‘ভাসানচরে সুবিধা বেশি, তাই সেখানে যাচ্ছি’

মিরর ডেস্ক : ভাসানচরের পরিবেশ আর কক্সবাজারের ক্যাম্পের পরিবেশের মধ্যে ফারাক বিস্তর। কক্সবাজার ক্যাম্পে থাকতে হয় কাচা ঘরে গাদাগাদি করে। বাইরের পরিবেশও ভালো না। লাখ লাখ মানুষ এক জায়গায় থাকলে সমস্যার অন্ত নেই। ছেলেপুলে একটু স্বস্তিতে খেলাধুলা করবে, সে উপায়ও নেই।

অন্যদিকে ভাসানচরে ব্লকের তৈরি বাসভবনগুলো কেবল দৃষ্টিনন্দনই নয়, সেখানে পয়নিঃষ্কাষণ থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা বেশি। সবুজ প্রকৃতিতে স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পাবে সবাই।

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত ৩৪টি ক্যাম্প থেকে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বুধবার (৩ ডিসেম্বর) দুপুরে কক্সবাজার ক্যাম্প থেকে ২০টি বাসে করে ৯২০ জন রোহিঙ্গাকে নিয়ে শুরু হয় যাত্রা। সন্ধ্যায় তারা পৌঁছে চট্টগ্রামের ট্রানজিট পয়েন্টে, যেখান থেকে জাহাজে করে তাদেরকে পাঠানো হয়েছে ভাসানচরে।

শুক্রবার (৪ ডিসেম্বর) আরও সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেয়া হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে বলে জানা গেছে।

২০১৭ সালের আগস্টে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ আসার পর থেকে কক্সবাজারের বালুখালী ক্যাম্পে ছিলেন আয়শা বেগমের পরিবার। সেখানে বিনামূল্যে খাবার, চিকিৎসাসহ নানা আয়োজন ছিল। তবে ক্যাম্পের ঘিঞ্জি পরিবেশ, আয়ের সুনির্দিষ্ট উৎস না থাকাসহ নানা কারণে বিরক্ত ছিলেন এই নারী। তাই ভাসানচর যাওয়ার প্রস্তাব আসার পর লুফে নেন।

কেনো ভাসানচর যাচ্ছেন জানতে চাইলে আয়শা বলেন, ‘ভাসানচর গেইলি টিয়া হামাইত পাইজ্জুম। এতাল্লাই এন্ডে যাইর। ক্যাম্পত বেশি সুযোগ নাকি এন্ডে (ভাসানচরে গেলে নাকি আয় রোজগার করা যাবে। সেখানে নাকি বালুখালী ক্যাম্প থেকেও বেশি সুবিধা পাব। এজন্য ভাসানচর যাচ্ছি)।

আয়শা বেগম বলেন, ‘ক্যাম্পত মাইনষের টিয়া দিয়েরে চলন পরে। এল্লে আর হদিন চল্লুম। এহতল্লাই ভাসানচর যাইরগয় (ক্যাম্পে মানুষের টাকা দিয়ে চলতে হয়। এভাবে আর কত দিন চলব? তাই ভাসানচর চলে যাচ্ছি)।’

ভাসানচরের প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৮ সালে। দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেড় হাজার একতলা ভবন তৈরি করা হয়েছে। আরও আছে ১২০টি বহুতল ভবন, যা সাইক্লোন আশ্রয় কেন্দ্র ও অন্যান্য সময় অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

ভাসানচরে স্কুল, সেখানে স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, হাসপাতাল করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আছে সোলার পাওয়ার। জেনারেটরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। রান্নার জন্য সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থাও থাকবে।

সেখানে রোহিঙ্গাদের আয়বর্ধকমূলক নানা প্রকল্পও নেয়া হয়েছে। খামারের কাজ, হাতের কাজ ছাড়াও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকবে। ফলে আয় করতে পারবে রোহিঙ্গারা।

সমাজকল্যাণ উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারপারসন জেসমিন প্রেমা জানান, শুধুমাত্র আগ্রহী রোহিঙ্গাদের ভাসানচর নেয়ার কাজ করছে সরকার এবং ২২টি উন্নয়ন সংস্থা। তাদের স্থানান্তরের জন্য অর্গানাইজড হয়ে কাজ করছে সরকার। এসব রোহিঙ্গা জাহাজে উঠার পূর্বে বিভিন্ন ডাটা এন্ট্রি সাপেক্ষে বরাদ্দকৃত আশ্রয়ণের টোকেন ও চাবি হস্তান্তর করা হবে বলে তিনি জানান।

তিনি জানান, দ্বীপটি বাসস্থানের উপযোগী করা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বনায়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনী। সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য আধুনিক বাসস্থান ছাড়াও বেসামরিক প্রশাসন ও আবাসিক ভবন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ভবন, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও খেলার মাঠ গড়ে তোলা হয়েছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সেখানে মহিষ, ভেড়া, হাঁস, কবুতর পালন করা হচ্ছে। আবাদ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি। পরীক্ষামূলকভাবে ধান চাষও করা হচ্ছে।

প্রকল্পটিতে যেন এক লাখ এক হাজার ৩৬০ জন শরণার্থী বসবাস করতে পারেন সে লক্ষ্যে গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়েছে। ১২০টি গুচ্ছগ্রামে ঘরের সংখ্যা এক হাজার ৪৪০টি। রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবায় দুটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল এবং চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে থেকে ছিল আরও প্রায় চার লাখ। বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে ৩৪টি ক্যাম্পে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তি হলেও মিয়ানমারের অনাগ্রহের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। দুই বার প্রত্যাবাসনের খুব কাছাকাছি গিয়েও এক জন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো যায়নি মিয়ানমারের কারণে।

কক্সবাজার ক্যাম্পে ঘিঞ্জি পরিবেশ, ভূমিধসের আশঙ্কা, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা কারণে সেখানে ভিড় কমাতে উদ্যোগ নেয় সরকার। যদিও বেশ কিছু এনজিও ও বিদেশি সংস্থার কারণে রোহিঙ্গাদেরকে স্থানান্তরে রাজি করানো যাচ্ছিল না। তবে সেপ্টেম্বরের শুরুতে একজন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরের সুযোগ-সুবিধা দেখিয়ে আনার পর একটি অংশ সেখানে যেতে রাজি হয়।