দিনাজপুরে ৫৬টি বধ্যভূমি অযত্ন-অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে

দিনাজপুর : দিনাজপুর জেলা শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে আউলিয়াপুর ইউনিয়নের ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর সেখানে ক্যাম্প করে বাঙালি আর্মি, ইপিআর ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা। ক্যাম্পের দেড় হাজারেরও বেশি সংখ্যক সদস্যের পাশাপাশি একই স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল জেলা শহরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সাধারণ মানুষেরা। তবে ক্যাম্প স্থাপনের কিছুদিন পর সংবাদ পেয়ে ক্যাম্পে হামলার পাশাপাশি বোমা ও সেল নিক্ষেপ করে হানাদার বাহিনী। এতে অনেকেই নিহত হন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ১৪ ডিসেম্বর একই এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে মিত্রবাহিনীর দুটি ট্রাক উড়ে যায়। তখন প্রায় শতাধিক সেনার মৃত্যু হয়। নিহত মুক্তিযোদ্ধা কিংবা মিত্রবাহিনীর সদস্যদের কবর দেওয়া হলেও অনেকের কবর এখনও চিহ্নিত করা হয়নি। উদ্যোগ নেই মুক্তি সেনাদের ক্যাম্প জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের।

শুধু ঘুঘুডাঙ্গার জমিদারবাড়িই নয়, দিনাজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট ৫৬টি বধ্যভূমি, গণকবর এবং রণাঙ্গনস্থান ও ধ্বংসাবশেষের অংশগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এসব স্থানের সংস্কার, সংরক্ষণ ও সঠিক ইতিহাস নিয়ে লেখার দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ও ইতিহাসবিদরা।

দিনাজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুরে মোট ৫৬টি বধ্যভূমি ও গণকবর রয়েছে। এর মধ্যে সদরে চারটি, চিরিরবন্দরে ছয়টি, পার্বতীপুরে ১২টি, হাকিমপুরে তিনটি, ফুলবাড়ীতে তিনটি, বিরলে পাঁচটি, খানসামায় তিনটি, বিরামপুরে চারটি, ঘোড়াঘাটে ছয়টি, নবাবগঞ্জে চারটি, বীরগঞ্জে চারটি ও সেতাবগঞ্জে দুটি বধ্যভূমি ও গণকবর রয়েছে। তবে এসবের অনেকগুলোই সংরক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেই। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ এসব স্থানগুলো দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধর তথ্য সম্বলিত বিভিন্ন বইয়ের তথ্য, লেখক ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার ৫৬টি বধ্যভূমি ও গণকবরের মধ্যে ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিরলের বহলা গ্রামে হত্যা করা হয় ৪৩ জনকে। পরে স্থানীয়রা একটি কবরে সবাইকে দাফন করে। এই গণকবরের পাশে একটি স্মৃতিমিনার নির্মিত হচ্ছে। ১০ অক্টোবর নবাবগঞ্জ উপজেলার চড়ারহাটে হত্যা করা ১০৫ জনের বধ্যভূমি ও গণকবরের পাশে কিছুদূরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ওই স্থানটি এখনও পুরোপুরিভাবে সংরক্ষিত হয়নি।

২১ নভেম্বর হিলির মুহড়াপাড়ায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যৌথ বাহিনীর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৪৫ জন নিহত হন। স্থানটি বর্তমানে আবাদি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২৩ মার্চ দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে সর্বপ্রথম পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের প্রতিবাদ করায় ৫০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এটিই দিনাজপুরের প্রথম হত্যা। কিন্তু ওই স্থানটিও অরক্ষিত।

৪ ডিসেম্বর বিরামপুর কেটরাহাটে যুদ্ধে ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন, আহত হন অনেকেই। এই উপজেলার গোহাটির কুয়া, ঘাটপাড়া ব্রিজ ও রাইসমিলের কুয়া বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত। তবে এসব স্থান সংরক্ষিত না। ২৮ মার্চ দিনাজপুর মিশন হাসপাতালের পশ্চিম-উত্তরে ব্রিজের কাছে পাঁচ জন তরুণকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। ২৯ ও ৩০ মার্চ জেলায় কিছু বাঙালি ইপিআরকে হত্যা করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে বিজয়ের পরের মাসে। মুক্তিযুদ্ধ শেষে দিনাজপুর শহরের উত্তর বালুবাড়ি মহারাজা স্কুলে স্থাপন করা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ট্রানজিট ক্যাম্প। এখানে অবস্থান নিয়ে প্রায় ৮০০ মুক্তিযোদ্ধা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে মাইন অপসারণ করে জড়ো করেন ওই ক্যাম্পে। ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি ঠিক মাগরিবের নামাজের পর বিস্ফোরণ ঘটে জড়ো করা হাজারো মাইনের। কেঁপে উঠে গোটা দিনাজপুর। প্রাণ হারান সেখানে অবস্থান নেওয়া পাঁচ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। আহত হন কয়েকশ’। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের ছিন্ন ভিন্ন অংশ জড়ো করে সমাহিত করা হয় সদর উপজেলার চেহেলগাজী মাজারে। সেখানে তাদেরকে গণকবর দেওয়া হয়। তবে যেখানে এই বিস্ফোরণ হয়েছিল সেই স্থানটিও সংরক্ষণ হয়নি।

পার্বতীপুর উপজেলার রহমতনগর, ইব্রাহীমনগর, আব্বাসনগর, মুজাফফরনগর, চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দর হাইস্কুল বধ্যভূমি এবং বীরগঞ্জ উপজেলার ভবলদিঘি ও চাতলে যেসব বধ্যভূমি, গণকবর ও মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট ধ্বংসাবশেষ রয়েছে সেগুলোও সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

এছাড়া আওয়ামী লীগ কর্তৃক গোপনে পাঁচ শতাধিক তরুণকে গেরিলা প্রশিক্ষণের বিষয়ে এবং ওই সময়ে স্থানীয় যুবকদের যেসব স্থানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল সেসব চিহ্নিত হয়নি। এর মধ্যে কেবিএম কলেজ ক্যাম্প অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধকালীন রণাঙ্গন স্থান সদর উপজেলার মোহনপুর ব্রিজ, বিরল উপজেলার কাঞ্চন ব্রিজ ও টাঙ্গন নদীর তীর। রণাঙ্গনের স্থান হিসেবে রয়েছে বিরল উপজেলার ফুলবাড়ী রাজারামপুর ব্রিজ।

মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিস্থানগুলোর গুরুত্বের কথা তুলে ধরে স্থানটিকে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে সেই সময়ের মুক্তিযোদ্ধা এবং হামজাপুর ক্যাম্পের যুদ্ধকালীন অপারেশন কমান্ডার লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, যখন পাকিস্তানি বাহিনী দিনাজপুর শহর দখল করে তখন আমরা সামরিক বাহিনীর সদস্য, ইপিআর ও মুক্তিবাহিনীসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করি। ওই সময় হানাদার বাহিনী সেল নিক্ষেপ করে ওই বাড়ি ও স্থানটি ধ্বংস করে দেয়। যুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত এ স্থানটি এখনও অরক্ষিত। স্থানটি সংরক্ষণ করা দরকার। এমন বীরত্বগাঁথা ক্যাম্পের স্থান, গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো অবশ্যই সংরক্ষণ করা উচিত, যাতে করে আগামী প্রজন্ম আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারবে।

দিনাজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন অধ্যাপক ড. মাসুদুল হক। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো সংরক্ষণের প্রচেষ্টা চলছে। আঞ্চলিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে অভিন্ন ও সত্যপ্রতিষ্ঠার বিষয় আছে। জেলার প্রথম সমন্বিত ক্যাম্প দিনাজপুরের ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ি। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের নানান পরিকল্পনা হতো। সেখানে হানাদার বাহিনী আঘাত করেছিল। নতুন প্রজন্মের কাছে সমন্বিত ক্যাম্পের বিষয়টি তুলে ধরা প্রয়োজন। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাসের অনন্য এই স্মারকটি সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক ও গবেষক আজহারুল আজাদ জুয়েল বলেন, আমরা এখনও লিখে যাচ্ছি। যেখানে যেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আছে, গণকবর আছে, বধ্যভূমি আছে, রণাঙ্গন রয়েছে সেসবের তথ্য বই আকারে প্রকাশ করছি এবং আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

সেই সময়ের দিনাজপুর জেলা জয়বাংলা বাহিনীর প্রধান এবং মুজিব ব্রিগেড ও বিএলএফের সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম তালুকদার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ৫ ডিসেম্বরে টাঙ্গন নদীর পাড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল। ওই স্থানের মতো এমন অনেক স্থান রয়েছে যেগুলোর সংরক্ষণ প্রয়োজন। হয়তো স্মৃতিচিহ্ন অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে, তবু যতটুকুই আছে ততটুকুই সংরক্ষিত হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কথা বলবে।