গড়ে উঠেনি আয়কর দেয়ার সংস্কৃতি

দেশে আয়কর দেয়ার সংস্কৃতি গড়ে না ওঠার পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে। মানুষকে কর প্রদানে উৎসাহিত করার পরিবর্তে ভীতি প্রদর্শন করা হলে হিতে বিপরীত হবেই। সাধারণ নাগরিক আইনকানুনের প্রতি সব সময়েই শ্রদ্ধাশীল। অনেক সময়ই অসাধু আয়কর কর্মকর্তা করদাতাকে ভোগান্তির ভেতর ফেলেন। আমরা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার কথা বার বার বলি। এটি সম্ভব আর্থিক লেনদেনের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সত্যিকার দেশপ্রেম থেকে সততার সঙ্গে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে।

কর হচ্ছে রাষ্ট্রের জনসাধারণের স্বার্থে রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারকে প্রদত্ত বাধ্যতামূলক অর্থ। এ প্রক্রিয়ায় দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রের স্বার্থে নিয়মিতভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর প্রদান করে থাকে। করের বাইরে সরকারের আরও বিবিধ আয়ের উৎস থাকলেও এটিই আয়ের প্রধান এক অবলম্বন। প্রায় সব দেশেই কর আদায়ের প্রচলিত পদ্ধতি চলমান। আমেরিকা, কানাডাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ জনগণ প্রদত্ত করের টাকা দিয়ে শুধু উন্নয়ন নয়, আর্থিক নির্ভরশীলতা ও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে অনেক আগেই। এশিয়ার জাপান, সিঙ্গাপুর, হংকং, ইন্দোনেশিয়া আয়করের সঠিক ব্যবহার করে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। সে তুলনায় কর আহরণে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে।

প্রতিবছর ৩০ নবেম্বরই বিনা জরিমানায় আয়কর রিটার্ন দাখিলের শেষদিন থাকে। শীতের আগে আগে ভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে থাকায় এবং দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রিটার্ন জমার সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে এনবিআরে চিঠি দিয়েছিল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, আয়কর আইনজীবীসহ পেশাজীবীদের বিভিন্ন সংগঠন। জাতীয় আয়কর দিবস ছিল সোমবার। সেদিন আয়কর রিটার্ন দাখিলের শেষ দিন হলেও বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় সময় বাড়ানো হয়েছে এক মাস। এর আগে প্রতিবছর আয়কর মেলা হয়েছে। কিন্তু এবার করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে আয়কর মেলার আয়োজন করেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। তবে করদাতাদের সুবিধায় প্রতিটি কর অঞ্চলে মেলার মতো পরিবেশ বজায় রেখে আয়কর রিটার্ন জমাসহ রাজস্ব সেবা প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছে। মেলার সব সুযোগ-সুবিধাই মিলেছে কর অঞ্চলগুলোতে।

২০০৮ সালে দেশে প্রথম আয়কর দিবস পালন শুরু হওয়ার পর বহু করদাতা কর বিষয়ে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। আয়করের প্রতি দেশের মানুষের আগ্রহ যেমন বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে আয়করদাতাদের সংখ্যাও। চাহিদা অনুযায়ী সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে আয়কর মেলায় গিয়ে একজন নতুন করদাতা মাত্র ২০ মিনিটেই ইলেক্ট্রিক ট্যাক্স পেয়ার্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ই-টিআইএন) সার্টিফিকেট পাচ্ছেন। পুরনো করদাতারাও পাচ্ছেন কর বিবরণীর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র। করোনাকাল কেটে গেলে আয়কর মেলার মাধ্যমে নতুন আয়করদাতা পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কারা কর দেবেন? কোন ব্যক্তি করদাতার আয় যদি বছরে তিন লাখ টাকার বেশি হয়; মহিলা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতার আয় যদি বছরে তিন লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি হয়; গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতার আয় যদি বছরে চার লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি হয় তাহলে তারা করের আওতায় পড়বেন। সাধারণ মানুষ আয়কর দিতে চায়। চাকরিজীবীদের তো আয়কর ফাঁকি দেয়ার উপায়ই নেই। বছরে তিন লাখ টাকার সামান্য আয়ে সংসার চলুক আর না চলুক আয়কর প্রদান বাধ্যতামূলক। তার পরও বাড়ছে না আয়করদাতার সংখ্যা। কর আদায়ও হতাশাজনক। এখন পর্যন্ত দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি মানুষের ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন আছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এর মধ্যে অর্ধেক টিআইএনধারীই রিটার্ন জমা দেন না। আয়কর প্রদানের বিষয়ে মানুষকে উৎসাহিত করতে হলে সার্বিক প্রক্রিয়াটিকে নাগরিকবান্ধব করতে হবে অবশ্যই।