তোমাদের যা বলার ছিল, বলছে না তা বাংলাদেশ

প্রভাষ আমিন :

১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। আমাদের জাতির জীবনে সবচেয়ে আনন্দের দিন। নয়মাসের রক্ষক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের এইদিনে আমরা বিজয় পেয়েছিলাম। শক্তিশালী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তখনকার রেসকোর্স ময়দানে খোলা আকাশের নিচে আত্মসমর্পণ করেছিল। নয়মাসের যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, শরণার্থীজীবন শেষে বাঙালি পেয়েছিল পতাকা ওড়াবার স্বাধীনতা, গলা ছেড়ে গাইবার স্বাধীনতা, নিজেদের একটি দেশ। কিন্তু শুধু একটি দেশ পেলেই হয় না। সেই দেশকে নিজেদের মতো করে গড়তে হয়। দেশ গড়ার কৌশল দুইটা। একটা হলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আরেকটা হলো জ্ঞানে-মননে উন্নয়ন। দৃশ্যমান উন্নয়ন নিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের অত মাথাব্যথা ছিল না। তাদের ধারণা ছিল, বাংলাদেশ এগুতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তো বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে বিদ্রুপ করেছিলেন। শুধু কিসিঞ্জার নয়, আরও অনেকেই বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দিহান ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদারদের আসল লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশ যাতে জাতি হিসেবে দাঁড়াতে না পারে। চিন্তা আর মননের জায়গায় আঘাত করতে পারলেই একটা জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। পরাজয় যখন নিশ্চিত, তখন হানাদাররা চাললো আসল চাল। জন্মের আগেই বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিতে যাওয়ার আগে তারা পরিকল্পনা করে বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করতে তালিকা নিয়ে মাঠে নামে তারা। আর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাছে টানে তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের। তারা বিজয়ের আগের সপ্তাহে তালিকা ধরে ধরে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। বিজয়ের আনন্দ তাই ম্লান হয়ে যায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর বেদনায়। ১৬ ডিসেম্বর যেমন জাতির সবচেয়ে আনন্দের দিন, তেমনি তার দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর জাতির বেদনার দিনও।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করলেও শেষ করতে পারেননি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিজয়ের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। শুরু হয় একাত্তরের পরাজিত শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন। ২১ বছর বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধু, চেষ্টা হয়েছে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানানোর। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ শেষ করার প্রত্যয় নিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন। কিন্তু ২১ বছর জমে থাকা জঞ্জাল সরাতেই কেটে যায় তার অনেকটা সময়। এই সময়ে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার করছেন। আর সবচয়ে বড় যে কাজটা করেছেন, তা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া। কিসিঞ্জারের কল্পনার তলাবিহীন ঝুড়ি তো নয়ই, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ এখন সক্ষমতায়, মর্যাদায়, সামর্থ্যে সবার বিস্ময়। বিজয়ের মাসে নিজেদের টাকায় পদ্মার দুই পাড় সংযুক্ত করে সরকার বাংলাদেশের মাথা আরও উচুতে তুলেছে।

বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলছে, তখনই মাঠে নেমেছে সেই পুরোনো শত্রু। পাকিস্তানিরা যেমন জানতো, একটা জাতিকে ধ্বংস করতে আঘাত করতে হবে চিন্তা আর মনননের জায়গায়। বাংলাদেশে বসে পাকিস্তানি ভাবধারায় বেড়ে ওঠা তাদের উত্তরসূরীরাও আঘাতটা করছে সেই চিন্তার জায়গায়। উগ্র মৌলবাদীরা ঠিক একাত্তরের কায়দায় জাতিকে পঙ্গু করার ঘৃণ্য খেলায় মেতেছে। হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যু করে মাঠে নামলেও তাদের আসল টার্গেট অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, উন্নত বাংলাদেশ, মুক্তচিন্তার বাংলাদেশ। বিশ্ব যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বের যখন করোনার টিকা নিয়ে প্রতিযোগিতা করছে; আমরা তখন ভাস্কর্য না মূর্তি এই বিতর্কে আটকে আছি। ১৪০০ বছরের ইসলামের সাথে ভাস্কর্যের কোনো বিরোধ বাঁধলো না। ৫০ বছরের বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলে সম্প্রীতির দেশ গড়ে তুললো। আর এখন হঠাৎ মৌলবাদীদের সব সমস্যার কেন্দ্রে চলে এলো ভাস্কর্য! এই মৌলবাদীরা বাংলাদেশকে পিছিয়ে নিতে চায়, অগ্রগতিকে রুখে দিতে চায়।

ইসলামের জন্মভূমি সৌদি আরবে যখন নারীরা ক্রমশ এগিয়ে আসছে, গাড়ি চালানোর অনুমতি পাচ্ছে; তখন বাংলাদেশের মৌলবাদীরা নারীদের ‘ফোর-ফাইভ’ পর্যন্ত পড়াতে চায়, কাজ করতে দিতে চায় না। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি শিক্ষার বিরোধিতা করে মৌলবাদীরা মুসলমানদের পিছিয়ে দিয়েছিল। এখনও কথায় কথায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তারা সব মানুষের ধর্ম ইসলামকে গণ্ডিবদ্ধ করে রাখতে চায়। সহজ ইসলামকে কঠিন করে ফেলতে চায়। অল্প কিছু মৌলবাদীই যেন ইসলামকে লিজ নিয়ে ফেলেছে। তারা কথায় কথায় হারাম-হালালের তালিকা দেয়, আবার মাঝে মাঝেই সেই তালিকা বদলায়, যখন ইচ্ছা যাকে তাকে অমুসলিম, কাফের, নাস্তিক ঘোষণা করে।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। তারা নিয়মিত ধর্ম পালন করে। নামাজ পড়া, রোজা রাখা, টাকা জমিয়ে শেষজীবনে একবার হজ করা, মানুষের কল্যাণ করাকেই ধর্ম হিসেবে পালন করে। কিন্তু কাঠমোল্লারা এই সহজ ইসলামকে নানান নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে রাখতে চায়। তাদের দৃষ্টিতে ভাস্কর্য হারাম, সুদ হারাম, ছবি তোলা হারাম, ছবি দেখা হারাম, সিনেমা হারাম, গান হারাম, ফেসবুক হারাম, নারীশিক্ষা হারাম, নারী নেতৃত্ব হারাম। তাদের কথা মানলে ইসলাম ধর্ম অপালনযোগ্য হয়ে যাবে। প্রতিযোগিতামূলক কঠিন বিশ্বে মুসলমানরা আরও পিছিয়ে পড়বে। সময় এখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের। শ্রেষ্ঠ হতে হলে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশের উগ্র মৌলবাদীরা যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে কথা বলে, সারাক্ষণ ঘৃণা ছড়ায়, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ায়, সমাজে অশান্তি ছড়ায় তা ইসলামসম্মত নয়। ইসলামের শান্ত সুফি ভাবধারার সাথে এই কাঠমোল্লাদের ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম বিশ্বজয় করেছিল শান্তির বাণী দিয়ে, ঘৃণা বা সন্ত্রাস দিয়ে নয়। আজ যারা শান্তির ধর্ম ইসলামকে সন্ত্রাস আর জঙ্গীবাদের ধর্ম বানাতে চায়, তারা অবশ্যই ইসলামের শত্রু।

গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স বা বৈশ্বিক জ্ঞান সূচক। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশনের যৌথভাবে প্রকাশিত সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে- ১৩৮টি দেশের মধ্যে ১১২তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে বাংলাদেশ। বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান এই নিউজটি শেয়ার করে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দেশ অশিক্ষিত মোল্লা-মৌলভীতে ভরে গেলে এই তো হয়।‘ অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক আর সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ যখন বিশ্বের বিস্ময়; তখন জ্ঞান সূচকের এই হাল আমাদের জন্য লজ্জাজনক। এই অন্ধকারের শক্তির কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে হবে।

একাত্তরে সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিল। একাত্তরের স্লোগান ছিল ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’। একাত্তরের গান ছিল ‘নেই ভেদাভেদ হেথা চাষা আর চামারে/নেই ভেদাভেদ হেথা কুলি আর কামারে/হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান/আমার এ দেশ সব মানুষের।‘ সব মানুষের এই দেশকে তারা শুধু মুসলমানদের দেশ বানাতে চায়। অথচ ইসলাম সব ধর্মকে সম্মান করাই শেখায়।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এলে আসাদ চৌধুরীর কবিতার একটি লাইন প্রশ্ন হয়ে ঘুরে বেরায় আমাদের মাঝে, ‘তোমাদের যা বলার ছিল, বলছে কি তা বাংলাদেশ?’ মুক্তিযোদ্ধারা, শহীদ বুদ্ধিজীবীরা, ৩০ লাখ শহীদ যে স্বপ্নে যুদ্ধ করেছেন, জীবন দিয়েছেন; আমাদের দায়িত্ব ছিল সেই বাংলাদেশ গড়ে তোলা- সবার বাংলাদেশ, সব মানুষের বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কেন যেন মনে হয়, এই প্রশ্নের উত্তর হলো, ‘তোমাদের যা বলার ছিল, বলছে না তা বাংলাদেশ’। আমাদের আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়তে হবে, রুখতে হবে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে। তাহলে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মা শান্তি পাবে।

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।