মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কিছু বিলম্বে হলেও কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথমত, যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ও যথার্থ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চূড়ান্তকরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের তালিকা প্রণয়ন, যা প্রকাশিত হতে পারে আগামী বছরের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে। উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই কাজটি আগেও করেছিল, যা প্রণীত হয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রেরিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। সেটি নিয়ে তখন তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম ঢুকে গিয়েছিল সেই তালিকায়। বাদ পড়েছিল অনেক রাজাকারের নাম। যে কারণে মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। এবার যেন রাজাকারদের তালিকা নিয়ে কোন নয়-ছয় কিংবা বিতর্ক না ওঠে তা নিশ্চিত করতে হবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে। একই কথা প্রযোজ্য মুক্তিযোদ্ধাদের যথার্থ তালিকা প্রণয়ন নিয়েও। এ পর্যন্ত প্রকাশিত একাধিক মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা যেমন রয়েছে, তেমনি বাদ পড়েছেন অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। সর্বশেষ, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, অনুমোদন ছাড়াই যাদের নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে তাদের সনদ আবার যাচাই-বাছাই করা হবে। এই সংখ্যা অন্তত ৪২ হাজার। আগামী ১৯ ডিসেম্বর সারাদেশে একযোগে শুরু হবে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। এর পাশাপাশি প্রণয়ন করা হবে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের তালিকা, যেটি করা আবশ্যক ছিল সবার আগে। বিলম্বে হলেও এক হাজার ২২২ শহীদ বুদ্ধিজীবীকে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তটিও প্রশংসনীয়। মুক্তিযোদ্ধারা দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের জন্যই আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির এক অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কথাটি বুঝি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে প্রকৃত ও ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধারা আজ কোণঠাসা। নিজেদের পরিচয় দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করেন। এই দুরবস্থার জন্য কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা দায়ী নন কোনভাবেই। বরং যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তখনই সে মর্জিমাফিক তৈরি করেছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা। আর এই সুযোগে তালিকায় সন্নিবেশিত হয়েছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম। ফলে জটিল আবর্ত তথা গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা। এটা খুবই দুঃখজনক যে, স্বাধীনতার ৪৯ বছর অতিবাহিত হতে চললেও আজ পর্যন্ত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল ও নির্ভেজাল একটি তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হলো না।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে অন্তত ছয়বার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, প্রতিবারই তালিকায় ঢুকেছে অমুক্তিযোদ্ধা তথা ভুয়াদের নাম। ফলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বরাবরই বিতর্ক ও প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। দেশে এখন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৮ জন। প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন এক লাখ ৮৭ হাজার ৯৮২ জন। তাহলে বাকিরা কেন পান না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ও সঙ্গত। আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্মানী ভাতা, সন্তান-নাতি-নাতনির জন্য চাকরির কোটা, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কারণে মুক্তিযোদ্ধার সনদ সংগ্রহ এবং তালিকাভুক্তির জন্য এত বিপুল লোভ ও আগ্রহ। তদুপরি আছে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের দাপট। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেখিয়ে সিনিয়র সচিব পদ বাগিয়ে নেয়ার ঘটনাও আছে। এটা তো সত্য যে, যে বা যারা জীবন বাজি রেখে একাত্তরের রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তারা আদৌ কোন প্রাপ্তির আশায় যুদ্ধে যানটি। বরং সশস্ত্র যুদ্ধে সম্মুখসমরে যোগ দিয়েছিলেন দেশমাতৃকার টানে, স্বদেশকে স্বাধীন করবেন বলে। তাদের মধ্যে অনেকেই জীবন সায়াহ্নে এসে কায়ক্লেশে জীবনযাপন করছেন। কেউ রিক্সা চালাচ্ছেন, কেউ হয়েছেন বস্তিবাসী, আবার কেউ নৌকার মাঝি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। অথচ তারাই মাঠপর্যায়ের যথার্থ মুক্তিযোদ্ধা, যাদের নাম তথাকথিত তালিকায় থাকার কোন প্রয়োজন পড়ে না। তবে শেষ বিচারে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়াই বাঞ্ছনীয়।