নদী-বন-ব্যাংক-জমি ‘খেকোগণ’

ডা. জাহেদ উর রহমান :

‘ফারমার্স ব্যাংকে শুরু থেকেই ডাকাতি হয়েছে। এটা কোনও ব্যাংক ছিল না’—না, কথাটি কোনও সরকার সমালোচকের না, এটি বলেছিলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এই উক্তিটা কেন এই কলাম প্রসঙ্গে মনে পড়লো, সেটি বিশ্লেষণে আমরা ফিরে আসবো আবার। তবে তার আগে আমরা জেনে নেবো সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা।
ঢাকা-১৪ (মিরপুর) আসনের সংসদ আসলামুল হকের নদী ও জলাশয় দখলের পরিমাণ ৫৪ একর। আর এই হিসাব হাইকোর্টেও দাখিল করা হয়েছে। এরমধ্যে সরাসরি বুড়িগঙ্গা এবং তুরাগ নদে ১৩ একর, নদী বন্দরের (ল্যান্ডিং স্টেশন) সীমার জমি আট একর এবং বাকি জমি ড্যাপের আওতাভুক্ত ফ্লাড ফ্লো জোন। নদী দখল করে সেখানে তিনি ‘আরিশা প্রাইভেট ইকোনমিক জোন’ এবং ‘ মায়িশা গ্রুপের’ পাওয়ার প্ল‌্যান্ট গড়ে তুলেছেন।
এখানে জনাব হকের অবৈধ দখল নিয়ে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে সেগুলো সরকারদলীয় একজন এমপির বিরুদ্ধে তার প্রতিপক্ষের কারও না। এই রিপোর্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’-এর। জনাব আসলামুল হকের দখল নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করে কমিশন। চুলচেরা বিশ্লেষণের পর সেই কমিশনই এই রিপোর্ট দেয়।

এই বছরের শুরুতে তার দখলে থাকা এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে তিনি সরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে ভীষণভাবে বাধা দিয়ে উচ্ছেদ বন্ধ করেন। এরপর তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেন। সেই রিট খারিজ হয়েছে ১০ ডিসেম্বের। উচ্চ আদালতের মতেই এখন এই স্থাপনা উচ্ছেদ করা যাবে, অর্থাৎ জনাব আসলামুলের দখলে থাকা এসব জমি আসলেই নদী এবং জলাশয়।

জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে নদী ও জলাশয় দখলদার ৫৭ হাজার ৩৯০ জন। আর এরমধ্যে ঢাকায় আট হাজার ৮৯০ জন। সারাদেশে এ পর্যন্ত ১৮ হাজার ৫৭৯ জনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ঢাকায় উচ্ছেদ করা হয়েছে এ পর্যন্ত সাত হাজার ৭৭ জনকে। তবে ঠিক কী পরিমাণ নদী ও জলাশয় দখল হয়েছে, তার সঠিক হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি নদীরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘এর পরিমাণ কয়েক হাজার একর হবে।’
মজার ব্যাপার হলো, এই দখলদারদের মধ্যে আছেন সংসদ সদস্য হাজী সেলিমও। নদী দখল করে তৈরি করা একটি কোল্ডস্টোরেজ, একটি গুদাম ও একটি ফিলিং স্টেশন আছে তার।

কিছুদিন আগে তার পুত্র রাস্তায় এক ‘ঝামেলায়’ জড়ানোর পর আমরা জানতে পারি তার দখলের লম্বা ফিরিস্তি। তিনি দখল করেছেন ঐতিহাসিক জাহাজ বাড়ি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, পুরনো ঢাকার মৌলভীবাজারে অগ্রণী ব্যাংকের জমি, ঢাকা সরকারি বধির হাইস্কুলের এক একর জমি। চকবাজার এলাকার নলগোলা সর্দার হার্ডওয়্যার মার্কেট, বশির মার্কেট, ফ্রেন্ডশিপ মার্কেট, মনসুর খান প্লাজা ও হারিকেন মার্কেটও দখল করে নিয়েছেন হাজী সেলিম। পুরান ঢাকার জামিল স্টোরের ৫ কাঠা জমি, মদিনা আশিক টাওয়ার ও জাপান ইলেকট্রনিকসের জায়গা দখল করেছেন হাজী সেলিম। চকবাজারের ছোটকাটারায় হাজী সেলিমের চাঁন সরদার কোল্ডস্টোরেজ স্থাপিত হয়েছে কয়েকজন মানুষের জমি দখল করে। এমনকি গ্রিন রোডে অবস্থিত মদিনা গ্ৰুপের করপোরেট অফিস তৈরি হয়েছে সরকারি জমি দখল করে।

দবিরুল ইসলাম ক্ষমতাসীন দলের আরেকজন সাংসদ। তাকে অবশ্য ‘মহা-সাংসদ’ বলাটাই সম্ভবত শ্রেয়, কারণ এবার তিনি ঠাকুরগাঁও-২ আসনে প্রতিনিধিত্ব করে জাতীয় সংসদে এসেছেন সপ্তমবারের মতো। এই ‘আইনপ্রণেতা’ সম্প্রতি পত্রিকার খবর হয়েছেন।

দেশের বনভূমি অবৈধভাবে দখলে রাখা শীর্ষ ১০ জনের তালিকা তৈরি করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। বনের ভূমি দখলকারীদের টপ টেনের মধ্যে জনাব দবিরুলের নাম রয়েছে দুই নম্বরে।

দবিরুল ইসলামের দখলে রয়েছে ৭২ দশমিক ৫৫ একর বনভূমি। এই জমিতে চা বাগান ও চাষাবাদ করা হচ্ছে। ঘরবাড়িও তৈরি করা হয়েছে। দক্ষিণপাড়িয়া মৌজার অর্ধশতাধিক দাগ উল্লেখ করে মন্ত্রণালয় তাদের প্রতিবেদনে বলছে, এই জমির মাঠ পর্চা বন বিভাগের নামে। অনেক আগ থেকেই তিনি এই জমি দখল করে রেখেছেন। তাকে উচ্ছেদ করার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে বন বিভাগ থেকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য দখলদারদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা হলেও দবিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বন বিভাগ কোনও মামলা করেছে বলে তথ্য পাওয়া যায়নি।

বন বিভাগ থেকে সারাদেশে বেদখল হওয়া মোট জমির মূল্যমানও নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বেদখল হওয়া ৭৯ হাজার ৯৪ দশমিক ১৯ একর জমির দাম ১০ হাজার ১৯৭ কোটি ১৭ লাখ ৩২ হাজার ৪৯০ টাকা।

এবার ফিরে আসা যাক ফারমার্স ব্যাংকের কথায়। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের উদ্যোক্তা এবং মালিকদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি ছিলেন জনাব মহীউদ্দীন খান আলমগীর। খুব অল্পসময়ের মধ্যেই ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যায় এবং সরকারের সাহায্যে পরবর্তীতে সেটি একটা ভিন্ন নামে (পদ্মা ব্যাংক) নতুন করে তার কর্মকাণ্ড শুরু করে।

২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একের পর এক অনিয়মের খবর পত্রিকায় এসেছে। মাত্র তিন বছরের মাথায় এসেই এর অবস্থা এতটা খারাপ হয় যে এতে পর্যবেক্ষক বসাতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ কেলেঙ্কারির দায়ে ২০১৭ সালে সরে যেতে হয় এর প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান জনাব মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে ব্যাংকটিকে বাঁচাতে সরকার হস্তক্ষেপ করে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এতে মূলধন জোগান দেয়।

জমি, বন, নদী, কিংবা ব্যাংক  কোনোটাই ‘খেয়ে’ ফেলা যায় না রাতারাতি; প্রয়োজন হয় মাসের পর মাস বছরের পর বছর। ফারমার্স ব্যাংকের ঘটনা এটা আমাদেরকে খুব খোলাখুলিভাবে দেখিয়ে দেয় এমনকি এসব ঘটনা সবার চোখের সামনে ঘটলেও, এমনকি শীর্ষস্থানীয় মিডিয়ায় এলেও রাষ্ট্র সেখানে থাকে নিশ্চুপ।

জমি বন নদী কিংবা ব্যাংক ‘খাদকে’র তালিকা মোটামুটি দীর্ঘ। খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে এসব খেয়ে ফেলার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার যোগসূত্র আছে। তবে এই কলামে যাদের কথা বলা হলো, তারা সবাই সংসদ সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন-মূল্যায়নকারী তো বটেই, তারা এই দেশের ‘আইনপ্রণেতা’। এমন আরও অনেক ‘আইনপ্রণেতা’ আছেন, যাদেরকে অনেক বড় বড় বেআইনি কাজে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে দেখি আমরা। শুধু বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সময় বলেই না, অতীতের সব ক্ষমতাসীন সব দলের সময়ই এই প্রবণতা কম-বেশি ছিল।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলছে—‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’। তাই বলা যায়, কোনও অপরাধে যখন কোনও সাংসদ অভিযুক্ত হন, তখন তার অপরাধ আইনের চোখে একজন সাধারণ নাগরিকের সমান। কিন্তু নৈতিকতার চোখে?

কিছু মানুষ শপথ নিয়েছিলেন, সংবিধান সমুন্নত রাখার, কিছু মানুষের হাতে রাষ্ট্র কিছু ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল ‘আমানত’ হিসেবে। কথা ছিল সেটা অপব্যবহার করবেন না তারা, কিন্তু অনেকেই হরদম করেন সেটা। এই দেশের বেশিরভাগ মানুষ ক্ষমতায় বা ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে চায় সেটা অপব্যবহারের মাধ্যমে নানা অবৈধ পথে সম্পদ তৈরি করার জন্য। এটা তাদের কাছে রাখা আমানতের ভয়ংকর খেয়ানত। তাই ‘আইনপ্রণেতা’দের কৃত অপরাধ একজন ‘সাধারণ’ নাগরিকের দ্বারা সংঘটিত একই অপরাধের চাইতে অন্তত নৈতিকভাবে অনেক বেশি ভয়ংকর।

এটুকু পড়ে কি কেউ হাসলেন? সংবিধান, আইন সবকিছু মোটাদাগে ব্যর্থ হওয়া বর্তমান বাংলাদেশে নৈতিকতার কথা বলা আসলেই হাস্যকর—এটা মানি।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট।

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।