বিজয়ের অহংকার পদ্মা সেতু

মো. মশিউর রহমান :

বিজয়ের অহংকার পদ্মা সেতু। এক থেকে একচল্লিশ নম্বর স্প্যান বিজয়ের ইতিহাস। গর্বের ইতিহাস। স্প্যানগুলো যেন একেকটি প্রতিশোধের স্পৃহার প্রতীক। একেকটি স্প্যান মাথা উঁচু করে গর্বের সহিত দাঁড়িয়েছে আর ষড়যন্ত্রকারীদের চপেটাঘাত করেছে। জবাব দিয়েছে সকল ষড়যন্ত্রের। ষড়যন্ত্রের নানান চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অহংকারের শেষ স্প্যানটি পতপত করে উড়িয়ে জানান দিল আমি বিজয়ী বাঙালির জাত। আমাকে দাবিয়ে রাখা যায়নি, যাবে না। আমি বীরের প্রতীক। আমি সংগ্রামের প্রতীক। আমি সততার প্রতীক। আমি বিশ্বাসের প্রতীক। আমি ষড়যন্ত্রকারীদের দাঁতভাঙা জবাব দিতে জানি। রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে। আমি মুক্তির প্রতীক। স্প্যানগুলো বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে। শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা-বোনকে।

২০০১ সালেই পদ্মা সেতুর শুভসূচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। শুধু বন্ধই করেনি, বঙ্গবন্ধুকন্যার নেয়া যত উন্নয়ন প্রকল্প ছিল তা লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে ভাগবাটোয়ারা করে খেয়ে নেয়। ফলে বারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন। সারাদেশে চলে লুটপাটের রাজত্ব। বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার তাণ্ডবলীলা চালায় বিএনপি-জামায়াত। খুনের নেশায় মাতোয়ারা বিএনপি-জামায়াতের বারবার টার্গেট হন বঙ্গবন্ধুকন্যা। ষড়যন্ত্রের সকল প্রতিকূল, ধ্বংসাত্মক পথ পেরিয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণে জোর প্রতিশ্রুতি ছিল। সরকার গঠন করেই ২০১১ সালে ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে। নিজ ইচ্ছায় বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। একই বছরের শেষ দিকে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত রাখে। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ সরকার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। ২০১২ সালে ঋণচুক্তিটি বাতিল করে দেয় বিশ্বব্যাংক।

বঙ্গবন্ধুকন্যা স্পষ্ঠভাবে ঘোষণা দেন যে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হবে। পদ্মা সেতু করার জন্য দেশে আমাদের ১৬ কোটি মানুষ আছে, ৮০ লাখ প্রবাসী আছে। বাংলার মানুষ সারাজীবন কি অন্যের সাহায্যে চলবে? নিজের পায়ে দাঁড়াবে না? আত্মনির্ভরশীল হবে না? পদ্মা সেতু আমরা করবই। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানে সাড়া পড়ে যায়। মালয়েশিয়া-চীনসহ কয়েকটি দেশ সহযোগিতা করতে চাইলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা সাফ জানিয়ে দেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হবে।

বানানো হয়েছিল দুর্নীতির সাজানো গল্প। ধীরে ধীরে সত্য প্রকাশিত হতে থাকে। বের হতে থাকে জজমিয়ার মতো সাজানো নাটকের গল্প। উঠে আসে ষড়যন্ত্রের নানান তথ্য। উন্মুক্ত হতে থাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ। ষড়যন্ত্র করেছে দেশের মধ্যে থেকে ও দেশের বাইরে থেকে। তারা চেয়েছে এই সেতুটা যেন না হয়। শেখ হাসিনা যেন সফল না হন। নানাভাবে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছে ষড়যন্ত্রকারীরা। ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে বিশ্বব্যাংক, সুদের আসরের বুজুর্গ অধ্যাপক ইউনূস, বিএনপি-জামায়াত, হিলারি, সুবিধাবাদী সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন সংস্থাসহ দেশি-বিদেশিচক্র। মিথ্যাচার করেছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। দেশের সুবিধাবাদী সুশীল মহল ও কিছু গণমাধ্যম, দেশি-বিদেশি চর দিনের পর দিন মানুষের মাঝে প্রচার করেছে সরকার পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি করেছে।

বসে থাকেনি খালেদা জিয়া আর তারেক জিয়া। সিরিজ আকারে মিথ্যাচার-অপপ্রচার চালিয়েছে দিনে পর দিন। ধারাভাষ্যকারের মতো বলেই চলেছে আমরা দুইটা, তিনটা ….পদ্মা সেতু করব। লেলিয়ে দিয়েছে ৭১-এর পরাজিত শক্তি বিএনপি-জামায়াত-শিবিরকে। বাধাগ্রস্ত করেছে আত্মঘাতীমূলক জ্বালাও-পোড়াও কর্মকাণ্ড করে।

গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকেছে আমেরিকা। যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। ৭৪ এ কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরি করে দিয়েছিল এই আমেরিকা। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার নাটের গুরু ছিল। তারা এখনও গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, আছে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানো। তখনও জাতির পিতা তাদের বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তারই কন্যা শেখ হাসিনা। কীভাবে সম্ভব পিতার শত্রু, দেশের শত্রুদের কাছে মাথানত করবে? মাথানত করেননি। নিরাশ হয়েছেন অনেকে। হাল ছাড়েননি একজন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা পরাজিত হবার নন। শেখ হাসিনা মাথা নোয়ানোর নন। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, মিথ্যাচার, হত্যার হুমকিসহ সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে, মাথা উঁচু করে দেশের স্বার্থকে সামনে তুলে এগিয়ে নিয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকসহ দেশি-বিদেশি চক্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা অসীম সাহসী ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বিজয়ের মাসে বিজয়ের স্বাদ।

এদিকে কানাডার আদালত সাফ জানিয়ে দেয়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো রকম দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, সততার শক্তি ছিল বলেই বিশ্বব্যাংকের ওই অভিযোগকে তিনি চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছিলেন। তিনি আরও মন্তব্য করেন এই রায়ে বিশ্ব-অঙ্গনে বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপরও ষড়যন্ত্র থেমে থেকেনি। গুজব ছড়ানো হয়েছে পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগ করতে পারবে না। মৌলবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীতো আছেই। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে, রক্ত লাগবে; আরও কত কী যে গুজব ছড়িয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। হা-হুতাশের জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছেন শেখ হাসিনা।

পদ্মা সেতু স্বপ্ন নয় দৃশ্যমান। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এক নতুন ইতিহাস রচনা করল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে। দুটো পিলারের মাঝের স্প্যানটি যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে জানিয়ে দিল আমরা বাাঙালি। আমরা সেই বাঙালি যাদের পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, আমরা সেই বাঙালি যাদের নেতা শেখ হাসিনা। আমরা ন্যায্য প্রতিবাদ করতে জানি। সকল ষড়যন্ত্র ভেদ করে আমরা সফল হতে জানি। আমাদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। স্প্যানগুলো যেন বিশ্ব মোড়লদের বলছে তোমরা যতই ষড়যন্ত্র কর কোনো লাভ হবে না। কারণ আমার অভিভাবক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ও যেন বারবার প্রতিবাদ করে, অহংকার করে বলছে আমি শুধু পদ্মা সেতু নই, আমি শেখ হাসিনার নিষ্ঠা, সততার প্রতীক। ও আরও বলছে শেখ হাসিনা আমার নেতা। ক্লান্তহীনভাবে ছুটে চলা এক কর্মময় মানুষ। শেখ হাসিনা সারাবিশ্বকে দেখিয়ে দিলেন বাঙালিরা চাইলে সবই অর্জন করতে পারে। বিশ্ব মোড়লদের চোখে আঙুল দিয়ে শেখ হাসিনা বুঝিয়ে দিলেন, পাহাড়সম দৃঢ়তা, আকাশচুম্বী দেশপ্রেম আর সৎ কর্মস্পৃহা থাকলে অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

বিশ্বব্যাংকসহ সকল ষড়যন্ত্রকারীর উচিত শেখ হাসিনার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া। শেখ হাসিনার জীবনে অসম্ভব বলে কোনো কাজ নেই। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বই, ছিটমহলে স্বাধীনতা, সমুদ্রবিজয়……….। কেউ বলছে প্রাচ্যের তারকা, কেউ বলছে মানবতার মা……… আরও কত বিশ্লেষণ।

পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশ পারে। প্রমাণ হয়েছে আমরা পারি। পদ্মা সেতু ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জন্য। কারণ এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত ছিল। এত বড় আর খরস্রোতা একটা নদীর ওপর এত বড় একটা সেতু নির্মাণ করে শেখ হাসিনা বিশ্বের সামনে একটা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা রাজনীতি করেন মানুষের জন্য। দিনরাত কাজ করেন মানুষের জন্য। বঙ্গবন্ধুকন্যা যে পারেন তা দেখিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা উন্নয়নের সর্বোচ্চ উচ্চতম স্থানে নিয়ে গেছেন। শেখ হাসিনাকে ঘিরে মানুষ এখন আশা দেখে, স্বপ্নে বুকবাঁধে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ছুটে চলে। কারও রক্তচক্ষুকে শেখ হাসিনা ভয় পান না। পদ্মা সেতু তৈরি করে ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করলেন। করোনা মহামারিতে বিশ্ব এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে। লণ্ডভণ্ড জীবন-জীবিকা। এমন পরিস্থিতিতেও দূরদর্শিতার চমক প্রদর্শনে বিশ্বকে তাগ লাগিয়ে উন্নয়নের চাকা রেখেছেন গতিশীল। করোনার কারণে কোনো প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়নি একটুও। মানুষকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে রক্ষাকবচের মতো। অসম্ভবকে সম্ভব করা আর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা জাদুর নাম শেখ হাসিনা। নিন্দুকের দৃষ্টি কখনই ভালো কিছু দেখে না।

শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র আশা, ভরসা ও বিশ্বাসের কেন্দ্র। পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থে তৈরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেখিয়ে দিলেন শুদ্ধ বাঙালির সক্ষমতা। বুঝিয়ে দিলেন এ জাতি দমে যাওয়ার নয়, থেমে যাওয়ার নয়। তাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখি বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলার। শেখ হাসিনা বাঙালির বাতিঘর। শেখ হাসিনা স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখান, স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও জেগে থেকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশকে। স্যালুট, স্যালুট স্যালুট বঙ্গবন্ধুকন্যা হাসু আপা।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু পরিষদ পরিচালক, বঙ্গবন্ধু চর্চা কেন্দ্র বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।