জয় জোয়ান, জয় কিষান এবং অবরুদ্ধ দিল্লি

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী :

ভারতে নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় এনেছেন বৃহৎ পুঁজির মালিকরা। সুতরাং তিনি বৃহৎ পুঁজির মালিকদের অনুকূলে সব রাষ্ট্রীয় পলিসি নির্ধারণ করে এসেছেন এই যাবৎ। এবার ভারতের বৃহৎ কৃষি সেক্টরের জন্য মোদি সরকার তিনটি আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনের মধ্য দিয়ে কৃষি ব্যবস্থাপনা আর রাজ্যের বিষয় থাকছে না, রাজ্যকে অধিকারচ্যুত করেছে। অথচ এই বিষয়ে রাজ্যের সঙ্গে কোনও আলাপ-আলোচনা করা হয়নি, আর এই বিল সংসদে পাস করার সময় কোনও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যও লোকসভায় উপস্থিত ছিলেন না।
একতরফাভাবে নরেন্দ্র মোদি সরকার ভারতীয় কৃষক সমাজকে এই আইনটি প্রণয়ন করে ভারতীয় কৃষিকে চুক্তি চাষের আওতায় এনেছেন। কৃষকের সঙ্গে বাণিজ্য সংস্থার যে চুক্তি হবে, তাতে ফসলের পরিমাণ, গুণগতমান দাম ইত্যাদি আগেই নির্ধারিত থাকবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, নতুন আইনের সুযোগে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ফঁড়িয়ারা নিজেদের ইচ্ছেমতো ফসলের দাম নির্ধারণ করতে ও ইচ্ছেমতো গুদামজাত করতে পারবে। পূর্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষি ক্ষেত্রে কোনও বিপর্যয় নেমে এলে রাজ্য সরকার কৃষকের পাশে থাকতো। এখন তাতে রাজ্য সরকারের কোনও দায়-দায়িত্ব থাকছে না। বরং কেন্দ্রীয় সরকার বহুদূর থেকে সবকিছু তদারকি করবে।

রাজ্য সরকারকে কৃষি সেক্টরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নরেন্দ্র মোদি এক কেন্দ্রিকতা প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা ভারতীয় শাসনতন্ত্রের মৌলিক স্পিরিটের বিরোধী। গত ৭০-৭৫ বছরের উঠা বসায় রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে কৃষকদের একটি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এখন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে কৃষকের সক্রিয় বন্ধন সৃষ্টি হতে দীর্ঘ সময় ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে, যা কৃষিতে প্রচলিত নিয়ম নীতির ব্যাহত হয়ে কৃষির ক্ষতি হবে। ওদেরকে করপোরেট সংস্থার গোলাম বানানোর চেষ্টা করা উচিত হচ্ছে না। প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে গড়ে ওঠা ব্যবস্থাটিকে করপোরেটের স্বার্থে পরিবর্তন আনার চেষ্টা কখনও ভালো ফল বয়ে আনবে না।

গত ২৬ নভেম্বর ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান থেকে কয়েক লাখ কৃষক দিল্লি চলো স্লোগান দিয়ে দিল্লি দিকে রওনা হয়। শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করা এইসব কৃষক পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং দিল্লি সীমান্তে এসে দাঙ্গা পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। পুলিশ কৃষককে লাঠিপেটা করে জলকামান ব্যবহার করে, টিয়ার গ্যাসের শেল ব্যবহার করে। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য কাঁটাতারের বেড়া পর্যন্ত নির্মাণ করেছে। জয় জোয়ান, জয় কিষান স্লোগানে কৃষকেরা দাবি তুলেছে যে তিনটি কৃষি বিল পাস করেছে তা বাতিল করতে হবে। এই দাবিতে অনড় অবস্থানে রাস্তায় অবস্থান করছে।

নিজেদের ট্রাক্টর ও ট্রলিতে বেশ কয়েক মাসের রেশন নিয়ে, খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে শীতের রাত কাটাচ্ছে তারা মহাসড়কে। রাজধানীর ‘লাইফলাইন’ জাতীয় সড়ক ৪৪ কার্যত তাদেরই দখলে। সরকারের সঙ্গে কৃষক নেতারা বারবার আলোচনায় বসেছেন, কিন্তু আলোচনা কোনও পর্যায়ে ফলপ্রসূ হয়নি। কৃষকের কথা হচ্ছে তারা দীর্ঘসময়ের রসদ নিয়ে এসেছে। সুতরাং তারা তাড়াহুড়া করবে না। দাবি না মানা পর্যন্ত তারা অবস্থান চালিয়ে যাবে।

এদিকে, কৃষকদের চলমান বিক্ষোভের ২১তম দিনে ১৬ ডিসেম্বর বিষয়টিতে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেছে। সুপ্রিম কোর্ট একটি কমিটি গঠন করার কথা ভাবছে যেখানে কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সরকারের প্রতিনিধিরা থাকবে। কৃষকদের সড়ক অবরোধকে গত ফেব্রুয়ারিতে দিল্লির শাহিনবাগের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন সঙ্গে তুলনা করা হলে, আদালত ওই ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম নজির বলে উল্লেখ করেন। সুপ্রিম কোর্ট দিল্লির সীমানা এলাকায় বিক্ষোভকারী কৃষকদের অবিলম্বে অপসারণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি নোটিশ জারি করেছেন। অবশ্য ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এখন সরকারের ইশারার চলে। ফলে এই উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে এখনই বলা যায় না। কৃষকদের অপসারণের আবেদনের রায় দেওয়ার আগেই কৃষকরা বলছেন যে এটি সরকার ও আদালতের ‘ফিক্সড ম্যাচ’।

কৃষকেরা মনে করছে বর্তমানে প্রচলিত মন্ডি ব্যবস্থার উচ্ছেদ করতে পারলে প্রাইভেট কোম্পানিগুলো ইচ্ছেমতো কৃষি পণ্যের দাম উঠা-নামা করার সুযোগ পাবে এবং এতে কৃষক সম্প্রদায় শেষ পর্যন্ত প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে। তাদেরকে অসহায় করে কৃষি সেক্টরের এই অবস্থা সৃষ্টি করতে পারলে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে নেবে। মন্ডি ব্যবস্থায়ও সময় সময় কৃষক তার বিনিয়োগ তুলতে পারে না, যেখানে সরকার পণ্যের ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করে রেখেছে। এই অবস্থায়ও ভারতীয় কৃষকের আত্মহত্যা হিড়িক পড়ে।

ভারতের কৃষকেরা হতদরিদ্র। গড়ে ৫ একরের ওপরে তাদের কোনও জমি নেই। ফসল উৎপাদন ছাড়া তাদের অন্য কোনও আয়ের উৎস নেই। সুতরাং উৎপাদনে কোনও গন্ডগোল হলেই কৃষকের আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বিভিন্ন কারণ ভারতে প্রতিবছর গড়ে ১২ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেন। দেশটির ৬০ শতাংশ জনগোষ্ঠী কৃষির ওপর নির্ভরশীল। শুধু ভারত না, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশই কৃষিনির্ভর। বাংলাদেশের কৃষি বাজারও নিয়ন্ত্রিত হয় ভারতের কৃষি বাজারের ওপর ফলে। ওই কৃষকদের জন্য আমাদেরও মানসিক সমর্থন রয়েছে।

এই আন্দোলনে খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত আছে, এর মধ্যে এই মন্তব্য করে কৃষকদের আরও চটিয়ে দিয়েছেন হরিয়ানার বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টার। হরিয়ানায় বিজেপি সরকারের অংশীদার জননায়ক জনতা পার্টির নেতা এবং রাজ্যের ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী দুষ্মন্ত চৌতালা গত ১২ ডিসেম্বর দিল্লি এসে দেশরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জোট ত্যাগের কথা বলে গেছেন। কারণ তারা কৃষকের পক্ষ থেকে দাবি না মানলে জোট ত্যাগের চাপে রয়েছেন। চৌতালের দলের ভিত্তি হচ্ছে কৃষকের সমর্থন।

নরেন্দ্র মোদি আইন বাতিলের কোনও কথাই শুনতে নারাজ। তিনি ১২ ডিসেম্বর এক বণিকসভায় বলেছেন, ভারতের কৃষি সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কৃষি আইন তিনটি খুবই জরুরি। বিজেপির অভিযোগ খালিস্তানি শিখ, শহরের নকশাল ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই কৃষক আন্দোলন ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। কিন্তু কৃষক নেতারা বিজেপির এই কথার জোর প্রতিবাদ করেছেন। কৃষক নেতারা বলছেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বহীন করার জন্য বিজেপি অনুরূপ অভিযোগ তুলছে। বহু কৃষক নেতাকে সরকার গ্রেফতার করে রেখেছে এবং কৃষক সমাবেশকে উৎখাত করার জন্য তারা ব্যাপক পুলিশ সমাবেশ করেছে।

এই উপমহাদেশে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হলেও ইংরেজরা সরাসরি ভারত শাসন করেনি। প্রত্যক্ষ শাসনের পরিবর্তে তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ভারত শাসন করেছিল। তখন অনিয়ন্ত্রিত রাজস্ব ব্যবস্থার কারণে বহু কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল ভারতে, যা শেষ পরিণতিতে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। মহাবিদ্রোহের পর ইংরেজরা যখন প্রত্যক্ষভাবে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে, তখন রাজস্ব ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফিরে আসে।

ইংরেজ কর্মকর্তা অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম দীর্ঘদিন কৃষিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি বুদ্ধিমান লোক ছিলেন। তিনি কৃষকের বিদ্রোহকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য রাজনৈতিক দল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৮৮৫ সালে হিউম কংগ্রেস দল প্রতিষ্ঠা করার পর জনসাধারণের অভাব-অভিযোগের কথা নিয়মতান্ত্রিক পথে সরকারের কাছে পেশ করার একটা নিয়ম প্রবর্তিত হয়। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন আর ১৯৩৫ সালের দ্বিতীয় ভারত শাসন আইন ভারতের শাসন ব্যবস্থায় ভারতীয়দের সম্পৃক্ত করে একটি ফলপ্রসূ শাসনতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে, যার পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারতের স্বাধীনতা ভারতীয়দের হাতে প্রদান করে ভারত ত্যাগ করেছিলেন।

গত কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের কৃষকেরা এমন সর্বভারতীয় আকারের কোনও আন্দোলন করেনি। তারা ধীরে ধীরে আন্দোলনে গতি সঞ্চার করছে। আন্দোলনটি মোকাবিলা করতে না পারলে এটি আরও তীব্র হবে। ভারতীয় মিডিয়ার খবর অনুসারে আড়াই কোটি কৃষক ঘর ছেড়ে মাঠে এসে আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। ইতোমধ্যে বহু পাঞ্জাবি সারা বিশ্বে এই আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল করছে। বড় বড় তারকারা এই আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছে। সরকারের দেওয়া রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও খেতাব প্রত্যাখ্যাত করেছেন অনেকে। ভারতের সমাজকর্মী আন্না হাজারে জানিয়েছেন, কেন্দ্র কৃষকের সমস্যার সমাধান না করলে তিনি অনশন ধর্মঘটে যাবেন। নরেন্দ্র মোদি সরকার কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতের সব রাজনৈতিক দল কৃষকের এই দাবি সমর্থন করছে। সুতরাং বিজেপি সরকার একগুঁয়েমি করলে ফল ভালো হবে না—সেই পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।