তারেক মাসুদ: ৬৪তম জন্মদিনে অন্তর্জালে বিশেষ আয়োজন

মিরর বিনোদন : নন্দিত নির্মাতা তারেক মাসুদের ৬৪তম জন্মদিন আজ (৬ ডিসেম্বর)। ১৯৫৬ সালের এই দিনে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ক্ষণজন্মা এই নির্মাতা।

এদিনকে ঘিরে তরুণ নির্মাতাদের নিয়ে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতা। যার মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়েছে সেরা ১০টি চলচ্চিত্র।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছে প্রতিযোগিতার আয়োজক তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট সূত্র। এটি সহযোগিতায় আছে ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি ও ইমেশন ক্রিয়েটর। এর আগে চলচ্চিত্রগুলো একটি মিলনায়তনে প্রদর্শনের কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এটি হচ্ছে অন্তর্জালে।
প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত স্বল্পদৈর্ঘ্যগুলো হলো, ৪০৪ এরর, আগুয়ান, বিফোর দ্য ল, বায়োস্কোপ, ইন্টারভ্যাল, লটারি, মিনিয়াং, নাথিং হ্যাপেন্ড দ্যাট নাইট এবং দ্য এন্ডলেস সার্কেল।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, আজ (৬ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় এই ১০টি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী হবে আয়োজনের নামে খোলা ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে।
এদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে হবে তারেক মাসুদের জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা সভা। এরপর হবে প্রতিযোগিতার ১ম ও ২য় রানার্সআপসহ সেরা চলচ্চিত্রের নাম ঘোষণা। জানালেন ইমেশন ক্রিয়েটরের প্রধান ও আয়োজনের অন্যতম বিচারক নির্মাতা প্রসূন রহমান।

তিনি বলেন, ‘‘জীবন ঘনিষ্ঠ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নির্মাতা হিসেবে তারেক মাসুদ নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ দিতেন সবসময়। তাই ‘রিলে-রেস’-এর মতো করে পূর্বসূরিদের কাজকে এগিয়ে নেওয়ার কথা যেমন ভাবতেন, তেমনি পরবর্তী প্রজন্মকেও অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্যে প্রস্তুত করে তুলতেন। সেই ভাবনা থেকেই জন্মদিনে এই চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিযোগিতা।’’
জানা যায়, চতুর্থবারের মতো আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় মোট ৫৭টি চলচ্চিত্র জমা পড়েছিল।

প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে আছেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ। আরও আছেন মোরশেদুল ইসলাম, খুশী কবির, প্রসূন রহমান ও বেলায়াত হোসেন মামুন।

প্রসঙ্গত, তারেক মাসুদ ১৯৮২ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স শেষ করে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আদম সুরত’ নামের এই প্রামাণ্যচিত্রটি ছিল প্রখ্যাত বাংলাদেশী শিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের ওপর। এটি নির্মাণ করতে লেগেছিল সাত বছর। এরপর থেকে তিনি বেশ কিছু ডকুমেন্টারি, অ্যানিমেশন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

১৯৯৬ সালে নির্মাণ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একটি ভ্রাম্যমাণ গানের দলকে নিয়ে ‘মুক্তির গান’। ১৯৭১ সালে মার্কিন নির্মাতা লেয়ার লেভিনের ক্যামেরাবন্দী ফুটেজের সাথে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংরক্ষণাগার থেকে নেওয়া ফুটেজ জুড়ে দিয়ে এই ছবিটি নির্মাণ করা হয়। প্রামাণ্যচিত্রটির জন্য তিনি ১৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার লাভ করেন।
২০০২ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ মুক্তি পায়। ছবিটি তার শৈশবে মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত। এটি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং দেশে-বিদেশে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে। চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং ‘একটি দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের হৃদয়স্পর্শী ও স্বচ্ছ উপস্থাপনা’র জন্য তারেক মাসুদ ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট লাভ করেন। এই ছবির জন্য তিনি ২৭তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের পুরস্কারও লাভ করেন। এছাড়া মারাকেচ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ক্যাথরিন মাসুদের সাথে যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরস্কার লাভ করেন ও গোল্ডেন স্টারের মনোনয়ন লাভ করেন এবং কেরালা চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন ক্রো ফিজেন্ট পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। ছবিটি বাংলাদেশ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় নিবেদন করা দ্বিতীয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র (প্রথমটি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’) এবং প্রথম বাংলাদেশী বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র ছিল ‘মাটির ময়না’।

তার পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘অন্তর্যাত্রা’ (২০০৬) দুটি প্রজন্মকে তুলে ধরেছে সেলুলয়েডে, যারা বাংলাদেশ থেকে লন্ডন চলে যায় এবং পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসে। ২০১০ সালে তিনি দেশে ছড়িয়ে পড়া জঙ্গিবাদ ও এর প্রভাব নিয়ে নির্মাণ করেন ‘রানওয়ে’। এতে দেখানো হয় এক যুবককে ইসলামী শিক্ষার আড়ালে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার গল্প। ছবিটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য মেরিল-প্রথম আলো সমালোচক পুরস্কার লাভ করেন। তারেক মাসুদের শেষ অসম্পূর্ণ কাজ ‘কাগজের ফুল’। ছবিটি ভারত বিভাগের গল্প নিয়ে। এটি ‘মাটির ময়না’র পূর্ববর্তী পর্ব হিসেবে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন তারেক মাসুদ। যদিও তার আগেই এক সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটেছে তার অকাল প্রস্থান।
বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সংগঠন শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তারেক মাসুদ। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেয়ার পাশাপাশি কয়েকটি সাময়িকী ও পত্রিকায় চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখালেখিও করতেন।

২০১১ সালের ১৩ অগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মারা যান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিশুক মুনীর। তারেক ও মিশুককে বহনকারী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে চুয়াডাঙ্গাগামী একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। তাতে তারেক-মিশুকসহ মাইক্রোবাসের পাঁচ আরোহী নিহত হন।