সিলেট এমসি কলেজে ধর্ষণ: ৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল

সিলেট : অনেক জল্পনা-কল্পনা ও সংশয়ের পর অবশেষে দীর্ঘ ৬৮ দিন পর সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে নববধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ।

এর আগে, বুধবার রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেছিলেন, বৃহস্পতিবার সকালে আদালতে অভিযোপত্র প্রদান করা হবে। পরে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ)-এর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং দেয়া হবে।

গত ৩০ নভেম্বর ধর্ষণের ঘটনার ডিএনএ প্রতিবেদন আদালতের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এসে পৌঁছে। ডিএনএ প্রতিবেদনে ধর্ষণের সাথে প্রধান আসামী সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি ও অর্জুন লস্করের সম্পৃক্ততা সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে। অপর আসামি আইন উদ্দিন ও রাজনের মিশ্র প্রমাণ পাওয়া যায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার পরিদর্শক ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য জানান, ধর্ষণের ঘটনায় এই চারজন সহ ৮ জন জেল হাজতে রয়েছেন। গ্রেফতার হওয়া ৮ জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গত ১ অক্টোবর ও ৩ অক্টোবর ২ দিনে এ গ্রেপ্তার ৮ জনের ডিএনএ নমুনা সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংগ্রহের পর ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হয়। ডিএনএ রিপোর্ট না পাওয়ার কারণে অভিযোগপত্র আটকে থাকার কথা জানান পুলিশ কর্মকর্তারা। ডিএনএ রিপোর্ট দেরীতে আসা নিয়ে সিলেটে নানা সংশয় ও সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয়রা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের বালুচর এলাকার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ওই তরুণী (২৫)। বন্ধ থাকা ছাত্রাবাসে তুলে নিয়ে স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে ধর্ষণ করা হয়। এসময় তাদের মারধর করে টাকাপয়সাও ছিনিয়ে নেয় ধর্ষকরা। ঐ রাতেই নির্যাতিতার স্বামী বাদী হয়ে নগরীর শাহপরান থানায় মামলা করেন। এ ঘটনার পর দেশজুড়ে ধর্ষণ-বিরোধী তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। জনমতের চাপ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ধর্ষণ-বিরোধী আইনও সংশোধন করে সরকার।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে নববিবাহিত স্ত্রীকে প্রাইভেটকারে করে হযরত শাহপরান (র.) এর মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন ঐ দম্পতি। ফেরার পথে সন্ধ্যার দিকে টিলাগড়ে এমসি কলেজের মূল ফটকের সামনে গাড়ী থামিয়ে স্বামী পাশের দোকানে গেলে ফিরে এসে দেখেন কয়েকজন যুবকের তার স্ত্রীকে ঘিরে ধরেছেন। এক পর্যায়ে তারা প্রাইভেটকারসহ ঐ দম্পতিকে জোর করে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায় তরুণরা। এরপর যুবককে আটকে রেখে তার স্ত্রীকে প্রাইভেটকারের মধ্যেই ধর্ষণ করে ৫-৬ জন। পরে প্রাইভেটকারটি আটকে রাখে।

ছাত্রাবাস থেকে ছাড়া পেয়ে টিলাগড় পয়েন্টে এসে পুলিশকে ফোন করেন নির্যাতিতার স্বামী। পরে পুলিশ গিয়ে ছাত্রাবাস থেকে ওই দম্পতির প্রাইভেটকার উদ্ধার করে এবং নির্যাতিতা তরুণীকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি-তে ভর্তি করা হয়। ঐ সময় পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। রাতেই ৬ জনের নাম উলে­খ করে ও অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জনকে আসামি করে শাহপরান থানায় মামলা দায়ের করেন নির্যাতিতার স্বামী।

ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। ঘটনার বিচার ও নারী নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে রাস্তায় নামে সাধারণ মানুষ। তারা আসামিদেও গ্রেফতার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

এ মামলায় আসামিরা হচ্ছে- সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার মো. জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), জকিগঞ্জের আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৫), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম (২৫) ও কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুমকে (২৫)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও তিনজনকে আসামি করা হয়।

আসামিরা পালিয়ে গেলেও ঘটনার ৩ দিনের মধ্যে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে এজাহারভুক্ত আসামি সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম তারেক, মাহবুবুর রহমান রনি, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুম এবং সন্দেহভাজন আসামি মিসবাউর রহমান রাজন ও আইনুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কোনো পদে না থাকলেও গ্রেপ্তার হওয়া সকলেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত বলে স্থানীয় ও কলেজ সূত্রে জানা যায়।

গ্রেফতারের পর তাদের প্রত্যেককে ৫ দিন করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষে সকলেই ধর্ষণের দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এদিকে, গণধর্ষণের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ইতোমধ্যে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও মহিউদ্দিন শামিম গঠিত বেঞ্চে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। গণধর্ষণের এ ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে ২৬ অক্টোবর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে সূত্র জানায়।

অন্যদিকে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত চার আসামীরা ছাত্রত্ব এবং সার্টিফিকেট বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের স্থায়ীভাবে এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কারও করা হয়। বহিষ্কৃতরা হচ্ছেন, সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাসুম ও রবিউল হাসান। ঘটনার কয়েকদিন পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে গণধর্ষণের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি এমসি কলেজে তদন্ত শেষে সেই প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে বলে সূত্রটি জানায়।