছে দেশের জন্য। কোভিড-১৯ মহামারীজনিত লকডাউনে বিপুল আর্থিক ক্ষতি ও ঝুঁকি মোকাবেলা করে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোসহ ভয়াবহ মন্দাবস্থা মোকাবেলার চিত্রও উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। স্থান পেয়েছে বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির গবেষণায়। এত কিছু অর্জন এবং স্বীকৃতি সম্মানের পরও বলতেই হয় যে, কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রধানত স্বাস্থ্য খাতের চরম অনিয়ম-অবহেলা-অব্যবস্থার চিত্রটিই প্রায় সারা বছর ধরে উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। এতে প্রধান সেবা খাতের দুরবস্থাসহ সমন্বয়হীনতার চিত্রও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য খাতের জনবল নিয়োগ-বদলিসহ কেনাকাটায় পদে পদে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, চিকিৎসায় চরম গাফিলতি, রোগীর ভোগান্তি, অক্সিজেনসহ আইসিইউর সঙ্কট এমনকি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার নামে রোগী হত্যার অভিযোগ পর্যন্ত উঠে এসেছে। যা এক কথায় ভয়াবহ ও মর্মান্তিক। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের বিদায় নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বদলি করা হয়েছে স্বাস্থ্য সচিবকে। পদত্যাগের দাবি উঠেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর। আশার কথা এই যে, এক্ষেত্রেও পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। প্রধানমন্ত্রীর নানা উদ্যোগ ও নির্দেশনায় বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে শুরু করেছে। চলতি বছর স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। করোনা ভ্যাকসিন দেশে আনাসহ কয়েক কোটি ব্যক্তিকে বিনামূল্যে দেয়ার জন্য আলাদাভাবে রাখা হয়েছে থোক বরাদ্দ। আগামীতে সর্বস্তরে এর সফল প্রয়োগের ওপরই মূলত নির্ভর করছে স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যত সাফল্য।

চীনের উহান থেকে উদ্ভূত কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস হন্তারক মহামারী রূপে প্রায় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার কারণেই সম্ভবত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থা, অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উদ্ঘাটিত হতে পেরেছে। একের পর এক বেরিয়ে এসেছে নানাবিধ অপকর্ম ও অপতৎপরতার কাহিনী। রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতাল, জিকেজিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক প্রতারণা ও হঠকারিতার খবর। এর বাইরেও রয়েছে আরও নানা দুর্নীতি-অনিয়মের খবরাখবর, যা ছড়িয়ে রয়েছে দেশব্যাপী এবং প্রধানত কোভিড-১৯ কে ঘিরেই। স্বস্তির কথা এই যে, এসব প্রতারক গোষ্ঠীর কয়েকজন যেমন, রিজেন্টের চেয়ারম্যান সাহেদ, এমডি পারভেজ, জিকেজির চেয়ারম্যান ডাঃ সাবরিনা, ম্যানেজিং ডিরেক্টর আরিফসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেকেই আছেন কারান্তরালে। এর পাশাপাশি রয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের বিপুল অর্থ ব্যয়ে মাত্রাতিরিক্ত দামে নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই, গ্লাভস, স্যানিটাইজার এবং ওষুধপত্র কেনার বিস্তর অভিযোগ- যেসব বেরিয়ে এসেছে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শুধু অসততা, নীতি-নৈতিকতাবহির্ভূত অভিযোগই নয়; দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সর্বজনমহলে। এহেন অব্যবস্থা, অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি এমনকি প্রায় অরাজকতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণসহ ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্য খাতে তা চলতেই থাকবে আগামীতেও। আর তাতে বিপন্ন হবে জনস্বাস্থ্য ও জনজীবন।