বিএনপির শোকজ বিতর্ক এবং মান্নার বিপ্লব বিলাস

প্রভাষ আমিন :

বিএনপির দুই ভাইস চেয়ারম্যানকে দেওয়া দলের কারণ দর্শানো নোটিশ নিয়ে শুধু বিএনপিতেই নয়, তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলেই। যতটা না তোলপাড়, তারচেয়ে বেশি বিস্ময়। কারণ বিএনপির দুই ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হফিজ উদ্দিন আহম্মদ এবং শওকত মাহমুদকে সরকারবিরোধী মিছিল করার অপরাধে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। শুনতেই কেমন খটকা লাগছে। বিএনপি ১৪ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে। সরকারি দলের দমন-পীড়নে, মামলা-হামলা, গুম-খুনে কোণঠাসা দলটি। বিএনপি নেতারা অনানুষ্ঠানিকভাবে হতাশা প্রকাশ করলেও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছি, দল গোছাচ্ছি’। কিন্তু গোছাতে গোছাতে যে দল বিলীন হয়ে যাচ্ছে, সে খবর কি আছে বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের?

ক্যান্টনমেন্টে জন্ম হলেও জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করে দলটি তাদের গা থেকে সামরিক গন্ধ অনেকটাই দূর করে গণতান্ত্রিক দলে পরিণত হয়। এরশাদ পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অনেককে অবাক করে দিয়ে জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসে দলটি। এরপর আরো দুবার ক্ষমতায় আসে বিএনপি। তবে ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সালের ক্ষমতার মেয়াদে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা, ক্ষমতায় ফিরতে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোসহ নানা অপকর্ম করে নিজেরাই নিজেদের কবর খোঁড়ে বিএনপি।

তাই ক্ষমতা থেকে ছিটকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি থেকেও প্রায় ছিটকে গেছে বিএনপি। আগেই বলেছি সরকারের দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা, গুম-খুন তো আছেই, আজকের এই পরিণতির জন্য বিএনপির ব্যর্থতাও কম নয়। নিজেদের খোঁড়া কবরে পড়েছে নিজেরাই। প্রথম কথা হলো, বিএনপির রাজনীতিতে কোনও ধারাবাহিকতা নেই।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন দলটি আজ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় বারবার হোঁচট খায়। আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে, সংসদে যাওয়া না যাওয়ার ব্যাপারে, সরকারবিরোধী আন্দোলনের ব্যাপারে একটা স্থির সিদ্ধান্ত থাকা দরকার। বিএনপি ২০১৪ সালের আগে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।

কিন্তু ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তখন তাদের যুক্তি ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা কোনও নির্বাচনে অংশ নেবে না। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনেই তারা অংশ নিলো। এবার যুক্তি, সরকার যে নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে, এটা প্রমাণ করার জন্যই তারা নির্বাচনে যাচ্ছে। আর বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতেই তারা নির্বাচনে যাচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনে মাত্র ৬ আসন পাওয়ার পর আবার তারা বিপ্লবী। আগের রাতের ভোটে নির্বাচিত সংসদ ও সরকারকে বৈধতা দিতে তারা কিছুতেই সংসদে যাবে না। কিন্তু সংসদে যোগ দেওয়ার নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে হুট করে লন্ডনের নির্দেশে বিএনপির এমপিরা সংসদে যোগ দিলেন। এবার যুক্তি হলো, সংসদের ভেতরে-বাইরে আন্দোলন করতে হবে। সরকারকে এক ইঞ্চি জায়গাও বিনা চ্যালেঞ্জে ছাড় দেওয়া যাবে না। সরকারও অবশ্য এই কৌশলেই আছে, বিএনপিকে এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়া দেওয়া হবে না। এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা দোদুল্যমানতায় ফেলে দলটির সাধারণ নেতাকর্মীদের। আগের রাতে যিনি নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দেন, পরদিন তাকে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি জোগাড় করতে হয়। যারা সংসদে যোগ দেবে, আগের রাতে তারা জাতীয় বেঈমান, সকালে তারা দলের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সংসদে যোগ দেওয়াটা যদি দলের কৌশলী সিদ্ধান্তই হয়, তবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল কেন গেলেন না? এই আছি, এই নাই- সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা কে দেবে? আসলে ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো কেউ নেই, কারণ কোনও ব্যাখ্যাই নেই। আমার ধারণা ছিল, আর কিছু না হোক, খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিলে মরণ কামড় দেবে বিএনপি। কিন্তু খালেদা জিয়া দুই বছর কারাগারে থেকে সরকারের আনুকূল্যে মুক্তি পেয়ে বাসায় ফিরেছেন। এই সময়ে বিএনপির কোনও হেলদোল ছিল না। চেয়ারপারসন কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে ফেরারি–এরপরও যদি বিএনপি ভয়ে গর্তে লুকিয়ে থাকে; তাহলে এই দলটির থাকা না থাকায় কার কী যায় আসে। বিএনপি তো আর সিপিবি বা জামায়াতের মতো আদর্শিক দল নয়, যে তারা আদর্শ আঁকড়ে ধরে রাজনীতি করে যাবে। বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী দল।

ক্ষমতা ছাড়া ১৪ বছর যে বিএনপি টিকে আছে, এটাই কিন্তু বিস্ময়। টিকে থাকলেও নানান সময় নানান ষড়যন্ত্রের কথা শোনা গেছে। দলের সিনিয়র নেতারা প্রায়ই দলের নানান সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমনকি লন্ডন থেকে ইশারায় দল চালানো নিয়েও ক্ষুব্ধ অনেকে। কেউ কেউ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। কিন্তু ১৪ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা কোনও দলের নেতাদের সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়ার অপরাধে কারণ দর্শাতে বলা রাজনীতির অষ্টম আশ্চর্য। মনে হচ্ছে, সরকার কর্তৃক আদিষ্ট হয়েই রুহুল কবির রিজভী আহমেদে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। বাংলাদেশে এখন অধিকাংশই আওয়ামী লীগের দালাল। এই দালালের তালিকায় নতুন নাম বিএনপি এবং রিজভী। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে পেশাজীবী পরিষদের আলোচনা ছিল। আলোচনা শেষে তারা পল্টন মোড়ে গিয়ে বসে পড়ে এবং সরকার পতনের স্লোগান দেয়। একই সময়ে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব নুর হোসেন কাসেমীর জানাজা ছিল। তাই পল্টনের সেই অবস্থানে কিছু বাড়তি লোকও যোগ দেয়। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশের ধাওয়ায় তাদের বিপ্লব থেমে যায়। তবে একটি গণতান্ত্রিক দাবিদার একটি দেশে রাজপথে নেমে সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়া, সরকার পতনের ডাক দেওয়ার অধিকার সবার আছে। যতক্ষণ তারা আইন হাতে তুলে না নিচ্ছে, গাড়ি ভাঙচুর না করছে; কোনও অসুবিধা নেই। ১৪ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দল তো শয়নে-স্বপনে সরকার পতনের স্লোগান দেওয়ার কথা। রাজপথে সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়াটা অপরাধ হলে তো বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে শোকজ করতে হবে। রিজভী আহমেদও তো দেখি মাঝে মাঝে ভোরবেলা ৮/১০ জন নিয়ে সরকারবিরোধী ঝটিকা মিছিল করেন। পুলিশের ঘুম ভাঙার আগেই তারা আবার খোয়াড়ে ঢুকে যান। তাহলে রিজভী আহমেদকে শোকজ করবে কে? আর বিএনপির নেতাকর্মীদের তো সুযোগ পেলেই মাঠে নেমে সরকারের বিরোধিতা করার কথা। এখানে অপরাধ কোথায়? সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়ার অপরাধে দলের দুই সিনিয়র নেতাকে শোকজ দলের মাঠপর্যায়ে ভুল বার্তা দেবে। এখন থেকে মাঠের নেতাকর্মীরা বুঝবেন, আর যাই করো, সরকারের বিরোধিতা করা যাবে না। শোনা যাচ্ছে, মূলত খালেদা-তারেককে মাইনাস ষড়যন্ত্রের অভিযোগেই তাদের শোকজ করা হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে সেটা উল্লেখ করলেই ভালো হতো। ষড়যন্ত্রের অভিযোগে শোকজ করলে মেজর (অব.) হাফিজ আর শওকত মাহমুদ খলনায়ক হতেন। আর সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে শোকজ খেয়ে তারা এখন বিএনপির হিরো।

পেশাজীবীদের এই হঠাৎ বিপ্লবের সঙ্গে আমি কেন যেন মাত্র চারদিন আগে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার বিপ্লব বিলাসের মিল খুঁজে পাই। ১০ ডিসেম্বর প্রেসক্লাবেই এক অনুষ্ঠানে মান্না বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এক লাখ লোক যদি বেরিয়ে মিছিল করতে পারে বা কোথাও বসে যায়, তবে সরকারের খবর হয়ে যাবে। এখন সেই পরিকল্পনা করেন।’ তিনি বলেছিলেন, ‘দিল্লির লোক যদি ১৬ দিন ধরে পুরো দিল্লি বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে আমি পারবো না কেন? মাহমুদুর রহমান মান্না বিদ্রোহ করতে চান, কিন্তু আমার সঙ্গে তো হাজার হাজার মানুষ নেই। হাজার হাজার মানুষ আছে যাদের কাছে তারা কর্মসূচি দিচ্ছে না।’

মাহমুদুর রহমান মান্নার বিপ্লবের ইচ্ছা আছে, সামর্থ্য নেই। তিনি এখন বিএনপিকে চাঙ্গা করার দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যখন কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যা করা হয়েছে, তখন বিরোধীরা ধর্মঘট ডাকেনি। আন্দোলন করেছে সাধারণ মানুষ। আজ দিল্লিতে যে আন্দোলন, সেটা কি রাজনৈতিক দল ডেকেছে? ডাকেনি। তাতেই মোদি সাহেবের গদি টলছে। আপনার দল যদি কোনও কারণে কর্মসূচি না দেয়, তার মানে কি আপনার দল আন্দোলন চায় না? আন্দোলন চায়, কিন্তু কীভাবে গড়ে তুলবে তা বুঝতে পারছে না। এই আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, তার জন্য হয়তো আমরা প্রস্তুত নই। যদি চান তাহলে পরিকল্পনা করেন।’ এই পরিকল্পনা নিয়েই কি তবে ১৪ ডিসেম্বর পেশাজীবীরা পল্টন মোড়ে বসে পড়েছিল? কিন্তু সমস্যাটা হলো, মান্না চেয়েছিলেন এক লাখ লোক। কিন্তু মাঠে পেয়েছেন শখানেক লোক। আমিও মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে একমত, এক লাখ লোক রাস্তায় নামলে পরিস্থিতি বদলে যাবে।

কিন্তু তার আগে তো এক লাখ লোক মাঠে নামাতে হবে। জনগণ যদি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে না চায়, আপনি জোর করে তো তাদের মাঠে নামাতে পারবেন না। এই দেশে ’৬৯ সালে, ’৯০ সালে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। কারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। সরকার পতনের স্বপ্ন দেখলে তো হবে না। সেটা বাস্তবায়নের সামর্থ্য থাকতে হবে। মনে হচ্ছে, ডাকসুর রেকর্ড দুইবারের ভিপি, চাকসুর সাবেক জিএস মাহমুদুর রহমান মান্নার সরকার পতনের স্বপ্ন কল্পনাতেই মিলিয়ে যাবে। নয় মণ ঘিও পুড়বে না, রাধাও নাচবে না। মানুষও মাঠে নামছে না, সরকারও সরছে না।

মাহমুদুর রহমান মান্না যদি এক লাখ লোক মাঠে নামিয়ে বসাতে পারেন, আমি তার পাশে থাকবো কথা দিলাম। ষড়যন্ত্র নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল-স্লোগান দেওয়ার অধিকার সবার আছে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।