দুনিয়ার মোহ-মায়া

মিরর ডেস্ক : মানুষের জন্ম যেমন জীবনের অংশ, মৃত্যুও তেমন জীবনের বাইরের কিছু নয়। তাইতো জীবন চলার বাঁকে সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ মানুষ, মৃত্যুর পথে এগিয়ে যায় ও যাচ্ছে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি দুর্বল অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন; তারপর দুর্বলতার পর শক্তি দেন, আবার শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধ্যক্য… (সুরা : রুম, আয়াত : ৫৪)

দুনিয়া একটা মায়া আর মৃত্যু অমোঘ সত্য। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের গ্রাস করবেই, যদিও হও সুরক্ষিত দুর্গে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭৮)

মায়ার এ জগতে সবাই মুসাফির—

‘মিছে মায়ার সংসার কেউ কারো নয়

পথিকে পথিক যেমন পথে পরিচয়…

টাকা-কড়ি ধন-জন সঙ্গে নাহি যাবে

একাকী এসেছ তুমি একাই চলে যেতে হবে।’

(মৈমনসিংহ গীতিকা : ‘দস্যু কেনারামে’র পালা)

এ জন্যই মহান আল্লাহ বলেন, ‘দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহংকার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হলো বৃষ্টির মতো, যার উৎপন্ন ফসল কৃষককে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়…।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২০)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘দুনিয়ার জীবন নিষ্ফল ও অনর্থক খেলাধুলা…।’ ইমাম কাতাদা (রহ.) বলেন, ‘দুনিয়া হলো শুধু খাওয়া ও পান করার নাম, এ ছাড়া আর কিছুই নয়।’

বাস্তবতায় সবুজ-শ্যামল ফসলের মাঠ যেমন শুকিয়ে যায়, তেমনই জীবন-যৌবনের উত্তাল ঢেউ একসময় জরা-বার্ধক্যের মোহনায় মৃত্যুর প্রহর গুনে থমকে দাঁড়ায়। মহান আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ‘…নিশ্চয়ই আখিরাতের নিবাসই হলো প্রকৃত জীবন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৪)

প্রিয়নবী (সা.) ছিলেন নির্মোহ, তাঁর ছিল অনাড়ম্বর জীবন। ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, একদা আমরা রাসুল (সা.)-কে খেজুরপাতার বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখি। আমি তাঁর দেহ মোবারকে বিছানার দাগ দেখে কেঁদে ফেললাম, বললাম, দুজাহানের বাদশাহ হয়ে আপনি খেজুরপাতার বিছানায় শুয়ে আছেন। তখন রাসুল (সা.) বলেন… ‘আমাদের জন্য আখিরাত হওয়াতে তুমি কি সন্তুষ্ট নও।’ (বুখারি)

বর্তমানে পরকালবিমুখতায় সবাই আক্রান্ত। এ প্রসঙ্গে মুতাররফ (রহ.) বলেন, ‘দুনিয়ার প্রতি সবচেয়ে নিকৃষ্ট চাহিদা হলো, আখিরাতের নাম বিক্রি করে দুনিয়া অর্জন করা।’ (বায়হাকি)

ক্ষেত্রভেদে বয়সের কারণেও মানুষের দুনিয়াবি লালসা বেড়ে যায়। প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘বৃদ্ধের অন্তর দুই জিনিসের অন্ধমোহে যুবাতুল্য: দুনিয়ার মোহ ও সম্পদের মোহ।’ (মুসলিম)

অন্য বর্ণনায় আছে, ‘আদমসন্তান বুড়ো হয়, অথচ তার দুটি জিনিস জোয়ান হতে থাকে : ধন-সম্পদের লোভ ও দুনিয়ার লোভ।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪২১)

এ জন্যই মিথ্যা মোহের দুনিয়াদারির বিরুদ্ধে প্রিয়নবী (সা.)-এর উচ্চারণ—‘অর্থের গোলাম ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক সম্পদের গোলাম, ধ্বংস হোক পোশাকের গোলাম…।’ (বুখারি)

বস্তুত ক্ষণস্থায়ী জীবনের সব কিছু ইসলাম ইবাদত ও পরকালমুখী চেতনায় ব্যাখ্যা করে। কিন্তু সমস্যা হয়, যখন জাগতিকতা বা অর্থের মোহ ‘মন-মগজে’ ঢুকে যায়। এ যেন পানি ও নৌকার তুলনা—

‘আবদার কিশিত হালাকে কিশিত আসৎ

আব আনদার জেরে কিশিত পাশিত আসৎ’

অর্থাৎ—‘নৌকার ভেতর ঢুকলেই পানি নৌকার বিনাশ হয়/ জানি নৌকার গতি বাড়ে যদি নৌকার নিচে পানি রয়।’

[আল্লামা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.)]

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ

কাপাসিয়া, গাজীপুর