রিকশার প্যাডেলেই ঘোরে সৌরভ বাবুর স্বপ্ন

স্টাফ রিপোটার :নিজের জন্মদাতা মাকে হারিয়েছে দুবছর আগে। মায়ের অসুস্থায় অজুহাতে বাবার সঙ্গে সটকে পড়েন বড় ভাই। সেই মুহূর্তে ছোট্ট শিশু সৌরভ অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। অসহায় শিশু সৌরভের দায়সার দায়িত্ব নেন মামা। বাড়ির পাশে নদীর তীব্র ঢেউয়ে ভাঙনের দৃশ্যের সাথে নিজের এলোমেলো জীবনের অঙ্ক মেলাতে থাকে সৌরভ। কিন্তু প্রতিবারই অঙ্কের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয় সে।

শিশু সৌরভের বাড়ি দিনাজপুরের বিরামপুর পৌরশহরের ছোট যমুনা নদীর কোল ঘেঁষা মাহমুদপুর মহল্লায়। ওর বাবার নাম দুলাল হোসেন (৫০) মা হামিদা বেগমের দুই সন্তানের মধ্যে হামিদুল ইসলাম (২০) বড় এবং সৌরভ বাবু (১২) ছোট।

শিশু সৌরভ বাবুর বয়স ১২ বছর। যে সময়ে এলাকার আট-দশটা ছেলে পড়ার টেবিলে বসে বইয়ের পাতায় নিমগ্ন বা অবসরে পাড়ার ডানপিটে ছেলেরা খোশগল্পে মত্ত, ঠিক সেসময় সৌরভ বাবুর সরু দুইপায়ের নরম তালুর নিচে রিকশার প্যাডেল ঘুরছে! পেছনের সিটে বসে থাকা যাত্রী কখনও বা বলছেন- এই বাবু, একটু জোরে চল! দিনাজপুরের বিরামপুর পৌরশহরের ব্যস্ত রাস্তার ভিড় ঠেলে প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এভাবেই ঘোরে সৌরভ বাবুর রিকশার চাকা।

সৌরবের প্রতিবেশীরা জানান, শিশু সৌরভের বয়স যখন ৭ বছর সেই সময় মা হামিদা বেগমের ডায়েবেটিক রোগে আক্রান্ত হয়। পরে পায়ে ছোট্ট হোচট থেকে বড় এক ঘায়ের সৃষ্টি হয় হামিদা বেগমের পায়ে। অসুস্থ বেশি হওয়ায় বিছানা থেকে উঠতেও পারেন না সৌরভের মা। মায়ের অসুস্থার সুযোগে বাবা দুলাল মিয় ২য় বিয়ে করে জয়পুর হাট জেলার পাঁচবিবি এলাকায় চলে যান। সেই সময় মায়ের পায়ে ঘা পরিস্কার করা, রান্না করা, অসুস্থ মায়ের পায় খানা প্রস্রাবের কাপড় পরিস্কারসহ মায়ের সকল দায় পড়ে শিশু সৌরভের ওপর। বেশ কয়েক বছর ধরে মৃত্যুর সঙে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে দুবছর আগে না ফেরার দেশে চলে যান মা হমিদা বিবি।

মায়ের অসুস্থায় কিছু আগে বড় ভাই হামিদুল ইসলাম বিয়ে করে সংসার নিয়ে আলাদা থাকেন। কিছু দিনের মধ্যে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান সিলেটে। শাখা যমুনা নদীর কোলঘেষে শিশু সৌরভের একমাত্র বাড়িটিও এখন বেদখল। সেই বাড়িতে এখন এক দুঃসম্পর্কের মামা-থাকেন। সেখানেই শর্তসাপেক্ষে আশ্রিত সৌরভ বাবু।

সেই থেকে মা হীন ঘরে সৌরভ একা হয়ে যায়। অবুঝ মনে আপনজনের অভাব তাকে বিচলিত করে তোলে। একদিকে পেটের ক্ষুধা, অন্যদিকে পড়ালেখা। পেটের চাহিদা মেটাতে শিক্ষার চাহিদায় ভাটা পড়ে। প্রাইমারি স্কুলে ৫ম শ্রেণির সিঁড়িতে উঠলেও শেষ মাথায় উঠা আর সম্ভব হয়নি।

বুধবার দুপুর বারোটা। শহরের পল্লবী সিনেমামোড়ের সামনে মহাসড়কে মনের আনন্দে মুখে সিটি বাড়িয়ে রাস্তায় দাড়িঁয়ে থাকা এক ভদ্রলোকে নিকট সৌরভ জানতে চায়, স্যার কোথায় যাবেন। ভদ্রলোক উত্তরে বললেন, না যাবো না। সেখানে কথা হলো সৌরভের সাথে। সৌরভ জানায়, ‘আমি ছোট বলে অনেক মানুষ আমার রিকশায় উঠতে চায় না। ৫ম শ্রেণিতে পড়া লেখা করে আর করতে পারিনি। থাকার, খাবার ঠিকানা নাই। এখন রিকশার প্যডেলের সাথেই ঘোরে আমার জীবনের স্বপ্ন।

সৌরভ জানায়, স্টেশন এলাকা একটি গ্যারেজ থেকে রিকশাটি ভাড়া নেওয়া হয়। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে আড়াই থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। দিনশেষে গ্যারেজ মালিককে দেড়শ টাকা রিকশা ভাড়া দিতে হয়। পকেটে যা থাকে তা দিয়েই হোটেলে দু’বেলা ভাতের বিল ও পকেট খরচ মিটাই।

সৌরভ জানায়, ‘মা-মারা যাবার পর থেকেই আমি একা হয়ে যাই। আমার মায়ের থাকার ঘরটি এখন আমার দুঃসম্পর্কের মামা-মামির দখলে। যতদিন তাদেরকে খাবার খরচ বাবদ চাল ও টাকা দিতাম আমাকে ততদিন ভাত দিতো। টাকা ও চাল দেয়া বন্ধ হলে হলে আমার ভাতও বন্ধ হয়। এখন আমি তাদের সাথে থাকলেও সারাদিন শহরে রিকশা চালাই। হোটেলে খেয়ে শুধু রাতে ওই ঘরে গিয়ে ঘুমাই।

অভিমানের সুরে সৌরভ আরো জানায়, আগে মা, বাবা, ভাই সবাই ছিল কিন্তু কপাল দোষে মা মারা যাবার পর বাবা, ভাই ও সাথে নিজের থাকার জায়গাটিও নেই। গরিবের দিকে কে চোখ তুলে তাকাবে?

প্রতিবেশি সালেহা বেগম বলেন, অল্পবয়সে মাকে হারিয়ে অনেকটাই ভেঙে পড়ে সৌরভ। কোনো কিছুতেই সে মনযোগ দিত পারত না। আমরা আমাদের সাধ্যমত তাকে অনেক বুঝার চেষ্টা করেছি। তাকে সান্তনা দিয়েছি। তার পাশে থাকতে চেয়েছি।

সৌরভের মামা আব্দুর রহিম বলেন, সৌরভের বাবা-মায়ের কোনো নিজস্ব জমাজমি নেই। তারা যে বাড়িতে থাকতো সেটিও অন্যের জমির উপর তৈরি করা। সৌরভের থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব আমি নিতে চাইলেও সৌরভ তাতে রাজি হয়নি। সৌরভ তার নিজের মতো করে চলতে চায়।

সৌরভের বিষয়ে কথা হলে বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পরিমল কুমার সরকার বলেন, এমনিতেই শিশু শ্রম সরকার অবৈধ করেছে। তার পরেও সৌরভ রিকশা চালায় এ বিষয়টি আমার জানা নেই। নিশ্চয় এই অমানবিক। তার সম্পর্কে ভালো করে খোঁজখরব নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।