বরফ গলছে না মমতার, তিস্তা অনিশ্চিত

মাসুদ কার্জন, ঢাকা : পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে প্রায় ১০ বছর ধরে আটকে আছে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রতিশ্রুত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। গত ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের পর খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিস্তা চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে ভারত অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে চুক্তি সইয়ের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ভারতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, চুক্তির জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য ভারতে এখনো সৃষ্টি হয়নি। নয়াদিল্লি সেই ঐকমত্যের অপেক্ষায় আছে।

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ে মমতাই কি এখন একমাত্র বাধা—এমন প্রশ্নে নয়াদিল্লির সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি অনেকাংশে এমনই। এখনো পর্যন্ত মমতার যে অবস্থান তাতে তিনি নয়াদিল্লিকে ঢাকার সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি করতে দেবেন না। অন্যদিকে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও অনুসৃত নীতি অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারও সংশ্লিষ্ট রাজ্যকে পাশ কাটিয়ে চুক্তি করবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী বছরের এপ্রিল-মে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজ্যে কোন দল ক্ষমতায় আসে তার ওপর তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনাও অনেকটাই নির্ভর করছে।

ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন এক বিশ্লেষক মিরর টাইমসকে বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবার বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের অঙ্গীকার পূরণে জোরালো আগ্রহ আছে। এখানে বাধা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহল, বিশেষ করে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

কলকাতা ও নয়াদিল্লির বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হলে পশ্চিমবঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন যুক্তি দেখিয়ে আসছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তিস্তা চুক্তি সইয়ের কৃতিত্বও তিনি মোদি সরকারকে দিতে চান না। অন্যদিকে ২০১৭ সালের এপ্রিলে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, কেবল তাঁর সরকার ও শেখ হাসিনার সরকারই তিস্তার পানিবণ্টনের সুরাহা করতে পারে। এর আগে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের পর বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ছিটমহল বিনিময় ভারতে সর্বসম্মতিক্রমে বাস্তবায়নের মতো দক্ষতা দেখিয়েছেন।

ঢাকার সরকারি সূত্রগুলো বলছে, তিস্তা চুক্তি সইয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো নরেন্দ্র মোদির সরকারের ওপর আস্থা রাখছে। দুই দেশের সুসম্পর্কের এই সময়ে তিস্তা চুক্তি সই জনগণের মধ্যে আরো শুভ বার্তা দেবে।

গত ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত ভার্চুয়াল শীর্ষ বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতেও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির কথা স্থান পেয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে দুই দেশের সরকারের সম্মত হওয়া তিস্তার পানিবণ্টনে অন্তর্বর্তী চুক্তি দ্রুত সইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে তাঁর দেশের আন্তরিক অঙ্গীকার ও তাঁর সরকারের অব্যাহত চেষ্টার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দুই নেতা ছয়টি অভিন্ন নদ-নদী মনু, মুহুরি, খোয়াই, গোমতী, ধরলা ও দুধকুমারের পানিবণ্টনে অন্তর্বর্তী কাঠামো চুক্তি দ্রুত সই করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

ঢাকা ও নয়াদিল্লির কর্মকর্তারা বলেছেন, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই দুই দেশের কারিগরি দলের বৈঠক করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। ওই কারিগরি দলের বৈঠকের পর জেআরসির পানিসম্পদ সচিব পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানেই অভিন্ন ছয়টি নদ-নদীর পানিবণ্টন কাঠামো চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার কথা। এরপর জেআরসির পানিসম্পদ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তা অনুমোদন করা হবে। আগামী মার্চ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। সেই সফরের আগে পানিবণ্টন বিষয়ে উদ্যোগের দৃশ্যমান অগ্রগতির জন্য দুই দেশের আগ্রহ আছে।