বাংলাদেশের ৩ দাবির কোনোটিই মানেনি পাকিস্তান

মিরর ডেস্ক : স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কয়েকটি বিষয় বড় আকারে আলোচনায় আসে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতর জন্য পাকিস্তানের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা, সম্পদের সম বণ্টন এবং আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন। পাকিস্তানের অনাগ্রহের কারণে এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে বিষয়গুলো। বাংলাদেশ বিভিন্ন বৈঠকে বিষয়গুলো আলোচনা করলেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কখনও কোনও আগ্রহ দেখা যায়নি।

নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ৫০ বছর পরও ক্ষমা প্রার্থনার নজির আছে। কিন্তু পাকিস্তান এ নিয়ে উদাসীন। পাকিস্তান ক্ষমা প্রার্থনা করবে এমন একটি বিষয় ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে পরিষ্কার উল্লেখ থাকলেও সেটা মানেনি দেশটির কোনও সরকারই।

১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এবং পাকিস্তান সরকারের গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট পর্যালোচনা করলেও ক্ষমার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সরকারের পক্ষ থেকে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার জন্য নিন্দা ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করবে। একই চুক্তির ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করে বাংলাদেশের জনগণকে অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমার আবেদন করবেন।

এপ্রিলে চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার দুই মাস পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো বাংলাদেশ সফরের সময় পাকিস্তান সেনাদের ধ্বংসযজ্ঞের দায় নেননি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি।

পাকিস্তান সরকারের গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট সম্পূর্ণ অংশ প্রকাশ করা না হলেও যতটুকু প্রকাশ হয়েছে তাতে ক্ষমা চাওয়া ও বিচারের বিষয়টি উল্লেখ আছে।

পাকিস্তানের ক্ষমা না চাওয়ার বিষয়টি তাদের সরকারি নীতির অংশ। এজন্য এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে পাকিস্তানি দৈনিকগুলোতেও কোনও বাণী প্রকাশ করতে দেয়নি দেশটির বিগত ও বর্তমান সরকার।

সম্পদের সম বণ্টন

১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী সাইক্লোনের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের সহায়তার জন্য ২০ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা দেওয়া হয়। এর পুরোটা বাংলাদেশের জনগণের জন্য হলেও এক টাকা বাংলাদেশকে দেয়নি পাকিস্তান। এছাড়া ৪৩২ কোটি ডলার সমমূল্যের সম্পদ চিহ্নিত করা হয়, যা দুই দেশের মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার কথা। কিন্তু এ বিষয়েও এখন পর্যন্ত পাকিস্তান কোনও সাড়া দেয়নি।

পাকিস্তান আমলে সবচেয়ে বেশি রফতানি আয় আসতো পাট থেকে, যার পুরোটাই বাংলাদেশে উৎপাদিত হতো। কিন্তু এর সব টাকাই ব্যয় হতো পাকিস্তানের উন্নয়নে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কোনো টাকাই আসতো না।

সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ‌্যে একাধিকবার আলোচনা হলেও কখনও কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি পাকিস্তান। ১৯৯৭ সালে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার সময় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয় বাংলাদেশের এই দাবি বন্ধুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করবে না দেশটি।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্পদ বণ্টনের জন্য চারটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ সালে জনসংখ্যার অনুপাত; সমতার অনুপাত; মোট বৈদেশিক সম্পদে কার অবদান কতটুকু এবং দুই দেশের সম্পদের অনুপাত। কিন্তু এ সবে গা করেনি পাকিস্তান।

আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন

স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশে আটকে পড়া অনেক অবাঙালি পাকিস্তানে ফেরত যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে। ওই সময় রেডক্রসের জরিপে ৫ লাখ ৪০ হাজার এমন মানুষ ছিল যারা পাকিস্তানে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। পরে ওই ব্যক্তিদের ১৩টি জেলায় ৭০টি ক্যাম্পে রাখা হয়। বর্তমানে ক্যাম্প সংখ্যা ৬৬।

১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালের দুটি চুক্তিতে বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তানি এবং পাকিস্তানে অবস্তিত বাংলাদেশিদের প্রত্যবাসনের বিষয়টি পরিষ্কার বলা হয়েছে। পাকিস্তান প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ৪৮ হাজার জনকে ফেরত নেওয়ার সম্মতি দিলেও তারা ফেরত নিয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার। এই লোকগুলো ফেরত যাওয়ার পর পাকিস্তানি দাবি করা শুরু করে চুক্তিতে যে পরিমাণ লোকের উল্লেখ আছে তার চেয়ে বেশি লোক তারা নিয়েছে।

পাকিস্তানের এমন অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে আটকে পড়া চার লাখ পাকিস্তানির ফেরত যাওয়ার বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমরা আমাদের দাবি সবসময়ে করেছি এবং এটি অব্যাহত থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘এখন পাকিস্তানিদের এ বিষয়ে সাড়া দিতে হবে।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী যারা পাকিস্তানে ফেরত যেতে চায় তারা বাংলাদেশের নাগরিক নয় এবং তাদেরকে ফেরত পাঠানোর জন্য সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত আছে।