এত ধাক্কাধাক্কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

আবদুল মান্নান :

ইদানীং জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিদিন কোনও না কোনও রাজনৈতিক হোন্ডাপার্টির মানববন্ধনের নামে সমাবেশ হয়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ‘শেখ হাসিনার সরকারকে ফেলে দেওয়া’। এর বাইরে তারা সুযোগ পেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও জড়ো হয় সমমনাদের অন্য কোনও সমাবেশে। এসব সমাবেশ বর্তমানে অনেকটা এক সময়ের রাস্তার পাশে ওষুধ বিক্রি অথবা বানর নাচের অবয়ব ধারণ করেছে। সমাবেশে অংশগ্রহণকারী দর্শক শ্রোতার তেমন কোনও পরিবর্তন নেই। শুধু পেছনের বা সামনের ব্যানারের পরিবর্তন। বক্তব্য বা শ্লোগানেরও তেমন একটা পরিবর্তন নেই। ‘একটু ধাক্কা দিলেই সরকার পড়ে যাবে’– একজন তো স্বনামধন্য ব্যক্তি আছেন যিনি যে কারও ডাকে এসব সমাবেশে গিয়ে প্রতিদিন সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য ধাক্কাধাক্কি করেন, যদিও তার পেশার কারণে তিনি বেশ ভালো করেই জানেন ধাক্কাধাক্কি তার নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্যও দারুণ ক্ষতিকর। এই ব্যক্তি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এক সময় বেশ কিছু ভালো কাজ করার চেষ্টা করেছেন। বঙ্গবন্ধু, এমনকি তাঁর কন্যা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাকে সাধ্যমতো ভালো কাজে সহায়তা করেছেন। তার এক ভাই সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে বেশ ক’জন সিনিয়র মেধাবী সেনা অফিসারকে কোনও কারণ ছাড়াই সকল পাওনা না চুকিয়েই বরখাস্ত করেছিলেন। স্বল্পতম সময়ে সরকারি বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে এই ব্যক্তির ভাইও ছিলেন। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে এসব অফিসারকে তাদের স্ব-স্ব পদে পুনর্বহাল করে তাদের সকল দেনা পাওনা চুকিয়ে সুযোগ সুবিধা দিয়ে অবসরে পাঠিয়েছিলেন। এই অফিসারদের মধ্যে এই ব্যক্তির ভাইও ছিলেন। এসব অফিসারের মধ্যে আমার এক পরিচিতজন ছিলেন। তিনি যেদিন তার বরখাস্তের চিঠিটা পান আমাকে ফোন করে অনেকটা বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন আমি এই কাজের সঙ্গে যারাই জড়িত নামাজ শেষে মুনাজাত করে তাদের বিচার চাইবো।’ তাকে সান্ত্বনা দেই কী করে। আর একজন আছেন ওয়ানম্যান পার্টির নেতা। বন্ধুবর ড. মুনতাসির মামুন এদের নাম দিয়েছিলেন ‘ল্যাঙ্গুট পার্টি’, তিনি প্রতিদিন রাজপথে লা‌খ লাখ মানুষ নামানোর খোয়াব দেখেন। এই ব্যক্তি যখন রাজনৈতিক উদ্বাস্তু ছিলেন তখন শেখ হাসিনা তাকে আওয়ামী লীগে টেনে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে ২০০১ এর সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বিরোধী শিবিরে যোগ দিতে দেরি করেননি। নিজে একটি দলও করেছিলেন। সাধারণ সম্পাদক হওয়ার মতো কাউকে তিনি খুঁজে পাননি।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর বিরতিহীনভাবে তাকে এই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের কথা শুনে আসছে মানুষ। এই ষড়যন্ত্র যেমন দেশে হচ্ছে আবার বিদেশে বসেও কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ইউটিউবে স্বনামে শেখ হাসিনা ও বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের কুৎসা ও অসত্য বানোয়াট বক্তব্য ও গুজব প্রচার করে আসছে। এদের মধ্যে আছে কয়েকজন সাংবাদিক ও পেশাজীবী। এমন একজন সাংবাদিক দেশে থাকতে একটি জনপ্রিয় প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে একটা অনুষ্ঠান করতো। সে এখন নিউইয়র্ক প্রবাসী। তার কাজ হচ্ছে সর্বক্ষণ শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করা, গুজব সৃষ্টি করা। জামায়াত বা বিএনপি সম্পর্কে সে কখনও টুঁ শব্দটা করে না। আর একজন আছেন যিনি দেশে থাকতে বেগম খালেদা জিয়ার তৃতীয় পুত্র নামে তার সতীর্থদের কাছে পরিচিত ছিলেন। এখন নিউইয়র্কে থাকেন। সেখানে গিয়ে নামের আগে ডক্টর লাগিয়েছেন। খুঁজে খুঁজে সাবেক সামরিক ও বেসামরিক আমলা ও সরকারি কর্মকর্তাদের ধরে আনেন। এরা সকলেই বর্তমান সরকারের সুবিধাভোগী ও কৃপাধন্য। অবসরের পর প্রায় সকলেই দেশে থাকার পরিবেশ নেই বলে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় সপরিবারে পাড়ি জমিয়েছেন। চাকরির মেয়াদকালে নিজের পদ পদবি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন। এদের কর্মকাণ্ড এখন ‘ওপেনসিক্রেট’। তারা এই অনুষ্ঠানগুলোতে এসে নিয়মিত সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। এক সময় ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করতেন তেমন একজন ব্যক্তি বহু বছর ধরে প্রবাসী। সেদিন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নিম্নমানের বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারবেন না। নিউইয়র্ক হতে গ্রিন চ্যানেল নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন এক সময়ে একটি জাতীয় দৈনিকে কর্মরত এক সাংবাদিক। বছর দু’য়েক আগেও মধ্যরাতের টকশোতে তিনি বেশ সরগরম ছিলেন। সরকারের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোতে তার সমকক্ষ এখন পর্যন্ত তেমন কাউকে পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক নন তবে এরইমধ্যে গুজব ছড়ানের দায়ে কুখ্যাতি অর্জন করেছে টিম সুস্ময়। পুরো নাম সুসম্য শরীফ। এরা সকলে স্বনামে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন তাই তাদের নাম নেওয়াতে তেমন কোনও অসুবিধা নেই।

এই টিম সুস্ময় সম্ভবত পর্তুগাল অথবা ফ্রান্স হতে তার গুজব সর্বস্ব অনুষ্ঠানগুলো প্রচার করে। এদের গুজবের একটা নমুনা–‘শেখ হাসিনা দিনের বেলায় গণভবনে থাকলেও নিরাপত্তার কারণে রাতে ঘুমাতে যান রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়’! এসবের সঙ্গে আছেন কয়েক জন ব্লগার। তাদের একজন থাকেন ফ্রান্সে। নিজেকে পরিচয় দেন শেখ হাসিনা কর্তৃক নির্বাসিত লেখক হিসেবে। পেশায় একজন চিকিৎসক। তার ব্লগের টার্গেট হচ্ছেন শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, বর্তমান সরকার, দেশের প্রগতিশীল লেখক-বুদ্ধিজীবী। ইদানীং এরা সকলে জোট বেঁধেছেন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে নাদান ধান্ধাবাজ খয়রাত খাওয়া অর্ধশিক্ষিত ধর্ম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঢাকার ধাক্কাধাক্কি পার্টির কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে। এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের এক শ্রেণির মিডিয়া। এসব মিডিয়া কিছু বাচাল ব্যক্তিকে রাতারাতি জনপ্রতিনিধি বানানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। একটি বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে ক’দিন আগে একজন স্বঘোষিত বামপন্থী টোকাই যিনি ইদানীং জনগণের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তার অর্ধপৃষ্ঠা জুড়ে সাক্ষাৎকার ছেপে সকলকে অবাক করে দিয়েছে। বক্তব্য একটাই, এই সরকারকে ক্ষমতায় রেখে দেশের ‘গণতন্ত্র’ উদ্ধার করা যাবে না। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ‘আচমকা ছাত্র নেতা’র সঙ্গে জোট বেঁধেছেন একটি রাজনৈতিক দল খুলবেন বলে।

দেশে বা সরকারে সমস্যা নেই তা কোনও বিবেকবান মানুষ বলবে না। সরকারের কর্মকাণ্ড যত বড়, সমস্যার পরিধিও তত বড়। এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা এক শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর লাগামহীন দুর্নীতি। ক’দিন আগে খোদ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন দেশে দুর্নীতিবাজদের বেশিরভাগই সরকারি কর্মকর্তা। তিনি কানাডার বহুল প্রচারিত ‘বেগমপাড়া’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার উল্লেখ করেছেন। একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা সব সময় লাগামহীন দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকেন, তা অস্বীকার করার কোনও জো নেই। বর্তমান সরকারের আমলে তাদের সুযোগ-সুবিধা আকাশচুম্বী হয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধার বেশিরভাগ অবসর গ্রহণের পরও বলবৎ থাকবে। তবে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী আর রাজনীতিবিদও যে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, তাতো অস্বীকার করা যাবে না। তারা শুধু আর্থিক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত তাই নয়, তাদের অনেকের নৈতিক স্খলনও লাগামহীন হয়ে পড়েছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এদের বেশিরভাগই রাতারাতি আওয়ামী লীগ বনে যাওয়া সব আমলের সরকারি দলের সদস্য। আর এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতা আছেন যারা পৈত্রিক সূত্রে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হয়েছেন। তাদের না আছে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে কোনও ধারণা, না আছে আওয়ামী লীগের প্রতি কোনও আনুগত্য। নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে তারা কখনও উঠতে পারেন না। ধাক্কাধাক্কি পার্টিকে রাস্তায় কথা বলার রসদ জোগায় এসব মৌসুমি ও সুযোগসন্ধানী সরকারদলীয় সদস্য। বঙ্গবন্ধু তাঁর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে প্রতিনিয়ত এসব দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। পেরে উঠেননি। তাঁর কন্যাও একই কাজ করতে করতে মনে হয় অনেকটা ক্লান্ত। তবুও তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দলের একাধিক নেতাকর্মীকে দুদকে তলব করা হয়েছে, কয়েকজন কারাগারেও আছেন। কিন্তু এটাতো একা শেখ হাসিনার যুদ্ধ নয়। এসব দুর্বৃত্তকে শক্ত হাতে নিবৃত্ত করতে পারলে দেশকে সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে শেখ হাসিনার সামনে আর কোনও বাধা নেই। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা জেনেও ধাক্কাধাক্কি পার্টির সদস্যরা বিরামহীনভাবে ধাক্কাধাক্কি করতেই থাকবে তাতে কোনও অসুবিধা নেই, কিন্তু দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবেই।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।