পদ্মা সেতু এবং শেখ হাসিনা: উন্নয়নের বাংলাদেশ মডেল

ড. শ্যামল দাস :

উন্নয়নের বাংলাদেশ মডেলের কথা আজকাল প্রায়ই উঠে আসে অ্যাকাডেমিক এবং রাজনৈতিক আলোচনায়। পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্রাইসিস মোকাবিলায় এটি কতটা সক্ষম তার ওপর এ ধরনের মডেলের টেকসই হওয়া নির্ভর করে। এ ধরনের মডেলের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথাই থাকবে, কিন্তু আমার মতে বাংলাদেশের বর্তমান অভিযাত্রা দেশটিকে নিয়ে একটি অন্য ধারার তাত্ত্বিক ব্রান্ডিংয়ের দাবি রাখে। অনেক ধরনের নেতিবাচক সমালোচনার পরও মোটা দাগে বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়নের ট্রেন্ডটি নব্য উদারতাবাদী প্যারাডাইমের মাঝেই কিছুটা অন্যরকম ধারার জন্ম দিয়েছে বলেই মনে করি।

ব্যাপারটি একটু তলিয়ে দেখা যেতে পারে। ধরুন এই পদ্মা সেতুর কথা। পদ্মা সেতু আজ মূর্তমান বাংলাদেশে। এই সেই সেতু যার কারণে একসময় বাংলাদেশকে দুর্নীতির বদনাম নিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের অনেক বড় বড় অর্থনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজের সদস্যরাসহ রাজনৈতিক বিরোধীরা তখন এটিকে কেবল ‘চুরি-চামারির’ উদ্দেশ্যে করা একটি প্রকল্প বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

কীভাবে এটি হলো তবে? আমার নিজের মনে আছে, এই আমেরিকায় একটি অনুষ্ঠানে আলোচনাটি উঠেছিল সে সময় এখানকার বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। এক কথায়, এ আলোচনার সারমর্ম ছিল, এটি শেখ হাসিনার একটি ‘গোঁয়ার্তুমি’ ছাড়া আর কিছু নয়; জেদাজেদি করে বিশ্বব্যাংকের সাথে টেকা যাবে না— উন্নয়ন নিয়ে পড়াশোনা করা অনেক পণ্ডিতের এটাই ছিল বক্তব্য। আমি নিজেও কি খুব নিশ্চিত ছিলাম এ প্রকল্প নিয়ে? মনে হয় ছিলাম না। আসলে সে সময় শেখ হাসিনা এবং তাঁর অল্প কিছু সহচর ছাড়া কেউই নিশ্চিত ছিলেন না খুব। তাহলে ব্যাপারটি কী দাঁড়ালো? সব জল্পনা কল্পনাকে পাশ কাটিয়ে পদ্মা সেতু আজ একটি বাস্তবতা। কী করে হলো? শুধুই শেখ হাসিনার ‘গোঁয়ার্তুমি’র ফসল এটি? আমার তা মনে হয় না। কেন মনে হয় না সেটি বলছি।

শেখ হাসিনাকে শুধুই আবেগনির্ভর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবিহীন নেতা ভাবার কোনও কারণ নেই। শুধুই আবেগ নির্ভরতা দিয়ে এতদিন প্রবল প্রতাপের সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকা যায় না। এ ব্যাপারটি ঘটেছে আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা এবং মিলেনিয়াম লক্ষ্য অর্জনে তাঁর দৃশ্যমান সফলতার কারণে। এ নিয়ে অনেক পরিসংখ্যান দেওয়া যেতে পারে; আমি এখানে খুব সাম্প্রতিককালের ছোট্ট একটি তথ্য দেই, যা মোটামুটি আমরা সবাই জানি এখন। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অন্যতম অংশীদার এডিবির (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) মতে, বাংলাদেশ এই করোনাকালীন সময়ে যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে তা তাদের আগের ভবিষ্যদ্বাণীকে ছাড়িয়ে গেছে; তাদের হিসাবে বাংলাদেশ ৬.৮% প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বর্তমান অর্থবছরে। উন্নয়ন গবেষকরা জানেন, বর্তমান মহামারির সময় এই মাত্রার প্রবৃদ্ধি কখনোই সম্ভব নয় যদি দেশটির খুব সক্ষম রাজনৈতিক নেতৃত্ব না থাকে।

বাংলাদেশের গড় আয়ু (৭৩.৪) ছাড়াও অন্যান্য সামাজিক খাতগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির অর্জন রীতিমত ঈর্ষণীয়। এসব তথ্য এবং বিশ্বফোরামে এ বিষয়ক আলাপচারিতা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, এ ধরনের অর্থনৈতিক এবং মিলেনিয়াম অর্জনগুলো যে শেখ হাসিনার সুদৃঢ় নেতৃত্বের কারণে সম্ভব হয়েছে সেটি মোটামুটি বিশ্বনেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন। এমনকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও এর বাইরে নন। এই ব্যাপারগুলোই মোটা দাগে বিশ্বফোরামে শেখ হাসিনার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আবার পদ্মা সেতু বিষয়ে ফিরে আসি। আমি আগেই বলেছি, শেখ হাসিনা শুধুই ‘গোঁয়ার্তুমি’ করে পদ্মা সেতু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা কিন্তু আমি মনে করি না। বছর দুয়েক আগে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর কাছের মানুষদের সঙ্গেই শুধু নয়, সংলাপ করেছিলেন কারিগরি এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর কাছে তিনি জানতে চেয়েছিলেন পদ্মা সেতু নির্মাণ আমাদের নিজস্ব এক্সপার্টিজ দিয়ে সম্ভব কিনা। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী তাঁকে তাঁর বিশেষজ্ঞ মতামত জানিয়েছিলেন, যা শেখ হাসিনাকে অনুপ্রাণিত করেছিল নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে। আমি মনে করি তিনি শুধু অধ্যাপক চৌধুরী নন, আরও অনেকের সাথেই কথা বলেছিলেন এবং এ সাহসী সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছিলেন সে সময়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের মূল অংশটি আমার চোখে এটাই। নিঃসন্দেহে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্তটি নিতান্তই রাজনৈতিক; শেখ হাসিনা জানতেন তিনি কী চাইছেন, কিন্তু এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি তিনি নিয়েছিলেন এ কাজে যারা বিশেষজ্ঞ ছিলেন তাঁদের মতামতের আলোকেই। শেখ হাসিনা এখানেই নিও লিবারেল তত্ত্বের প্রেমিসকে ছাড়িয়ে যান, যেখানে সুদক্ষতায় বিশ্বব্যাংকের মতো বিশাল স্টেকহোল্ডারকে ভুল প্রমাণ করে দিতে পারেন তিনি; তিনি সেদিন যে ভাষায় বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা করেছিলেন সেটিও সম্ভব ছিল শেখ হাসিনা বলেই। শেখ হাসিনাই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আবেগের সঙ্গে যুক্তির সিনথেসিস তৈরি করেছিলেন সেদিন। নেতৃত্বের এই গুণ শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে এক অন্যমাত্রার নেতায় পরিণত করেছে বলেই মনে করি। এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশের মানুষের কাছে দল আওয়ামী লীগের চেয়ে ব্যক্তি শেখ হাসিনা অনেক বড়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে আরও দুয়েকটি মতামত দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। নেতৃত্ব দেওয়ার এক অসাধারণ গুণ তাঁর আছে তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু আমার মনে হয়েছে, তিনি তাঁর এই গুণকে কাজে লাগিয়েছেন অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বব্যবস্থার কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার অনেক নেতার মতো বহিরাগত ফ্যাক্টরকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেননি, আবার এদের তিনি সীমার বাইরে গিয়ে তাঁর কাজে বাধাও সৃষ্টি করতে দেননি। উন্নয়ন সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার মনে হয়, বিশ্বব্যাংক বিষয়ে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত ছিল বিশ্বব্যবস্থার প্রচলিত একচেটিয়া কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ বা রেজিস্ট্যান্স। তিনি বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী বিশ্বব্যাংকের ভূমিকার কথা ভোলেননি। আমার নিজের ধারণা, বিশ্বব্যাংক যখন আবার এ প্রকল্পে ফিরে আসতে চেয়েছিল তিনি তখন তা মেনে নেননি। কারণ, বিশ্বব্যাংক চেয়েছিল এ কাজটি পুরোপুরি নতুন প্রকল্প হিসেবে শুরু করতে। সে সময় এটি মানলে প্রকল্পটি বছর তিনেক পিছিয়ে যেতো, এবং আমার ধারণা, শেখ হাসিনা আসলে বিশ্বব্যাংকের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর এই প্রতিরোধ কিন্তু তাঁকে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়েছে অনেকটাই। পরবর্তীতে দেখা গেছে ২০১৫ সাল থেকে বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনেক বেশি অনুদান দিয়ে তাদের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছে, কিন্তু ততদিনে পদ্মায় জল গড়িয়ে গেছে অনেক। এই সেদিনও দেখা গেলো আইএমএফের মতো বিশ্বব্যাংকের সিস্টার ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ভবিষ্যদ্বাণীকে নাকচ করেছে; পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অন্যতম অংশীদার এডিবির ভবিষ্যদ্বাণীর কথাতো আগেই বললাম; অন্য আরেক অংশীদার জাপান এবং জাইকা বাংলাদেশ বিষয়ে অনেক বেশি অনুকূল এখন। শেখ হাসিনা চীনের কাছেও অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য আগের তুলনায়। এই যে মনোভাবের পরিবর্তনগুলো ঘটেছে এসব বড় বড় উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর তার একটি অন্যতম কারণ। আমার মতে অবশ্যই পদ্মা সেতুর বিষয়ে শেখ হাসিনার অনড় অবস্থান এবং সেতু নির্মাণে এযাবৎকালে বাংলাদেশের অর্জন। এগুলো সবই আমার মতে উন্নয়নের বিশ্বব্যবস্থায় একচেটিয়া কর্তৃত্বের পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

বিশ্বব্যাংক যে খেলাটি শুরু করেছিল তার পেছনে আমরা অনেক ষড়যন্ত্রের কথা শুনেছি, এবং অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের কোনও দায় নেই তাদের কার্যক্রমের জন্য। এই যে দায়মুক্তির আইন সেটিও উন্নয়নের বিশ্বব্যবস্থায় তাদের কর্তৃত্ববাদের প্রতিফলন। ভেবে দেখুন, তাদের এ কাজের জন্য কতভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। একজন মন্ত্রী দুর্নীতির ছাপ নিয়ে তাঁর মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন; একজন প্রথিতযশা উপদেষ্টাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে যেতে হয়েছিল এই কলঙ্কের কালি মুখে নিয়ে, যিনি তাঁর কর্মজীবনে সততার জন্য পরিচিত ছিলেন অন্য মাত্রায়; তৎকালীন সেতু বিভাগের সচিবকে দেড় মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল বিনাদোষে। কানাডার আদালত যখন তাদের “বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ”কে (“ক্রেডিবল এভিডেন্স”) নাকচ করে  দুর্নীতির অভিযোগটি খারিজ করে দেয় তখনও আমরা দেখিনি বিশ্বব্যাংককে একটি বিবৃতি দিতে বা এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে। কারণ, এটিও নাকি তাদের আইনের বাইরে। কী অদ্ভুত নিয়ম! তারা যাকে তাকে চোর বলবে, কিন্তু এটি ভুল প্রমাণিত হলে তার কোনও শাস্তি তাদের পেতে হবে না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার বাংলাদেশকে বিনাদোষে দুর্নীতির একটি লেবেল বহন করতে হয়েছে, যার কোনও সরাসরি ক্ষতিপূরণ বিশ্বব্যাংক থেকে পাওয়া যায়নি, যদিও তারা অন্যান্য প্রকল্পে প্রচুর সহযোগিতা দিয়েছে।

আমার কাছে তাই পদ্মা সেতু উন্নয়নের বিশ্বব্যবস্থায় প্রচলিত কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিবাদের সিম্বল। শেখ হাসিনা যদি আজ পরাজিত হতেন তাহলে এই যে প্রতিবাদ, এটিরও কোনও ভিত্তি থাকতো না। আজ পদ্মা সেতু যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তখন আমার কাছে মনে হচ্ছে, “বাংলাদেশ মডেল” উন্নয়ন গবেষণা এবং আলোচনায় একটি বড় ধাপ অতিক্রম করে গেলো। বড় প্রশ্ন শেখ হাসিনার সামনে আরও আসবে ভবিষ্যতে, যেখানে তাঁকে অবশ্যই গণতন্ত্রায়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অনেক কিছু করতে হবে। দেশের সব পর্যায়ে দুর্নীতিকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসতে হবে; এ কাজে যেটুকু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট নয়। আমার ধারণা যদি শেখ হাসিনা এসব বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগও নেন, তাঁর নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলটি পুঁজিবাদী ধারার মাঝেই অনেক বেশি টেকসই হবে। মনে রাখা দরকার, এই বিষয়গুলো তাঁর মডেলের জন্য ক্রাইসিস বা সংকট বয়ে আনবে; কাজেই এগুলোর অন্তত সহনীয় একটি ফিক্স দরকার, যাতে আরও অনেকটা পথ বাংলাদেশ যেতে পারে এটিকে অবলম্বন করেই।

লেখক: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি (নর্থ ক্যারোলিনা)।

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।