দিনাজপুরের চার উপজেলা মুক্ত হয় এই দিনে

স্টাফ রিপোটার : দিনাজপুরের বীরগঞ্জ, বোচাগঞ্জ, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলা মুক্ত দিবস আজ (৬ ডিসেম্বর)। এই চার উপজেলায় দিবসটি পালনের লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, মিলাদ মাহফিল ও আলোচনা সভা।

বীরগঞ্জ
এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বীরগঞ্জকে শক্রমুক্ত করেন মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যোদ্ধারা। পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও জেলা ৩ ডিসেম্বর শক্রমুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সৈয়দপুর (পাকবিহার) অভিমুখে পালিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

হানাদার বাহিনী বীরগঞ্জ থেকে পিছু হটে বীরগঞ্জ-কাহারোল উপজেলা সীমান্তে দিনাজপুর-পঞ্চগড় মহাসড়কে ভাতগাঁও ব্রিজের পূর্বপ্রান্তে অবস্থান নেয়। এখানে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের সাথে মুক্তিবাহিনীর তুমুল যুদ্ধে ভাতগাঁও ব্রিজের একাংশ ভেঙে যায়। যুদ্ধে বেশ কয়েকজন মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর বীরযোদ্ধা শহীদ হন।

৫ ডিসেম্বর বিকেল ৪টায় মিত্রবাহিনীর বিমান হামলার মধ্যে দিয়ে বীরগঞ্জ শক্রমুক্ত হতে থাকে। রাতেই পুরো এলাকা মুক্তি ও মিত্রবাহিনী পুরোপুরি দখল করে নেয়। সকালে বীরগঞ্জের অলিগলির মুক্তবাতাসে ওড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

বোচাগঞ্জ
১৯৭১ সালের এই দিনে বোচাগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে শত্রুমুক্ত করেছিলেন বোচাগঞ্জের মাটি।

দীর্ঘ নয় মাসের লড়াই-সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করেন বোচাগঞ্জের কৃতিসন্তান সাবেক প্রতিমন্ত্রী তৎকালীন তাজউদ্দীন সরকারের বিশেষ দূত, আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, প্রয়াত জননেতা আব্দুর রউফ চৌধুরী ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর মরহুম আনোয়ারুল হক চৌধুরী নবাব।

এছাড়া বোচাগঞ্জের ১১৫ জন দামাল ছেলে ও একজন আনসার সদস্যসহ মোট ১১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে বোচাগঞ্জকে হানাদারমুক্ত করেন। সম্মুখযুদ্ধে ধনতলা গ্রামের আব্দুর বারেক ও এনামুল হক, কাঁকদুয়ার গ্রামের চিনিরাম দেবশর্মা, বিহাগাঁও গ্রামের কাশেম আলী, রণগাঁও ইউনিয়নের ধনঞ্জয়পুর গ্রামের গুলিয়া বাংরু, বনকোট চুনিয়াপাড়া গ্রামের বীর্যমোহন রায়সহ সর্বমোট ১৩ জন মানুষ শহীদ হন।

বিরামপুর
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৭ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন মুক্তিযোদ্ধা অন্যতম বীরসেনানি যথাক্রমে মেজর নাজমুল হুদা ও মেজর নুরুজ্জামান। তাদের নেতৃত্বে বিরামপুরে দেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা বিরামপুরকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ঘোড়াঘাট রেলগুমটি, কেটরা শালবাগান, ভেলারপাড় ব্রিজ, ডাকবাংলা, পূর্ব জগন্নাথপুর মামুনাবাদ বাঙ্কার বসিয়ে সতর্ক অবস্থায় থাকতেন।

পাকিস্তানি সেনারা ৪ ডিসেম্বর পাইলট স্কুলের সম্মুখে ও ঘাটপাড় ব্রিজে প্রচণ্ড শেলিং করে ভাইগড় গ্রাম দিয়ে তীরমনিতে শেল নিক্ষেপ করে। লোমহর্ষক ও সম্মুখযুদ্ধে কেটরা হাটে ১৬ মুক্তিযোদ্ধাসহ সাত পাকিস্তানি সেনা নিহত ও শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেন। এতে উপজেলার ২০ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, পঙ্গু হন দুজন, মারাত্মকভাবে আহত হন ১৩ জন।

নবাবগঞ্জ
১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর দখল থেকে আজকের দিনে ভোরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী নবাবগঞ্জ উপজেলা এলাকাকে পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত করেন।

নবাবগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. এখলাছুর রহমান জানান, টানা নয় মাস যুদ্ধ চলাকালে আজকের দিনে ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা শাহ মাহফুজার রহমান, শামসুল আরেফিন, মকবুল হোসেনসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর তীব্র আক্রমণের শিকার হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আক্রমণে পিছু হটতে থাকে হানাদার বাহিনী।

একপর্যায়ে উপজেলার ভাদুরিয়া নামক স্থানে পাকিস্তানি হানাদারদের সাথে মিত্রবাহিনীর তুমুল লড়াই হয়। সেখান থেকে হানাদাররা মিত্রবাহিনীর নিকট পরাজিত হওয়ার আশঙ্কায় পিছু হটতে হটতে ঘোড়াঘাট এলাকায় যায় এবং নবাবগঞ্জ উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়।