মহান বিজয় দিবস

আজ ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। ৪৮ বছর আগে এই দিনে স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত হয়েছিল নয় মাসের যুদ্ধ শেষের গান। সমবেত কণ্ঠে শব্দসৈনিকরা গেয়ে উঠেছিলেন, ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই, বাংলার ঘরে ঘরে, মুক্তির আলো ওই জ্বলছে।’ সেই আলোর ঝর্ণাধারায় প্রজ্বলিত হয়ে উঠেছিল বিশ্ব মানচিত্রে এক নতুন দেশ-বাংলাদেশ। গৌরবের, আনন্দের, অহঙ্কারের, আত্মমর্যাদার ও আত্মোপলব্ধির দিন আজ। বিজয়ের গৌরবে গৌরবান্বিত হওয়ার দিন।

দেদীপ্যমান, প্রসন্ন, আলোকিত বিজয় দিবস মানেই বাঙালীর নবজন্ম। বর্বর পাকিস্তানী হানাদার সেনাবাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দোসর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার দিন। জাতি হিসেবে বাঙালীর সহস্র বছরের সাধনা শেষে অর্জিত চূড়ান্ত বিজয়ের দিন। বিশ্বে স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার দিন। বিজয়ের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মত্যাগ ও সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তাদের রক্তে, অবদানে মুক্ত হয়েছিল স্বদেশ। পত পত করে উড়ছে স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা। সাড়ে সাত কোটি মানুষের অসীম ত্যাগ আর সাহসিকতার ফসল ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অকুতোভয় সংগ্রাম, রাজনৈতিক নির্দেশনায় লড়াই করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা, যাদের অবদান এই স্বাধীন বাংলাদেশ।

একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর মেশিন গান, মর্টার, কামান, ট্যাঙ্ক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শুরু করেছিল নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ, যাকে বলে গণহত্যা। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে। তুলে নিয়েছিল হাতে প্রতিরোধের অস্ত্র। ঘরে ঘরে গড়ে তুলেছিল দুর্গ। সম্মুখসমরে জীবনবাজি রেখে লড়াই করেছিল। সেদিন কেবল পাকিস্তানী সেনার সঙ্গে নয়, তাদের এ দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হয়েছে। বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে আলবদর, রাজাকাররা বাঙালীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকিস্তানী হানাদার ও তাদের সহযোগীরা পর্যুদস্ত হয়ে বাধ্য হয় আত্মসমর্পণে। রেসকোর্স ময়দানে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানী সেনারা। দখলদার পাকবাহিনীর দখলমুক্ত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ যখন পুনর্গঠনের পথে, ঠিক তখন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মাথা তুলে দাঁড়ায়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক স্বৈরশাসকরা পরাজিত শক্তির শুধু পুনর্বাসন নয়, রাষ্ট্র ক্ষমতায়ও অংশীদার করে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত থাকে। কিন্তু সামরিক জান্তা শাসকরা সে বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়। সাজাপ্রাপ্তসহ বিচারাধীনদের কারাগার থেকে মুক্ত করে রাজনীতিতে নিয়ে আসে। শাসকরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেবল বিকৃতই নয়, ধামাচাপা দিয়ে রাখে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাস ধারণ করতে না পারে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি প্রকট হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেন নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী। বিচারের বাণীকে নীরবে নিভৃতে কেঁদে ফেরার পথ রুদ্ধ করে দেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের মামলার রায় প্রদান ও শাস্তি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। যে রাষ্ট্রের মর্মবাণী হবে গণতন্ত্র। যে রাষ্ট্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মুক্তির আস্বাদ নিয়ে বসবাস করবে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ ও মাদককে প্রতিহত করে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের বুকে। ওইসব অপশক্তিকে সমূলে উৎখাত করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করাই বর্তমান বাংলাদেশের লক্ষ্য।