পুঁজিবাজার থেকে রেকর্ড অর্থ সংগ্রহ

অর্থনীতি রিপোর্ট : মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপে সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও বিদায়ের পথে থাকা ২০২০ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেছেন উদ্যোক্তারা।

আগের বছরের তুলনায় এ বছর আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তিনগুণের বেশি অর্থ নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এমনকি গত তিন বছরে সম্মিলিতভাবে যে পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে, শুধু ২০২০ সালেই তার থেকে বেশি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হলেও বছরের শুরুর চিত্র মোটেও ভালো ছিল না। মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। ফলে এ সময় বন্ধ থাকে শেয়ারবাজারের লেনদেন।

তার আগে ২০১৯ সালে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ওঠে, খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একের পর এক দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিচ্ছে। যার ফলে সার্বিক শেয়ারবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে সব থেকে বেশি সমালোচনা হয় কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজের আইপিও অনুমোদন নিয়ে। এক পর্যায়ে বড় ধরণের সমালোচনার মুখে পড়ে গত বছরের ৩০ এপ্রিল কমিশন সভা করে নতুন আইপিও না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি।

ওই সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়- সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক ইস্যু) রুলস ২০১৫ সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত ৩০ এপ্রিল থেকে আইপিও সংক্রান্ত নতুন কোনো আবেদন গ্রহণ করা হবে না। অবশ্য ওই সিদ্ধান্তের আড়াই মাসের মধ্যে আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা বাড়িয়ে পাবলিক ইস্যু রুলস ২০১৫-এর সংশোধন আনে বিএসইসি। এরপর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও নতুন কোনও আইপিও আর অনুমোদন দেয়নি খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। ফলে ২০২০ সালের প্রথম পাঁচ মাসও আইপিও শূন্য থাকে।

তবে মে মাসের শেষদিকে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেয়ার পর আবার আইপিও মার্কেট সরগরম হয়ে ওঠে। তার নেতৃত্বাধীন কমিশন একের পর এক প্রতিষ্ঠানের আইপিও দিতে থাকে। ফলে মাত্র সাত মাসেই রেকর্ড পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পেয়ে যান উদ্যোক্তারা।

তথ্য পর্যালোনায় দেখা যায়, ২০২০ সালে স্থির মূল্য (ফিক্সড প্রাইস) পদ্ধতিতে ৫টি এবং বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৩টি কোম্পানি আইপিও’র মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করেছে। সম্মেলিতভাবে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্তোলন করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭০৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রিমিয়াম বাবদ তিনটি কোম্পানি নিয়েছে এক হাজার ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

এর আগে ২০১৯ সালে স্থির মূল্য (ফিক্সড প্রাইস) পদ্ধতিতে ৫টি এবং বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৩টি কোম্পানি অর্থাৎ ৮টি প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে আইপিও’র মাধ্যমে ৫৫২ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। তার আগে ২০১৮ সালে ১৪টি প্রতিষ্ঠান ৬০১ কোটি ৭৫ লাখ, ২০১৭ সালে ৮টি প্রতিষ্ঠান ২৪৯ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০১৬ সালে ১১টি প্রতিষ্ঠান ৮৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা উত্তোলন করে।

এ হিসাবে ২০২০ সালে আইপিও’র মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ উত্তোলন হলেও আইপিওতে আসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়েনি। স্বল্প সংখ্যক প্রতিষ্ঠান আসার পরও আইপিওতে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন এবং রবি আজিয়াটা লিমিটেড। এই দুই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বড় ভূমিকা রেখেছে মীর আখতার হোসেন।

এর মধ্যে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন আইপিও’র মাধ্যমে সংগ্রহ করেছে ৮৮৬ কোটি ৪৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রিমিয়াম হিসেবেই নিয়েছে ৮৪৬ কোটি ১৬ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। আর স্থির মূল্যে বা ১০ টাকা করে শেয়ার বিক্রি করা রবি উত্তোলন করেছে ৫২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।

অবকাঠামো খাতের প্রতিষ্ঠান মীর আখার আইপিওতে শেয়ার ছেড়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে থেকে নিয়েছে ১১২ কোটি ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রিমিয়াম রয়েছে ৯১ কোটি ৩৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। প্রিমিয়াম নিয়ে আসা আর এক কোম্পানি ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ আইপিও’র মাধ্যমে সংগ্রহ করেছে ৯৯ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রিমিয়াম আছে ৯৭ কোটি ৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

বছরটিতে আইপিও’র মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স ২৬ কোটি ৭ লাখ ৯০ হাজার, অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন ১৫ কোটি, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং ৩০ কোটি এবং ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স ১৬ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে।