জ্ঞানের সূচক, বিকৃত পতাকা এবং মাটির ময়নার সেই আনু

আমীন আল রশীদ :

গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স বা বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকের তলানিতে বাংলাদেশ—যখন এই সংবাদ গণমাধ্যমের শিরোনাম হলো, তার দিন কয়েক বাদেই দুটি ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। এক. রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে বিকৃত জাতীয় পতাকা এবং দুই. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের ব্যানারে শহীদ মিনারের ছবি। যে দেশে স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম ভয়াবহ কাণ্ড ঘটে—সেই দেশে জ্ঞানের সূচক কোথায়, তা বুঝতে কোনও গবেষণার প্রয়োজন হয় না।
আসলে আমাদের দেশের অনেক কিছু বোঝার জন্যই গবেষণা লাগে না। সাদা চোখেই দেখা যায়। কাজটি আরও সহজ করে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। বিশেষ করে ফেসবুক। ফেসবুকের দুনিয়ায় সবই উন্মুক্ত। কে কী ভাবছেন, কোন বিষয় নিয়ে কে কী প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন এবং কে কার পার্পাস সার্ভ করছেন—এসব আর গোপন বিষয় নয়।

ফেসবুক এমন একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে যে, একসময় অন্যের যেসব তথ্য মানুষ সহজে জানতে পারতো না, এখন সেসব তথ্য না চাইতেই পাওয়া যাচ্ছে। মানুষের অতি ব্যক্তিগত বিষয়াদিও এখন ফেসবুকের কনটেন্ট এবং এসব কনটেন্ট প্রোভাইড করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই। ফলে আমরা কী ধরনের জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠন করতে পেরেছি—সেটির একটি বড় আয়না এই ফেসবুক। বিশেষ করে সমসাময়িক যেকোনও বিষয়ে মানুষের স্ট্যাটাস এবং তার নিচে কমেন্ট পড়লেই একটা সাধারণ ধারণা পাওয়া যায় যে, আমাদের সমাজে মানুষের শিক্ষা-রুচি-ভদ্রতা ও সহনশীলতার গড় মান কেমন।

জ্ঞাননির্ভর সমাজ থেকে বহু দূর সরে গিয়ে আমরা যে ক্রমশ একটি তেলনির্ভর ধান্দাবাজির সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার দিকে ধেই ধেই করে এগিয়ে যাচ্ছি—তা বুঝতে কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থার গ্লোবাল ইনডেক্সের দিকে না তাকালেও চলে। আমরা আমাদের নিজেদের শরীরের দিকে তাকালেই পরিষ্কার দেখতে পাই—পরনে কাপড় আছে কী নেই।

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্স বা সুখের সূচক, দুর্নীতির ধারণা সূচক, গণতন্ত্রের সূচক, মানবাধিকারের সূচক বা আইনের শাসনের সূচকের সঙ্গে আমরা পরিচিত থাকলেও জ্ঞান সূচক নিয়ে আমাদের দেশে খুব একটা আলোচনা আগে ছিল না।

এবার গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স বলছে, ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম এবং তালিকায় স্থান পাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের মধ্যে সবার শেষে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ বৈশ্বিক জ্ঞানসূচক প্রকাশ করে। টানা চতুর্থবারের মতো এই তালিকায় শীর্ষে ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ড।

সূচকটি তৈরিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শিক্ষার অবস্থা, প্রযুক্তি, উন্নয়ন, উদ্ভাবনসহ সাতটি বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ২০১২ সালের তুলনায় বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৯ পয়েন্ট উন্নতি করলেও সামগ্রিক পারফরম্যান্স খারাপ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একটা বিপ্লব ঘটে গেলেও; মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে গেলেও সেই সুবিধা তারা কী কাজে লাগাচ্ছে; ইন্টারনেটের কল্যাণে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল মানুষের সম্মিলন ঘটলেও সেখানে মানুষেরা আসলে কী করে—তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, জ্ঞান ও যুক্তির বিপরীতে  সোশ্যাল মিডিয়া এখন ব্যবহৃত হচ্ছে গুজব, অপপ্রচার, বিষোদ্গার, অসহিষ্ণুতা, ভিন্নমতের লোকদের নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীবদ্ধ করা এবং নিজেদের গোষ্ঠীগত স্বার্থে কোনও একটি কাজ বা কোনও একজন ব্যক্তিকে সম্মিলিতভাবে প্রশংসিত করে তাকে মহৎ করার কাজে।

সুতরাং যে সমাজে নিজের মতের বা ভাবনার বাইরে কেউ কথা বললেই তাকে শত্রুপক্ষে ঠেলে দেওয়া হয়, সেই সমাজে জ্ঞান ও যুক্তির গুরুত্ব থাকে না। অথবা জ্ঞান ও যুক্তি সেখানে শক্তিশালী হতে পারেনি বলেই ‘ইফ ইউ আর নট উইথ মি, ইউ আর মাই এনিমি’ থিওরি শক্তিশালী হয়েছে।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে প্রায় পঞ্চাশ বছর অর্থাৎ সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের অপেক্ষায় যখন পুরো দেশ—তখন দেশের শিক্ষা-দিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতি এবং মানুষের রুচিবোধ এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয় চেতনার দিকে নজর দিলে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার উপায় নেই।

এই পঞ্চাশ বছরে রাজধানী এবং বড় বড় শহরগুলো তো বটেই, দেশের আনাচে-কানাচে বিশ্ববিদ্যালয় এবং অভিজাত সব স্কুল-কলেজ গড়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কী শেখানো হয়? কী পড়ানো হয়? কারা পড়ান? যারা পড়াতে আসেন, তারা কতজন এই কাজের জন্য যোগ্য? প্রশ্নগুলো খুবই বিব্রতকর এবং লজ্জার বিষয় হলো, এসব প্রশ্নের কোনও সদুত্তর পাওয়া যায় না।

বাংলা একাডেমির মতো অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা জাতির মেধা ও মনন গঠনে ভূমিকা রাখে। এসব প্রতিষ্ঠান বছরে কিছু রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান করার বাইরে পুরো জাতির মেধা ও মনন গঠনে কী ভূমিকা রেখেছে বা রাখতে পারছে, তাও প্রশ্নাতীত নয়। নয় বলেই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে খোদ শিক্ষকদের একটি অংশ বিকৃত জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন এবং সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্নাতীত নয় বলেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রাচীন ও বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের ব্যানারে শহীদ মিনারের ছবি দেখতে হয়। এটি তো শুধু ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক বা কর্মচারীর লজ্জা নয়; এটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের লজ্জা। পুরো জাতির লজ্জা।

বিজয় দিবসের ব্যানারে কী ছবি থাকতে হবে; জাতীয় পতাকায় লাল ও সবুজ রঙের ব্যবহার কেমন হতে হবে—এসব তো তৃতীয় শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীরও মুখস্থ থাকার কথা। খোদ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম নৈরাজ্য কী করে সম্ভব? কারা শিক্ষক হচ্ছেন, কী যোগ্যতায়? কারা ভিসি হচ্ছেন, কোন যোগ্যতায়?

গত বছরের সেপ্টেম্বরে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী? তখন এ নিয়ে বেশ তোলপাড় শুরু হয়েছিল। আসলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কতটি বিশ্ববিদ্যালয়, আর কতটি কলেজের উন্নত সংস্করণ—সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যদি দর্শনগত পার্থক্য নাই থাকে, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও প্রয়োজনীয়তা থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ যেখানে গবেষণা, সেখানে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কতটি এই কাজে কত সময় ও কত টাকা খরচ করে; যারা গবেষণা করেন তাদের কতজন আসলেই কাজটি ঠিকমতো করেন এবং কতজন অন্যের লেখা চুরি করে ডক্টর হন—সেই প্রশ্নও জনমনে রয়েছে।

২.

একজন চলচ্চিত্র অভিনেতার চায়ের দোকানী হওয়ার গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করি। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের আলোচিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত সিনেমা ‘মাটির ময়না’য় আনু চরিত্রে অভিনয় করা সেই শিশুটি এখন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে চা পান বিক্রি করেন। অথচ নুরুল ইসলাম নামে এই শিশুটি তখন শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই গৌরব আজ তাকে শুধুই যন্ত্রণা দেয়। প্রায় ১৮ বছর আগলে রাখা সিনেমার পোস্টারটিও ফেলে দিয়েছেন। পুরস্কারের স্মারকটিও নিজের কাছে রাখেননি।

গণমাধ্যকে নুরুল ইসলাম বা আনু জানান, মিডিয়ায় থাকার অনেক চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গরিব বলে কেউ কাজ দেয়নি। দিলেও বেতন অনেক কম। কিন্তু পরিবারের বড় ছেলের দায়িত্ব অনেক। তিনি জানান, পরিচালক তারেক মাসুদের এক আত্মীয়র বাসায় কাজ করতেন। পাশাপাশি পড়তেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের একটি স্কুলে, যেখান থেকে তাকে সিনেমার জন্য তুলে এনেছিলেন তারেক মাসুদ। তারপর বছরখানেকের জন্য যুক্ত হয়েছিলেন ‘মাটির ময়না’ ছবির সঙ্গে। কিন্তু এরপরে আর অভিনয়টা হয়ে ওঠেনি। বাসার কাজ করতে গিয়ে পড়াশোনাও আর হয়নি। অনেকেই কথা দিয়েছিলেন, কিন্তু কাজ দেননি।

বাস্তবতা হলো, যে দেশে হিরো আলমদের মতো লোকেরা তারকা এবং নেতিবাচক প্রচারের মধ্য দিয়েই দেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পাচ্ছে, সে দেশে মাটির ময়নার মতো একটি জ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্রে অভিনয় করা শিশু আনু যে বড় হয়ে চা পানের দোকানদার হবে—সেটিই বোধ হয় আমাদের নিয়তি অথবা প্রাপ্য।

স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে এসে জাতির জনকের ভাস্কর্য ইস্যুতে বিতর্ক এবং বিতর্ক উত্থাপনকারী মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের তথাকথিত কৌশলী নীতি ও আলোচনাও দেশবাসীকে দেখতে হয়। অথচ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় মাসের পর মাস জেলে থাকতে হয় সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্টদের। কারণ তারা হেফাজতে ইসলামের মতো সংগঠিত শক্তি নয়। সুতরাং, যে সমাজ জ্ঞান ও যুক্তির চেয়ে ধর্ম এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীকে বেশি ভয় পায় এবং রাজনৈতিক দলগুলো সেই ভয়জনিত তোয়াজকে ভোটের রাজনীতির বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে—সেই দেশে জ্ঞান সূচকের তলানিতে থাকলে তা নিয়ে খুব বেশি আফসোস করার কিছু নেই।

লেখক: সাংবাদিক

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।