উন্নয়নশীল দেশের পথে

জাতিসংঘ বিশ্বের দেশগুলোকে মোটা দাগে তিনটি ভাগে ভাগ করে থাকে। এগুলো হচ্ছে- উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত বা এলডিসি। প্রধানত মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা-এই তিন সূচক দিয়ে কোন দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কিনা, সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করে থাকে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে সময় লাগে ছয় বছর। এক্ষেত্রে অবশ্য বিশ্বব্যাংকের সূচক নির্ধারণে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। সিডিপির আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা আগামী বছরের ২২-২৬ ফেব্রুয়ারি। সেই বৈঠকে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চূড়ান্ত মনোনয়নের প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে। চূড়ান্ত মনোনয়ন পেতে তিন বছর পর্যবেক্ষণের পর ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশকে দেয়া হবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা। বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতিও নিয়েছে জোরেশোরে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্বে ৪৭টি দেশ এলডিসির তালিকাভুক্ত। করোনাকালীন মহামারীতে উন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি এলডিসিভুক্ত দেশও স্বভাবতই নিজেদের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিয়ে হিমশিম খেয়েছে। যার রেশ শেষ হয়নি এখনও। এমন এক প্রেক্ষাপটে এলডিসিভুক্ত দেশ চাদ একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব রেখেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে (ডব্লিউটিও)। এতে বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ পরবর্তী ১২ বছর যেন একই রকম বাণিজ্য সুবিধা পেতে পারে সংশ্লিষ্ট দেশ। তা বিবেচনার জন্য এই প্রস্তাব নিয়ে বুধবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুরু হচ্ছে ডব্লিউটিওর সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। এতে উপস্থিত থাকবেন সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ অন্তত ছয় বছরের জন্য এই সুবিধা পেতে আগ্রহী। এর আওতায় রয়েছে বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা। ওষুধ শিল্প খাতে রেয়াতি সুবিধা। সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি। তথ্য-প্রযুক্তি সহায়তাসহ অন্যান্য সুবিধা। তাদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই সুবিধা পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। আগামী বছর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার সুপারিশ করতে পাঁচটি দেশকে তালিকায় রেখেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও আছে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাসে মন্তব্য করা হয়েছিল, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে করোনার ধাক্কায়। অবশ্য বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাসকে বাস্তবতাবর্জিত এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সঙ্গে অসামঞ্জ্যপূর্ণ নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এক্ষেত্রে এডিবির প্রাক্কলন ৬.৮ শতাংশ হলেও বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৮.২ শতাংশ। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালে বিশ্বের ২২টি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হবে, তার মধ্যে শীর্ষ তিনটি দেশের একটি হবে বাংলাদেশ। অন্য দুটি দেশ গায়ানা ও দক্ষিণ সুদান।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ। করোনাজনিত ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গড় জাতীয় প্রবৃদ্ধির ধারা ঠিক রেখে এবার প্রণয়ন করা হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট। এটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা অমূলক হতে পারে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। দেশে প্রবাসী আয় তথা রেমিটেন্স ও রিজার্ভের ক্ষেত্রে তীব্র আশার সঞ্চার হয়েছে। রিজার্ভ অতিক্রম করেছে ৪২ বিলিয়ন ডলার। তৈরি পোশাকের ৮০ শতাংশ ক্রয়াদেশ ফিরেছে। নতুন কার্যাদেশও আসছে। বোরো-আমনের বাম্পার ফলন হওয়ায় খাদ্যের মজুদও সন্তোষজনক। সরকার পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র, পায়রা বন্দর ও বিদ্যুত কেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেলসহ মেগা প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগও আসছে। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া মোটেও অসম্ভব হবে না।