টেলিমেডিসিনের দারুণ ভবিষ্যৎ, বাজার এখন ৮ হাজার কোটি টাকার

মিরর ডেস্ক : স্বাভাবিক সময়ে ঘরে বসে ডাক্তার দেখানোর কথা ভাবতেই পারেননি অনেকে। করোনা বদলে দিলো সেই চিত্র। এখন দূরের গ্রামে বসেও দেখানো যাচ্ছে ঢাকার ডাক্তার। সরাসরি ডাক্তারের সঙ্গে ভিডিও কল বা তৃতীয় কোনও প্রতিষ্ঠানের অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে এ সেবা। ক্রমে বড় হচ্ছে দেশের টেলিমেডিসিন বাজার।

অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ফেসবুক মেসেঞ্জারেও চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে ডাক্তারের পরামর্শ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অনেক চিকিৎসক নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন ভয়েস ও ভিডিও কলে। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার ব্যবহার করেও রোগী দেখার কথা জানা গেছে।

করোনা সংক্রমণে সংকট তৈরি হয় রোগীদের চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ পাওয়া নিয়ে। তখন টেলিমেডিসিন প্রযুক্তি এগিয়ে আসে। দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছিল।  করোনাকালে তাদের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। সরকারও উদ্যোগী হয়ে আরও বড় পরিসরে টেলিমেডিসিন সেবা দিতে শুরু করে।

জানা গেছে, দেশে এখন ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সরকারের স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩, লাইফস্প্রিং, অর্ক হেলথ লিমিটেড, সিনেসিস হেলথ, টনিক, ডিজিটাল হেলথ, প্রাভাহেলথ ইত্যাদি। এরমধ্যে স্বাস্থ্য বাতায়ন ২০১৫ সাল থেকে সেবা দিচ্ছে। করোনাকালে সেবাগ্রহণকারী গ্রাহক বেড়ে যায়। এখন প্রতিদিন এই কলসেন্টারে কলের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি।

টেলিমেডিসিন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অর্ক লিমিটেড সামাজিক সেবা কার্যক্রমের আওতায় করোনা দুর্যোগকালীন কয়েক হাজার রোগীকে অর্ক অ্যাপ ব্যবহার করে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার পরামর্শ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সূত্রে জানা গেছে, অর্ক অল অ্যাপে যেকোনও মুহূর্তে সরাসরি অভিজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে চ্যাট করে, ভয়েস বা ভিডিও কলে কথা বলে প্রাথমিক পরামর্শ নেওয়া এবং সরাসরি ডাক্তার দেখানোর জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক টেস্ট রিপোর্ট আপলোড করা, একই ডাক্তারের ফলোআপ কনসালটেশনসহ স্বাস্থ্যসেবার ওয়ান স্টপ সলিউশন সেবা দেয়।  প্রতিষ্ঠানটিতে ডাক্তারের পরামর্শ সম্পূর্ণ ফ্রি। বর্তমানে অর্ক অ্যাপে নিবন্ধিত ডাক্তারের সংখ্যা সহস্রাধিক।

অর্ক’র সেবা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির হেড অব টেকনোলজি মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকের অপর্যাপ্ততা ও প্রান্তিক মানুষের সামর্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে টেলিমেডিসিন সেবার এই উদ্যোগ। এখন যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসকরা গ্রামীণ রোগীদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে কথা বলে ও ভিডিও দেখে পরামর্শ দিতে পারছেন। ‘স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজ করে দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য’, বলেন আরিফুল ইসলাম।

লাইফস্প্রিংও টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, করোনাকালে মানুষের হতাশা, উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এই সময়ে টেলিমিডিসিন সেবা গ্রহণে মানুষ আগ্রহী হওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করে, এর গোপনীয়তা এবং বাসা থেকেই এই সেবা গ্রহণের সুবিধা থাকায়। এই ব্যবস্থা শুরু হওয়ার আগে শতকরা ৯০ শতাংশ রোগী শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়ে সেবা নিতেন। বর্তমানে শতকরা ৮০ ভাগ রোগীই অনলাইনে সেবা নিচ্ছেন। তারা মনে করেন, করোনাকালে টেলিমিডিসিন সেবার একটি বড় উত্থান হয়েছে।

লাইফস্প্রিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইয়াহিয়া আমিনের মতে, আমাদের এখন ৩০ শতাংশ রোগী দেশের বাইরের। যেমন- ভারত, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ থেকে অনলাইনে আমাদের সেবা নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘লাইফস্প্রিং ইন্টারনাল মেডিসিন, ডার্মাটোলজি, পেডিয়াট্রিক, সাইকিয়াট্রি ও সাইকোলজি, সেক্সুয়াল মেডিসিন, গাইনোকোলজি বিষয়ে সেবা দিচ্ছে। লাইফস্প্রিংয়ের ইউটিউব চ্যানেলের গ্রাহক সংখ্যা দুই লাখের বেশি। আর ফেসবুক পেজের ফলোয়ার প্রায় চার লাখ।’

সরকারের স্বাস্থ্য বাতায়নের কলসেন্টার দেখভাল করে সিনেসিস হেল্থ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনাকালে স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে (৮ মার্চ থেকে ২৭ নভেম্বর) ১ কোটি ৫ লাখের বেশি মানুষকে সেবা প্রদান করা হয়েছে।  এছাড়া করোনার জন্য বিশেষায়িত কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টার থেকে ডক্টর অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ১৪৩ জনকে,  ফলোআপ করা হয়ছে ২ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৫ জন এবং ইনবাউন্ড হেলথ অ্যাডভাইসরি সার্ভিস দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ২০২ জন রোগীকে। এছাড়া মা-টেলিহেলথ সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭০ মা ও শিশুকে সেবা প্রদান করা হয়েছে। তিনি জানান,  তার প্রতিষ্ঠান সব স্তরের মানুষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে, যা উপরে উল্লেখিত সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায়। তিনি আরও জানান, তাদের সেবা মানবিক সেবা হিসেবে সবার কাছে গৃহীত হয়েছে।

এ বিষয়ে সফটওয়্যার ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বেসিসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘এর বড় লাভ হলো গ্রামে বসেও একজন রোগী রাজধানীর বড় কোনও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছেন। রোগীর ভোগান্তি ও খরচ কমছে।’

বেসিস সভাপতি বলেন, ‘টেলিমেডিসিন সেবার পরিসর আরও বাড়বে। বড় বড় হাসপাতালগুলো এ সেবা চালু করেছে। তবে সাফল্য পেতে হলে কম দামে দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। এটা করা না গেলে ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। মোবাইল ডাটায় বেশি খরচ হয়ে গেলে রোগী আর ওই পথে যেতে চাইবে না।’

টেলিমেডিসিন সেবাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বেসিস সভাপতি বলেন, ‘গ্রাহকের সব তথ্য আপনাদের কাছে। এসব তথ্য কোথাও না কোথাও আপনারা সংরক্ষণ করছেন। এসব তথ্য সাবধানে রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, তথ্য যেন বেহাত না হয়।’

টেলিমেডিসিনের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘এখন প্রত্যেক হাসপাতালের উচিত হাইব্রিড ব্যবস্থায় চলে যাওয়া। বাংলাদেশে টেলিমেডিসিনের বাজার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার। প্রতিদিন ১৫ হাজারের বেশি রোগী টেলিমেডিসিন সেবা নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা প্রদানেরও দ্বার উন্মোচিত হবে।’
টেলিমেডিসিন সেবার বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩-১ নম্বরে দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে শুধু করোনা সম্পর্কিত প্রায় ৩৯ লাখ কল গ্রহণ করা হয়েছে। নাগরিকরা ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সেবা পেতে ১ চেপে মেন্যুতে প্রবেশ করে ঘরে বসেই নিরাপদে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারছেন।  ইতোমধ্যে টেলিমেডিসিন সেবা পেতে এই হেল্পলাইনে ২২ লাখ ৪৬ হাজারেরও অধিক কলের মাধ্যমে নাগরিকরা সেবা গ্রহণ করেছেন।’ এছাড়া সরকারের আরও অন্যান্য উদ্যোগের মাধ্যমেও নাগরিকরা টেলিমেডিসিন সেবা পেয়েছেন বলে তিনি জানান।